চুমু খাওয়ার সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও আতঙ্কিত বাংলাদেশ

114

সঙ্গীতা ইয়াসমিন।
গত বেশ কিছুদিন ধরে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া ইভেন্ট নিয়ে যেসব বহুল আলোড়িত আলোচনা হচ্ছে নোংরা ঘাঁটার মানসিকতা নেই বলেই সেটি এড়িয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সময় যত এগিয়ে আসছে আমার আশঙ্কা ততো বাড়ছে। তাই আশঙ্কা নিয়েই লিখছি; একটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধারদের এই সুঠাম বিপ্লবী আয়োজনের আভাসে সত্যিই আমি আতঙ্কিত। বাংলাদেশে আজ ১৩ তারিখ, রাত পোহালেই ১৪ তারিখ। আর এই ১৪ তারিখে ভ্যালেন্টাইন ডে’তে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার অধিকার চায় এই প্রজন্মের উন্মাতাল ছেলেমেয়েরা। আর অনেক মুক্তমনা বোদ্ধারা এই ইভেন্টে লাইক ও নানারকম সাংস্কৃতিক-তাত্ত্বিক বিচার বিশ্লেষণমূলক মন্তব্য করে এটাকে জায়েজ করার প্রচেষ্টায় নিরলস মত্ত রয়েছেন। কেউ কেউ আধুনিকতার নামে এটাকে সাংস্কৃতিক বিপ্লব বলেও আরেক ধাপ এগিয়ে দিচ্ছেন। তাই দু’কথা বলার এই ব্যর্থ প্রয়াস। যদিও জানি, চোর কভু না শোনে ধর্মের কাহিনী।
তথ্যমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই ইভেন্ট বন্ধ হবে বলে আশা করছি না। আশঙ্কায় আমার বুক দুরু দুরু কাঁপছে। কী হবে রাত পোহালে? ঢাকার মানুষ একটি অসাংস্কৃতিক ক্ষেপা পাগলের মতো অদ্ভুত বিকৃত রুচির যুবক-যুবতীদের দেখবে সূর্যের আলোয়? অসহায় বাংলাদেশ দেখবে কেমন করে একটি প্রজন্ম বিপ্লবের নামে চরম সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে নিজেদের, কীভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি!
অতি দুঃখের সাথে বলছি, আমি যদিও পুরোপুরি ঠাহর করে উঠতে পারছি না যে এই চুমু বিষয়ক ইভেন্টের মূল উদ্দেশ্য কী? এটি কি আদতেই কোনো অন্যায়-অবিচারের প্রতি সংগঠিত তারুণ্যের প্রতিবাদ নাকি নিজেদের অবদমিত ইচ্ছের বিকৃত কদাকার রূপের বহিঃপ্রকাশ? এই প্রতিবাদ কাদের বিরুদ্ধে? এটা কি রাষ্ট্র, সরকার নাকি ধর্মবাজদের বিরুদ্ধে? নিজের নাক কেটে এরা কার যাত্রাভঙ্গ করতে চায়? এতদিন জানতাম মানুষ তার নোংরা দিকটি লুকিয়ে রাখতে চায়, জনসমক্ষে সেটা প্রকাশ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয় কিন্তু এখন দেখছি উল্টো; মানুষ এটাকে দুঃসাহস হিসেবে দেখছে। এই যে দুঃসাহস বা দূরন্ত সাহস, এটা থাকে দু’ধরনের মানুষদের। ১। সম্ভবতঃ তারা অতিশয় নির্বোধ ২। তারা সভ্য সমাজের বাইরে বসবাসকারী কোনো বাসিন্দা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এরা কারা?
