চুরি ঠেকাতে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা স্মারক রূপায়

যুগবার্তা ডেস্কঃ সোনা চুরি ঠেকাতে এখন থেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননার স্মারক তৈরি হবে রূপায় মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশিদের সম্মাননা জানানোর স্মারক বা ক্রেস্ট তৈরিতে সোনা চুরির ঘটনা প্রমাণিত। তাই বিদেশি যুদ্ধবন্ধুদের পরবর্তী সম্মাননা-ক্রেস্ট তৈরিতে স্বর্ণের ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে যাদের সম্মাননা দেয়া হবে তাদের ক্রেস্টের মূল উপাদান থাকবে রুপা।

আগে স্বর্ণ ও রুপার সমন্বয়ে ক্রেস্ট তৈরি হতো, যার মূল উপাদান থাকতো স্বর্ণ।

সরকারের নীতিনির্ধারণী একাধিক সূত্র মতে, বিদেশিদের দেয়া সম্মাননা-ক্রেস্টের স্বর্ণ কেলেঙ্কারির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় আগামীতে এটি ঠেকাতে সরকার স্বর্ণের বদলে রুপার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্ত মতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরবর্তী ক্রেস্টগুলো তৈরি হবে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে একাধিক পরীক্ষার মাধ্যমে ক্রেস্টের উপাদান ও মান নিশ্চিত করা হবে। মুখ্য সচিবসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সম্মাননা-ক্রেস্টের পরীক্ষার প্রক্রিয়াটি তদারকির দায়িত্বে থাকবেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য সরকার প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫ শতাধিক বিদেশি বন্ধু (ব্যক্তিত্ব ও সংগঠন)কে সম্মাননা প্রদান করছে। স্বাধীনতার চার দশক পূর্তি উপলক্ষে ২০১১ সাল থেকে সম্মাননা প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত সাত পর্বে বাংলাদেশের অকৃত্রিম ৩৩৮ যুদ্ধবন্ধুকে (ব্যক্তিত্ব ও সংগঠন) সম্মাননা দিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা ও মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা- এই তিন ধরনের সম্মাননা ক্রেস্ট বিদেশি বন্ধুদের দেয়া হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ক্রেস্টে সর্বনিম্ন এক ভরি (১৬ আনা) স্বর্ণ ও ৩০ ভরি রুপা থাকার কথা।

কিন্তু একাধিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, কোনো কোনো ক্রেস্টে স্বর্ণ বা রূপার অস্তিত্বই ছিল না। বরং সেখানে পিতল, তামা ও দস্তার ব্যবহার ছিল।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও জাতীয় মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)’র ল্যাবরেটরিতে করা পরীক্ষায় জালিয়াতির বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়।

বিএসটিআই’র করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, এক ভরির (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) জায়গায় ক্রেস্টে স্বর্ণ দেয়া হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩৬৩ গ্রাম (সোয়া তিন আনা)। ১২ আনার স্বর্ণই নেই। আর রূপার বদলে ৩০ ভরি বা ৩৫১ গ্রাম পিতল, তামা ও দস্তা পাওয়া যায়। প

রে সরকারি তদন্ত কমিটির উদ্যোগে পরমাণু শক্তি কমিশনে আবারো পরীক্ষা করা হলে ক্রেস্টের ‘লোগো এবং লকে প্রধানত তামা, দস্তা ও নিকেল ধাতুর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে শনাক্ত হয়। উক্ত পরীক্ষায় স্বর্ণের কোনো উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। বর্ণিত ধাতুসমূহের উপস্থিতির ভিত্তিতে সম্মাননাটি পিতল নির্মিত বলে প্রতীয়মান হয়।

সরকারি সূত্র মতে, ক্রেস্টের স্বর্ণ জালিয়াতির ঘটনা ফাঁসের পর এ নিয়ে দেশ-বিদেশে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সরকারের ভেতরে-বাইরেও বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। অবশ্য সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে বিষয়টি কঠোর হস্তে মোকাবিলা এবং দোষী যে-ই হোক তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা আসে। ওই ক্রেস্টগুলোর তৈরি সঙ্গে যুক্ত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। ওই মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীকে বাদ দিয়ে পরবর্তীতে নতুন একজনকে পূর্ণ মন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশিদের সম্মাননা ক্রেস্টে আর যাতে কোনো কেলেঙ্কারি বা জালিয়াতি না হয়- এ জন্য বিশেষ কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সে মতে, কানাডার প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বাবা পিয়েরে ট্রুডোকে দেয়া সম্মাননা ক্রেস্ট তৈরি করা হয়েছে। প্রায় ১০৪ গ্রাম স্বর্ণের ব্যবহারে তৈরি করা ওই ক্রেস্টটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে।

সরকারের ৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে এটি একাধিকবার পরীক্ষা করা হয়েছে। সর্বশেষ পরীক্ষাটি হয়েছে ক্রেট তৈরির পর। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ সহ ওই কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা পুরো প্রক্রিয়াটি মনিটরিং করেছেন।

সরকারের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী ভারতের সৈনিকদের সম্মাননা (মরণোত্তর) দেয়ার কাজটি এগিয়ে চলেছে। তাদের রূপার তৈরি সম্মাননা ক্রেস্ট দেয়া হবে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, এরই মধ্যে ক্রেস্ট তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ রূপার তৈরি জাতীয় স্মৃতিসৌধের রেপ্লিকাসদৃশ সম্মাননা ক্রেস্টের কয়েকটি মডেল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা হয়েছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর ভারতীয় সৈনিকদের সম্মাননা প্রদানের দিন-তারিখ চূড়ান্ত হবে বলে আশা করে ওই কর্মকর্তা।