চুইঝালের যতো কথা

মো. আবদুর রহমান:
চুইঝাল মসলা জাতীয় ফসল। এর কাণ্ড, শিকড়, শাখা-প্রশাখা সবই মসলা হিসেবে ব্যবহূত হয়। কাণ্ড বা লতা কেটে টুকরো টুকরো করে মাছ বা মাংস রান্নায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। রান্নার পর গলে যাওয়া সেসব টুকরো চুষে বা চিবিয়ে খাওয়া হয়। খুব ঝাল হলেও এর একটা অপূর্ব স্বাদ ও ঘ্রাণ আছে।

সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানসহ ঈদ পার্বণে চুইঝালের কদর অনেকগুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জেলা খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল এবং যশোর এলাকায় চুইঝাল মসলা হিসেবে খুব জনপ্রিয়। চুইঝালে ০.৭ শতাংশ সুগন্ধি তেল রয়েছে। অ্যালকালয়েড ও পিপালারটিন আছে ৫ শতাংশ। তাছাড়া রয়েছে পরিমাণমতো গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, গ্লাইকোসাইডস, মিউসিলেজ, সিজামিন ও পিপলাস্টেরল। কাণ্ড, পাতা, শিকড়, ফুল, ফল সবই ঔষধি গুণসম্পন্ন। চুইয়ের শিকড়ে রয়েছে ০.১৩ থেকে ০.১৫ শতাংশ পিপারিন, যা মানবদেহের জন্য খুবই উপকারী। চুইঝাল গ্যাস্ট্রিক সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। খাবারের রুচি বাড়াতে ও ক্ষুধামন্দা দূর করতে এটি কার্যকর। পাকস্হলী ও অন্ত্রের প্রদাহ দূর করতে এবং স্নায়ুবিক উৎতেজনা ও মানসিক অস্হিরতা প্রশমনেও বেশ উপকারী। এছাড়া শ্বাসকষ্ট, কফ, কাশি, ডায়রিয়া, শারীরিক দুর্বলতা ও গায়ের ব্যথা দূর করতে ভালো কাজ করে। চুইঝালে প্রচুর আইসোফ্লাভোন ও অ্যালকালয়েড নামক ফাইটোকেমিক্যাল রয়েছে, যা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। চুই লতা জাতীয় অর্থকরী ফসল। কাণ্ড ধূসর এবং পাতা কিছুটা লম্বা ও পুরু, দেখতে পানপাতার মতো সবুজ রঙের। চুইয়ের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম চরঢ়বত্ ঈযধনধ। পরিবার পিপারেসি (চরঢ়বত্ধপবধব)। চুই সাধারণত দুই রকমের হয়। একটির কাণ্ড বেশ মোটা ২০-২৫ সেন্টিমিটার, অন্যটির কাণ্ড চিকন, আকারে ২.৫ থেকে ৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। গাছ ১০-১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি এবং পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত ও ছায়াময় উঁচু জমিতে সাধারণত চুই চাষ করা হয়। নার্সারিতে পলিব্যাগে কাটিং থেকে উৎপন্ন দু’মাস বয়সের চুইঝালের চারা বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ( এপ্রিল-মে) এবং আশ্বিন-কার্তিক (অক্টোবর-নভেম্বর) মাসে রোপণ করা হয়।

অন্য গাছের আশ্রয় নিয়ে চুইঝাল বেড়ে ওঠে। এ কারণে আম, জাম, নারিকেল, সুপারি, মেহগনি, কাফলা বা জিয়ল গাছ বাউনি হিসেবে এটি চাষের জন্য ব্যবহূত হয়ে থাকে। তাই এ জাতীয় গাছের গোড়া থেকে ২৫-৩০ সেন্টিমিটার দূরে ৪৫ সেন্টিমিটার লম্বা, ৪৫ সেন্টিমিটার চওড়া ও ৪৫ সেন্টিমিটার গভীর করে গর্ত তৈরি করতে হয়। প্রতিটি গর্তের ওপরের স্তরের মাটির সঙ্গে পচা গোবর বা আবর্জনা পচা সার ৫ কেজি, ১০০ গ্রাম টিএসপি ও ১২৫ গ্রাম এমওপি সার ভালোভাবে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে ৮-১০ দিন পর গর্তের ঠিক মাঝখানে চুইঝালের চারা (কাটিং) রোপণ করে চারপাশের মাটি হাত দিয়ে হালকাভাবে চেপে বসিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনবোধে গোড়ায় আরো কিছু শুকনো মাটি দিয়ে চেপে বসিয়ে দিতে হবে, যাতে চারার চারপাশের মাটি জমির সমতল থেকে একটু উঁচু ও ঢালু অবস্হায় থাকে। তারপর গর্তে একটি খুঁটি কাত করে বাউনি হিসেবে ব্যবহূত গাছের সঙ্গে বেঁধে দিলে ৩০-৪০ দিনের মধ্যে তা গাছের কাণ্ডের সাহাঘ্যে ওপরে উঠে যাবে। এভাবে চুইগাছ বেড়ে উঠবে। বাউনি না দিলেও চুই ঝোপ আকারে মাটিতে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তবে এক্ষেত্রে বর্ষা মৌসুমে গাছের ক্ষতি হয়। চুইঝাল রোপণের এক বছরের মধ্যে খাওয়ার উপযোগী হয়।

ভালো ফলনের জন্য ৫-৬ বছরের গাছ উৎতম। এ বয়সের একটি গাছ থেকে ১০-১৫ কেজি চুই পাওয়া যায়। একজন সাধারণ কৃষক মাত্র ২-৪টি চুইগাছ চাষ করে নিজের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি চুই বাজারে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন। চুই শিকড় থেকে কাণ্ড পর্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হয়। বাজারে প্রতি কেজি চুই বর্তমানে সর্বনিম্ন ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা। এখন চুই দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। চুইয়ের চাষ করে দারিদ্র্যবিমোচন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও আর্থিক অবস্হার উন্নয়ন সম্ভব। তাই সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল চুইঝাল চাষের ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।-ইত্তেফাক