এই ইভেন্টের উদ্যোক্তা যিনি বা যারাই হন না কেন আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এ জাতীয় ইভেন্ট আমাদের জন্য একটি ভয়াবহ অশনি সঙ্কেত। আগামীতে আমরা কোনদিকে যাচ্ছি এটি সেই আলামত। আমরা যে আমাদের সন্তানদের বিকাশে সাংস্কৃতিক সঠিক শিক্ষাটি দিতে পারিনি, বোঝাতে পারিনি কোনটি বেডরুমে পর্দার আড়ালের ভেতরের কাজ আর কোনটি প্রকাশ্য দিনের আলোয় মাঠে ময়দানের? কোনটি কেবল শেয়াল-কুকুরদের কাজ আর কোনটি মানুষকে মানায়? কোন কথাটি কথার কথা, কোনটি প্রতিবাদ, কোনটি বালখিল্যতা আর কোনটি কেবলই সুস্থ মাথায় পরিকল্পিত অসভ্যতা! এ লজ্জা আমাদের! এর দায় আমাদের!
আধুনিকতার নামে আমরা আরও অনেক কিছুই করছি। মূলত অনুকরণপ্রিয়তায় আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগত অবস্থান সম্ভবত অন্য যেকোনো জাতির থেকে শীর্ষে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি অন্ধ প্রেমে অনুকরণে আমরা কয়েক কাঠি উপরে।
অন্য সংস্কৃতির ভালো কিছু সানন্দে গ্রহণ করাতে দোষের কিছুই নেই এবং সময়ের প্রয়োজনে সময়েরই হাত ধরে এক সংস্কৃতির উপাদান মেশে অন্য সংস্কৃতিতে। তাতে যুগে যুগে সমৃদ্ধ হয় সংস্কৃতি, এগিয়ে যায় সভ্যতা। তেমনই প্রত্যেক সমাজেরই নিজস্ব কিছু আচার-প্রথা আছে; আছে বৈশিষ্ট্য। যে বা যারা নিজের সংস্কৃতিকেই ধারণ করে না, নিজেকেই জানে না সঠিকভাবে সে অন্যেরটাই বা অতি সহজে গ্রহণ করে কীভাবে? সংস্কৃতি তো বিপ্লবের মাধ্যমে পরিবর্তনের বিষয় নয়। এটিকে লালন করতে হয়, ধারণ করতে হয়, চর্চার মধ্য দিয়েই একদিন এর অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো ঝরে যায়। তাকে জোর করে হটিয়ে দেবার দরকার পড়ে না। নিজের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে কেবল অন্ধকার কূপমণ্ডকরা। যা কিছু আমার, তাকে আমিত্বে ধারণ করতে পারার মধ্যেই মহত্ব।
উল্লেখ্য, গত দুই দশকে আমাদের ঢাকা শহরের ছেলে মেয়েদের মধ্যে বিদেশি উচ্চারণে বাংলা-ইংরেরি মিশিয়ে এক জগা খিচুড়ি ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করেছি। পোশাক-আশাকেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। শুনেছি খোদ ঢাকা শহরের আভিজাত এলাকাগুলোতেই এখন লিভ-টুগেদার হিসেবে বাড়ি ভাড়ার হিরিক পড়েছে। কিন্তু সেইসাথে তাল মিলিয়ে তাদের চিন্তা-চেতনার জগত কতটা এগিয়েছে, কতটা যুক্তিগ্রাহ্য হয়েছে জীবনবোধ? যারা এই লিভ টুগেদার করছে তারা কি পরবর্তী জীবনে আরেকটি লিভ-টুগেদার করা মেয়েকে জীবন সাথী হিসেবে মেনে নিচ্ছে কিম্বা ডিভোর্স হওয়া একটি মেয়েকে বিয়ে করছে স্বাচ্ছন্দ্যে? সমাজের ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বোধ, দেশপ্রেমবোধ কতটা ভাঙা গড়ার মধ্য দিয়ে পরিপক্ক হয়েছে নিজেদেরই বোধের অন্তরালে?
