চীন বিপ্লবের মহানায়ক কমরেড মাও সেতুং – লাল সালাম

53

বিমল বিশ্বাস:

চীনের হুনান প্রদেশের শাংতান জেলার শাউ-শাং-চুং গ্রামের এক কৃষক পরিবারে ইংরাজী ১৮৯৩ সালের ২৬ শে ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন কমরেড মাও সেতুং। তাঁর পিতা মাও জেন শেং(শুন শেং) দরিদ্র কৃষক হলেও কয়েক বছর সেনাবাহিনীতে চাকরি করে জমিজমা ক্রয় করে অবস্থার উন্নতি ঘটান এবং কাঁচামালের ব্যবসা করে রীতিমতো মধ্যবিত্ত গৃহস্থ হয়ে ওঠেন। মাতা ওয়েন কুইমেই ও দুই ভাই সে সেন ও সে তান।
১৯০১সালে আট বছর বয়সে মাও গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হন। তার আগে থেকেই অতি অল্প বয়সে পিতার সাথে কৃষি কাজে সহযোগিতা করতেন এবং ১৩বছর বয়স পর্যন্ত পাঠশালাতে লেখাপড়া করেন।
১৯১৩-১৮ সাল পর্যন্ত টিচার্স ট্রেনিং স্কুলের পড়াশোনা করা কালীন সময়ে তিনি বিপ্লবী আন্দোলন সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারেন। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব যেমন সারা বিশ্বে সাড়া ফেলেছিল তেমনি চীনেও এর ঢেউ লাগে। রুশ বিপ্লব কমরেড মাও সে তুং সহ চীনের অনেকেরই চেতনার জগতে সাড়া ফেলে।
১৯১৮ সালে তিনি স্নাতক পাস করেন।এরপর বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী লাইব্রেরিয়ান হিসাবে কাজ করা শুরু করেন।ঐ সময়ে অনুবাদকৃত কমিউনিস্ট পার্টি ইশতেহার সহ ১৯১১সালের আফিম যুদ্ধ থেকে শুরু করে চীনের কনফুসিয়াস মেনসিয়াস ভাবাদর্শের উপর ব্যাপক পড়াশোনা করেন।
১৯১৯সালের ৪ঠা মে চীনে যে ছাত্র বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল সেটি কমরেড মাও সেতুং সহ অনেকেই ভূমিকা রেখেছিলেন।
১৯২০ সালে শাংহাই শহরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের যারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার মধ্যে কমরেড মাও সেতুং অন্যতম।
১৯২১ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেসে কমরেড মাও সেতুং উপস্থিত ছিলেন।
১৯২৪ সালে সান ইয়াৎ সেনের নেতৃত্বে কুওমিনতাংয়ের সাথে তিন নীতির ভিত্তিতে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ঐক্যবদ্ধ হয়।

