জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংশয় আছে : এরশাদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি বলেছেন, ‘আমি দেশবাসীর উদ্দেশে কিছু বার্তা পৌঁছে দিতে চাই।

নির্বাচন নিয়ে এখন অনেক সংশয় রয়েছে। আমি জানি না আগামী নির্বাচন হবে কি না। ’ গতকাল শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনে এ সমাবেশ করা হয়েছে এরশাদের গড়া সম্মিলিত জাতীয় জোটের ব্যানারে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষিত সাত দফা দাবির প্রতি ইঙ্গিত করে সমাবেশে এরশাদ বলেন, ‘একটি দল ৭ দফা দিয়েছে। সরকার তা মানতে রাজি নয়। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী মানা সম্ভব নয়। এ অবস্থার মধ্যে আগামী দিনগুলো স্বচ্ছ দিন বলে মনে হয় না আমার। রাজনীতির এ পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলো নিয়ে শঙ্কা আছে। তবে জাতীয় পার্টি নির্বাচনমুখী দল, অতীতেও আমরা নির্বাচন করেছি, আগামী নির্বাচনেও অংশ নেব। ’

জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে ১৮ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে এইচ এম এরশাদ বলেন, ‘আমার শেষ কথা, নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আমি নতুন করে ১৮ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। আমরা নির্বাচনের পদ্ধতি পরিবর্তন করতে চাই। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চাই। শিক্ষাপদ্ধতি সংস্কার চাই। স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ চাই। শান্তির রাজনীতি চাই। সড়ক নিরাপত্তা চাই। ’ ক্ষমতায় গেলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রাদেশিক পদ্ধতি আনা হবে বলেও জানান এরশাদ।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এইচ এম এরশাদ। সকাল ১০টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই বিভিন্ন নেতার নামে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে রংবেরঙের গেঞ্জি, লাঙল প্রতীক আঁকা শাড়ি ও ক্যাপ পরে নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে হাজির হতে থাকে। এরশাদ সমাবেশস্থলে হাজির হন সকাল সাড়ে ১১টায়। সমাবেশে বক্তব্য দেন জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, দলের কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের, মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, ইসলামী ফ্রন্টের নেতা এম এ মান্নান, জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, প্রেসিডিয়াম সদস্য ফয়সাল চিশতি, ইসলামী যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান আল্লামা আবু সুফিয়ান, জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সালমা ইসলাম প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ বলেন, ‘আমিই এখন দেশের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ। ক্ষমতা ছাড়ার পর আমার ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো রাজনীতিবিদের বেলায় ঘটেনি। ১৯৯০ সালে ক্ষমতা ত্যাগের পর আজ পর্যন্ত একটি রাত শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি। সব সময় চিন্তা করতে হয় এই বুঝি আবার জেলে যেতে হচ্ছে। ’

১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে এরশাদ বলেন, ‘আমি স্বেচ্ছায় জোর করে ক্ষমতা নিইনি। সে সময়ের রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার দেশ পরিচালনায় অপারগতা প্রকাশ করে টেলিভিশনে বক্তৃতা দিয়ে ক্ষমতা অর্পণ করেছিলেন। ওই সময় আমি না হয়ে অন্য কেউ সেনাপ্রধান থাকলে তাঁকেও ক্ষমতা গ্রহণ করতে হতো। ’

সমাবেশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এরশাদ। তিনি বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তন চায় বলেই জাতীয় পার্টির সমাবেশে এত জনসমাগম হয়েছে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আগামী নির্বাচনই আমার জীবনের শেষ নির্বাচন। জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় আনতে আমি নিজেকে উৎসর্গ করতে চাই। তবে নির্বাচন নিয়ে সংশয় আছে। একটি দল যে ৭ দফা দিয়েছে সংবিধান অনুসারে তা মানা সম্ভব নয়। সে জন্য পানি ঘোলা হতে পারে, শঙ্কার সৃষ্টি হতে পারে। ’

এরশাদ বলেন, ‘জাতীয় পার্টি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে। আমরা নির্বাচন করব। নির্বাচনের আগে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দল নিয়ে সরকার গঠন করতে হবে। আমাদের যে জোট আছে সে জোট নিয়ে আমরা ৩০০ আসনে প্রার্থী দেব। সরকারকে বলেছি, নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আগামীতে জাতীয় পার্টিই ক্ষমতায় আসবে, কারণ দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। ’

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এরশাদ বলেন, ‘আপনারা এলাকায় ফিরে গিয়ে প্রার্থী ঠিক করুন। যাঁরা প্রার্থী হতে চান তাঁরা দলের কাছে প্রার্থিতার আবেদন করুন। ’

রওশন গাইলেন, ‘আসল মানুষ না চিনিয়া আমি করেছি এক মস্ত ভুল’ : বক্তৃতার শুরুতেই রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় ‘আসল মানুষ না চিনিয়া আমি করেছি এক মস্ত ভুল’ গানের কলিটি গেয়ে শোনান রওশন এরশাদ। তিনি বলেন, ‘এবার লাঙলকে না চিনলে এমন মস্ত ভুল হয়ে যাবে। ’

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করে রওশন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন কিন্তু সে স্বাধীনতার স্বপ্ন একমাত্র জাতীয় পার্টিই পূরণ করতে পারে। জাতীয় পার্টি আজ জেগেছে, মানুষ এখন কলের লাঙল রেখে আসল লাঙল খুঁজছে। ’ তিনি বলেন, ‘এবার জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় যেতে চায়। দেশে উন্নয়নের যে ধারা সূচিত হয়েছে তা ধরে রাখতে জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় যেতে হবে। ’

এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত আমাদের এক কোটি লোককে আশ্রয় দিয়েছিল। ’ তিনি বলেন, ‘২৭ বছর ধরে নির্যাতন করেও জাতীয় পার্টিকে ধ্বংস করা যায়নি, আজকের সমাবেশ তার প্রমাণ। ’-কালেরকন্ঠ