খুব নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া গত বছরের পহেলা বৈশাখে নারীর শ্লীলতাহানী, নিরীহ জনতার ওপর পুলিশের অন্যায়-অবিচার, দেশব্যাপী শিশু নির্যাতন, কিম্বা প্রতিনিয়ত দেশে ঘটে যাওয়া আরও অনেক অন্যায় অবিচারের প্রতিবাদে এই চুমু বিপ্লবীদের কজন রাস্তায় নেমেছিলেন? সংস্কৃতি তো তাই যা আমরা করি। বলতে দ্বিধা নেই আসলে এটাই আমরা, এটাই আমাদের ভেতরের প্রকৃত রূপ। আমাদের মধ্যে ভালো কিছু গ্রহণ না করে কেবল নোংরা ঘাঁটার রুচিই বর্তমান। শকুন তো নোংরা ঘেঁটেই আনন্দ পায়। শুকর যেমন কচুতেই যাবতীয় আস্বাদ গ্রহণ করে।
পাশ্চাত্যের মতো জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, মানবতার চর্চা তথা সামাজিক অন্যান্য যেসব আচার-প্রথা রয়েছে সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে আমরা রাতারাতি নেতিবাচক কিছু কাজের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে চাই। আজকের বাজার অর্থনীতির যুগে যেকোনো মূল্যেই পাবলিসিটি পেতে চাওয়াটাও একধরণের অসুস্থতা। আর এই রোগের নাম জনপ্রিয়তা আসক্তি।
একথা বলাই বাহুল্য পাশ্চাত্যের দেশসমূহে ফ্রি সেক্স নামে যে প্রচলিত রীতি আছে সেখানেও প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া কিম্বা বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রেও আছে প্রচলিত কিছু সামাজিক নিয়ম। আর সেটি রাতারাতি অন্য কোনো সংস্কৃতি থেকে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়নি। এবং খুব উল্লেখযোগ্যভাবে সত্য হল সেইসব সমাজে নারীরা অনেক বেশি স্বাধীন, অনেক বেশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইনি সুযোগ সুবিধে ভোগ করে।
অপরপক্ষে, আমাদের সমাজে যেখানে এখনও নারীর অসম্মান ডাল-ভাত। নারীরা সমাজের ক্রীড়নক। রাস্তা-ঘাট থেকে ঘরে-বাইরে অফিসে নারী কেবল পণ্য হিসেবেই গন্য। যেখানে নারীর আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে নারীর মানবাধিকার এখনও উপেক্ষিত সেই সমাজে নারীই করছে চুমুর জন্য বিপ্লব।
এটি অতীব কঠিন সত্য, একটি ভিত্তিকাঠামো ও ক্ষেত্রবিহীন সাংস্কৃতিক বিপ্লব কেবল অনাসৃষ্টিরই নামান্তর। রাতারাতি ইতিহাস হয়ে ওঠার এই ‘জনপ্রিয়তা আসক্তি’ থেকে বেরিয়ে এসে চলুন প্রমাণ করি, আজকের নারী কেবল ভোগ্য বস্তু নয়; নারীর শরীরে কেবলই মাংসের গন্ধ নেই। তরুণ প্রজন্মের এই নারীর মননেও আছে সমাজ চিন্তা, দেশাত্মবোধ, চেতনার আড়ালে আছে শেকড়ের টান। শেকড় ছিঁড়ে ফেলে অন্যের পোশাকে মুখ ঢেকে নয় বরং শেকড় খুঁড়েই তারা জানতে চায় আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস, আমাদের পরাজয়ের গ্লানি, আমাদের চেতনার গভীরের সব ক্ষত। তারা হৃদয়ে ধারণ করে বাংলাদেশকে। আর এই প্রজন্মের হাতেই এগিয়ে যাবে আজকের বাংলাদেশ। ভালো থাকবে প্রিয় স্বদেশ।
সঙ্গীতা ইয়াসমিন: কানাডা প্রবাসী লেখিকা।