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা,

সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের সাথে সহযোগিতা,

শ্রমিক কৃষক মৈত্রী।

এখানে উল্লেখ্য সান ইয়াৎ সেন যেমন দেশ প্রেমিক ছিলেন তেমনি কুওমিনতাঙ এর মধ্যে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিও ছিল।ঐ সময়ে হুয়াংফু(ক্যানটন) এ সামরিক প্রশিক্ষণ একাডেমী গঠিত হয়েছিল এবং প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন কমঃ মাও সেতুং,কমঃ চৌ এন লাই,কমঃ দিং শিয়াও পিং সহ আরো অনেকে।
১৯২৫ সাল থেকে কুওমিনতাঙ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীদের হত্যাযজ্ঞ শুরু করলো। ওই সময় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক চেনতুশির দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী লাইন অনুসরণ করেছিলেন। তার লাইন ছিল কুওমিনতাঙ এর সাথে শুধুই সহযোগিতা, সংগ্রাম নয়। কমরেড মাও সেতুং এই শ্রেণীর সহযোগিতার লাইনকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিরোধীতা করেন। কৃষকের অভ্যুত্থান ঘটাবার লাইন গ্রহণের প্রস্তাব করলে কমরেড মাও সেতুংকে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে অপসারিত করা হয়।
কমরেড মাও সেতুং হুনানের চাংশাই ফিরে আসেন।পার্টির অভ্যন্তরে চিনতুশিকে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অপসারিত করে ছুছিপাই নেতৃত্বে এসে যে লাইন গ্রহণ করেন তার মর্মার্থ ছিল দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদের লাইন।
১৯২৭সাল থেকে কমরেড দেং শিয়াও পিং প্রায় দুই বছর সময় ধরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।এরপর এলো লিলিসান লাইন- এর মূল কথা ছিল বড় বড় শহরে শ্রমিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করা এবং গ্রাম অঞ্চলে কৃষকদের মাঝে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া ও এই অভ্যুত্থানের লক্ষ্যের সমর্থন তৈরি করা।
১৯৩১সালে ১৮ই সেপ্টেম্বর জাপান যখন মাঞ্চুরিয়ার একাংশ দখল করে তখন, কমরেড মাও সেতুং জাপান বিরোধী প্রতিরোধের জন্য কুওমিনতাঙ এর সাথে চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানান। ঐ সময় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমঃ ওয়াংমিং তার বিরোধিতা করেন।কমঃ ওয়াংমিং প্রথমে দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী লাইন এবং পরবর্তীতে কুওমিনতাঙ এর সাথে ঐক্যের বিরোধিতা করে বাম হঠকারী লাইন গ্রহণ করেন।
১৯৩৪সালের সুনই অধিবেশনে পলিটব্যুরোর বর্ধিতসভায় কমরেড মাও সেতুং কে পার্টির চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। কমরেড মাও সে তুং জাপানের বিরুদ্ধে কুওমিনতাঙ এর সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার যে লড়াই শুরু করেছিলেন তা সফল পরিণতির দিকে এগোতে থাকে।
১৯৩৬সালের ১২ই ডিসেম্বর সিয়ানের বিদ্রোহে দুই জেনারেল চিয়াং কাই শেক কে গ্রেফতার করে।এতে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও কুওমিনতাঙ এর সাথে ঐক্যবদ্ধ হবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জিত হয়। সেনাবাহিনীতে চিয়াং কাই শেক এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন কমরেড চৌ-এন-লাই। কমরেড চৌ এন লাই নানজিং থেকে প্লেনে এসে চিয়াং কাই শেক এর সাথে চুক্তির সমস্ত কিছু প্রস্তুত করেন। পরে কমঃ মাওসেতুং এসে হাজির হয়ে চুক্তিপত্র চূড়ান্ত করেন, কমঃ মাও সেতুং ও কমঃ চৌ এন লাই ফিরে যান। কিন্তু তারপর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চাও কুও তাও বিদ্রোহ করে সেনাবাহিনীর একটি অংশ নিয়ে কুওমিনতাঙ এর সাথে যোগ দেয়। অবশ্য অল্প সময়ের মধ্যে বিদ্রোহীদের একটি অংশ আবার চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে ফিরে আসে।দেশ প্রেমিক এই দুই জেনারেলকে চিয়াং-কাই-শেক তার অনুসারী সেনাবাহিনীর এক অংশকে দিয়ে চীনা কারাগারে কারারুদ্ধ করে।
১৯২৭সাল থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির উপর যখন ঘেরাও দমন অভিযান শুরু হয় তখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি পশ্চাদপসরণের রণ কৌশল গ্রহণ করে। পশ্চাদপসরণ হতে হতে চুংকিং পাহাড়ে অবস্থান নেয়। চুংকিং পাহাড়ের ডাকাতদের বাহিনীতে সংঘটিত করে কিন্তু তাদের একটি ক্ষুদ্র অংশ লংমার্চ-এ অংশগ্রহণ করেছিল। চুংকিং পাহাড়ে ঘেরাও দমন ভেঙে কমরেড মাও সেতুং এর নেতৃত্বে শুরু হয় লংমার্চ। ১৪০০০ লি পথ অতিক্রম করতে গিয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সেনাবাহিনীকে অবর্ণনীয় কষ্ট করতে হয়।অভুক্ত অবস্থায় জুতার চামড়ার সাথে লবণাক্ত পানি দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতে হয়। লংমার্চে সমস্ত পথ জুড়ে কুওমিনতাঙ বাহিনীকে মোকাবেলা করতে করতে অগ্রসর হতে হয়েছিল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তাতু নদী পার হতে পারলেই হাজার হাজার মাইল মুক্ত এলাকা হয়ে যাবে।এই তাতু নদী পার হওয়ার সময় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সেনাবাহিনীর অনেককেই জীবন দিতে হয়। এখানেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কমরেড চৌ-এন-লাই। কমরেড চৌ-এন-লাই যখন ওয়াংফু সামরিক একাডেমির প্রশিক্ষক ছিলেন তখন, কুওমিনতাঙ বাহিনীর এক কর্মকর্তা তার ছাত্র ছিলেন।সেই সুবাদে কমরেড চৌ-এন-লাই কে তিনি ছেড়ে দেন। কমরেড মাও সেতুং ৯ রুবল ঘুষ দিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন (আমাদের দেশে কমরেড মাও সেতুংয়ের এই ঘুষকে থানা-উপজেলা-জেলখানা-কারামুক্তি ও আদালতে ঘুষ দেওয়াকে জাস্টিফাই করে যা মোটেও ঠিক নয়)।এই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বীরদের “হিরো অফ তাতু” বলে আখ্যায়িত করা হয়। তাতু নদী পার হওয়ার ফলে ১১০০০ বর্গ কিলোমিটার চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে মুক্ত এলাকা হয়ে যায়।
১৯৪৩ সালে কমরেড দেং শাও পিং এর নেতৃত্বে চিয়াং কাই শেকের কয়েকটা বড় বড় বাহিনী উড়িয়ে দিয়ে ওহান যুদ্ধে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বীজয় লাভ করে।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি কালে জাপান পরাজিত হলে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জন্য অনেক সুযোগ তৈরি হয়।
১৯৪৬ সালে গৃহযুদ্ধের সময় কালে চিয়াং-কাই-শেক বাহিনী পরাজিত হয় এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হয়।এই সময়কালে চিয়াং-কাই-শেক চিনা বিপ্লবের মোড় পরিবর্তনের মহানায়ক দুই জেনারেল কে নিয়ে তাইওয়ান পালিয়ে যায় এবং ঐ দুই জেনারেলকে কারারুদ্ধ করে। তাঁরা অবশেষে তাইওয়ান কারাগারেই দীর্ঘদিন বন্দী থেকে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
১৯৪৯ সালের ১লা মে বেইজিং শহরের তিয়েন-মিয়েন স্কয়ারে চারিদিক থেকে বিজয়ী বিপ্লবী সৈন্যবাহিনী মিলিত হলে তার সাথে যুক্ত হয় লক্ষ লক্ষ জনতা। বিজয় উল্লাসে মুহুর্মুহু করতালি মধ্যে কমরেড মাও সে তুং বিপ্লবে বিজয়ের ঘোষণা দেন ও জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেন।চীনের সফল বিপ্লবে সারা বিশ্বের কমিউনিস্ট পার্টি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সকল শক্তি এবং বিশ্বের নিপীড়িত জাতীয় জনগণ প্রচণ্ড ভাবে উৎসাহিত হয়েছিলেন।

