ছোটদের সাফে সোনালি সন্ধ্যা

74

হঠাৎই নিভে গেল স্টেডিয়ামের সব কটি ফ্লাডলাইট। ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হতে কয়েক মুহূর্ত বাকি। সন্ধ্যার সিলেট জেলা স্টেডিয়াম তখন দূরের ‘অপেরা হাউস’। হাজারো মুঠোফোনের রুপালি আলোর রোশনাই জ্বলছে আর নিভছে। কে যেন দূরের মেঘালয় পাহাড় থেকে ছেড়ে দিয়েছে একঝাঁক জোনাকি পোকা। তখনো কি কেউ বুঝেছে এমন অন্ধকার ফুঁড়ে একটু পরই জ্বলে উঠবে বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন মশাল!
বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে নিভে যাওয়া স্টেডিয়ামের বাতি জ্বলে উঠল প্রায় মিনিট দশেক পর। জ্বলে উঠল বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দলও। নির্ধারিত সময়ে সমতায় (১-১) থাকা ফাইনাল গড়াল টাইব্রেকার নামের ‘লটারিতে’।
টুর্নামেন্টের নকআউটে অতিরিক্ত সময় রাখা হয়নি। ৯০ মিনিট শেষ হতেই টাইব্রেকার। স্টেডিয়ামের ২০ হাজারের বেশি দর্শকের স্নায়ুচাপের কড়া পরীক্ষা চলল উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনালে।
মাঠের মাঝখানে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা ফুটবলাররা তখন প্রার্থনায়। প্রার্থনায় বাড়ির ছাদে আর গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে যাওয়া হাজারো দর্শক। বাংলাদেশের ফাহিম, সজীব আর আতিকুজ্জামানের শট জালে। কী দারুণভাবেই ওরা শট নিচ্ছিল! মাথা ঠান্ডা, কিন্তু নিখুঁত নিশানা। ভারতের সৌরভ ও রাকিপও লক্ষ্যভেদে সফল হওয়ার পর অভিজিতের শট সাইডপোস্টে লেগে ফিরতেই সমুদ্রের গর্জন। বাংলাদেশের সাদ গোল করতেই দর্শকেরা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার অপেক্ষায়। ভারতের ডিফেন্ডার সাকলাইনের শটটি গোলরক্ষক ফয়সাল ডান দিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দিতেই পুরো স্টেডিয়াম মাতল আনন্দে। ভারতকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ।
ঘরের মাঠে ২০০৩ সাফে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সারা দেশকে আনন্দে ভাসিয়েছিল জাতীয় দল। ২০১০ এসএ গেমস ফুটবলে সোনা এনে দিয়েছিল অনূর্ধ্ব-২৩ দল। এবার ইতিহাস গড়ে সন্ধ্যাটা স্মরণীয় করে রাখল ছোটরা।
এমন মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষাতেই ছিলেন সাফ ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। এত দিন আক্ষেপ করে বলে আসছিলেন, ‘যদি সাফের সভাপতি থাকা অবস্থায় জাতীয় দলের হাতে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি তুলে দিতে পারতাম, তাহলে আমার চেয়ে সুখী মানুষ কেউ হতো না।’ কাল মুখে হাসি ছড়িয়ে বললেন, ‘আমার মনঃকষ্ট কিছুটা হলেও ঘোচাতে পেরেছে এই ছেলেরা।’
মাত্র ২২ দিন অনুশীলন, তবু কোচ গোলাম জিলানি আশাবাদী ছিলেন। শুরু থেকেই দুর্দান্ত খেলতে থাকা বাংলাদেশ অপরাজিত থেকেই শেষ করল টুর্নামেন্ট। তাও আবার ভারতকে দুবার হারিয়ে! গ্রুপ পর্বে ভারতকে হারিয়ে কোচ তাঁর খেলোয়াড়দের বলেছিলেন, ‘তোমাদের মাঠ, তোমাদের দর্শক। তোমরাই পারবে দেশের মাটিতে ট্রফিটা রেখে দিতে।’
সেই লক্ষ্যে কাল প্রথম মিনিট দশেক একটু এলোমেলো থাকলেও গুছিয়ে নিয়েছে আস্তে আস্তে। কাদা মাঠেও খেলেছে পাসিং ফুটবল। সুযোগও এসেছিল বেশ কয়েকবার। কিন্তু গোল এসেছে শুধু একটিই।
গুরুত্বপূর্ণ ফরোয়ার্ড নিপু দুই কার্ডের খাঁড়ায় পড়ে ফাইনালে ছিল দর্শক। ওর বদলি নামা হৃদয় ও সাদ বেশ কয়েকবার কাঁপন ধরিয়েছে ভারতের রক্ষণে। ২১ মিনিটে এগিয়ে যেতে পারত বাংলাদেশ। কিন্তু শাওনের ক্রস থেকে মোস্তাজেবের হেড গেল বাইরে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গতি বাড়াল বাংলাদেশ। গোলও ধরা দিয়েছে ৪৭ মিনিটে। শাওনের পাস থেকে বক্সের ভেতরে দাঁড়ানো ফাহিমের শট জালে (১–০), উল্লাসে ফেটে পড়ে গ্যালারি। কিন্তু গোল শোধে মরিয়া ভারত তখন খোঁচা খাওয়া বাঘ। ১৫ মিনিট পরই ফিরেছে সমতায়। ডান প্রান্ত থেকে অবিনাশের আচমকা গোলার মতো শট গোলরক্ষক ফয়সালের মাথার ওপর দিয়ে জালে (১-১)। বাকিটা সময় দুই দলই চেষ্টা করেও গোল করতে পারেনি।
টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নিপু। ম্যাচসেরা অধিনায়ক শাওন। এদের সবার গায়েই জাতীয় পতাকা থাকল ম্যাচের পর। সবাই ঘুরে ঘুরে ল্যাপ অব অনার দিয়েছে পুরো স্টেডিয়াম। গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার দর্শক। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তারা হয়তো আগামীর ছবিও আঁকছিল—এই কিশোরদের হাতে উঠবে আরও বড় কোনো ট্রফি!