জঙ্গি হামলার লক্ষ অর্থনীতি

যুগবার্তা ডেস্কঃ গুলশানে জঙ্গি হামলার এক মাস পেরিয়ে গেছে। এ ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। চলছে তদন্ত কার্যক্রম। ঘটনা পর্যবেক্ষণে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএসহ বিভিন্ন চেম্বারের নেতা এবং ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। তাদের সবাই বলছেন, সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার মূল লক্ষ্য রাজনীতি নয়, অর্থনীতি। একই পর্যবেক্ষণ নিরাপত্তা বিশ্লেষকদেরও। গত ১ জুলাই গুলশান হামলার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে। রাজাধানীর যমুনা ফিউচার পার্ক ও বসুন্ধরাসহ রাজধানীর বৃহত্ শপিং মলগুলো ঘুরে দেখা যায়, সেখানে ক্রেতাদের আনাগোনা আগের তুলনায় কম। এসব শপিং মলের প্রায় অর্ধশত ব্যবসায়ী জানান, গুলশানে জঙ্গি হামলার পর তাদের ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। জঙ্গি হামলার প্রভাব পড়েছে পর্যটনসহ দেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পেও। সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার মূল লক্ষ্য তাহলে অর্থনীতি কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি তপন চৌধুরী বলেন, কোনো দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রথম আঘাত আসে অর্থনীতির ওপর। একটা দেশকে সংকটে ফেলার প্রধান উপায়ই হচ্ছে তার অর্থনীতিতে আঘাত করা। এর মাধ্যমে দুর্বল পরিস্থিতি তৈরি হলে তা সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থা সুসংহত করে পরিকল্পনাকারীরা। গুলশানে জঙ্গি হামলায় নিহত হন ১৭ বিদেশী। এর মধ্যে নয়জনই ইতালির নাগরিক, যাদের অধিকাংশই ছিলেন তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বস্ত্র ও পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুলশান হামলার প্রভাব রফতানি আয়ে এখনই হয়তো দেখা যাবে না। এর প্রভাব বুঝতে হলে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামলার পর বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছেন পোশাক খাতের অনেক ক্রেতা প্রতিনিধি। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাংলাদেশে সব ধরনের বাণিজ্যিক সফর বাতিল করে জাপানের পোশাকের ব্র্যান্ড ইউনিক্লো। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন সুইডেনের এইচঅ্যান্ডএমসহ অন্য বিদেশী পোশাক ক্রেতারাও। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, জঙ্গি হামলার মূল লক্ষ্য দেশের অর্থনীতি। জঙ্গিবাদ বর্তমানে বৈশ্বিক সমস্যা হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর বৈশিষ্ট্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। গুলশানের হামলা ছিল বিদেশীদের লক্ষ্য করে। এর এর অর্থ দাঁড়ায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যারা অংশীদার, সেই বিদেশীদের এ বার্তা দেয়া যে, বাংলাদেশ নিরাপদ নয়। দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পকে ধ্বংস করতেই জঙ্গি হামলা করা হয়েছে বলে মনে করেন বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান। তিনি বলেন, যে ঘটনা ঘটেছে, বাংলাদেশে তা ঘটার কথা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি হামলার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পর্যটন শিল্পেও। দেশের পর্যটন এলাকায় হোটেল-মোটেলগুলোয় দেশী-বিদেশী অনেকের বুকিং বাতিল করা হয়েছে। অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে রাজধানীর পাঁচতারকা ও অভিজাত হোটেলগুলোয়। সীমিত করে আনা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সেবা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায়, যেখানে আছে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসসহ বিদেশী চেম্বার ও প্রতিষ্ঠান। মূলত বিদেশী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক হামলা অর্থনীতিকে আঘাতের অভিপ্রায়েরই বহিঃপ্রকাশ। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ বলেন, রাজনীতি বাদ দিয়ে অর্থনীতি হতে পারে না। উদ্দেশ্য রাজনৈতিক থাকলেও আঘাতের অবলম্বন হয় অর্থনীতি। বিশ্বের যেসব দেশে জঙ্গিবাদ দেখা দিয়েছে, সেসব দেশেও এমনটাই হয়েছে, যেমন তিউনিসিয়ার ক্ষেত্রে আঘাত এসেছে দেশটির পর্যটন শিল্পে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আঘাতটা পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের উন্নয়নের বড় অংশীদার জাপান। গুলশানে হামলায় নিহতদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন জাপানি, যাদের সবাই মেট্রোরেল প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছিলেন। মেট্রোরেল প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। গুলশান হামলার পর তারাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। জাইকার প্রেসিডেন্ট শিনিচি কিতাওকার ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সফরের কথা থাকলেও পরিস্থিতি আরো পর্যবেক্ষণে তা স্থগিত করা হয়েছে। জঙ্গি হামলা বাংলাদেশে বিনিয়োগেও ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। তাদের মতে, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের প্রবৃদ্ধিতে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ঋণমানেও এর ছাপ পড়তে পারে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা মুডি’স। তারা বলছে, গত কয়েক মাসে দেশে যে হারে জঙ্গি তত্পরতা দেখা গেছে, তাতে গভীর উদ্বেগজনক অবস্থা তৈরি হতে পারে দেশীয় অর্থনীতিতে। মুডি’সেরই অন্য এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোনো দেশের অর্থনীতির ওপর সহিংস হামলার এমন ঘটনা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করাই জঙ্গি হামলার লক্ষ্য ছিল বলে মত দেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। গত ২৮ জুলাই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেন, বিগত সময়গুলোয় অনেকবার বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, কিন্তু অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। আমাদের দেশের তৈরি পোশাক খাতকে সবাই অনুসরণ করতে চায়, করছেও। লক্ষ করেন, হলি আর্টিজানে নিহতদের অনেকেই পোশাক খাতের সঙ্গে যুক্ত। বেছে বেছে এসব করা হচ্ছে, যেন ক্রেতারা না আসে।