ভূমিকায় যেমন রচনার শুরু, শ্রমিক শ্রেনীর রাষ্ট্রক্ষমতা দখলও এক অর্থে তাই । এটি সামাজিক রূপান্তরের সূচনা মাত্র। যাত্রাপথে সমস্যা বহুবিধ । সদ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানো শ্রেনীর সামাজিক প্রতিরোধ, পুরাতন সমাজের মতাদর্শগত – সাংস্কৃতিক প্রভাব, গ্রাম শহরের অর্থনৈ্তিক আন্তসম্পর্ক ও শ্রমিক-কৃষক দ্বন্দ্ব, উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কে দ্বন্ধ , র্পাটি ও রাষ্ট্রে আমলাতান্ত্রিকতার উদ্ভব ইত্যাদি অনেক ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করে তাকে সামনে এগুতে হয়।

১৯৫৮ – থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত চীনের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ভিত্তি ছিল চীন বিপ্লবের অবিসংবাদিত নেতা কমরেড মাও সে তুং এর সামাজিক ’’উল্লম্ফনের তত্ত্ব (great leap forward)’’। তিনি কৃ্ষি সমবায়ীকরন ও দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে একটি কৃ্ষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সমাজতান্ত্রিক সমাজে উত্তরণের পরিকল্পনা করেছিলেন । তার এই নীতি বাস্তব ভিত্তিক ছিলনা ,ছিল একপেশে ও আত্মগত (Subjective) । যদিও লক্ষ্য ছিল মহৎ। ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সামগ্রিক ভাবে চীনের অর্থনৈ্তিক উন্নয়নের পথে জটিলতা সৃষ্টি হয়।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে কমরেড মাও সে তুং এর উল্লম্ফনের তত্ত্ব পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটিতে তীব্রভাবে সমালোচিত হয়। এ সময় পার্টির সভাপতি ছিলেন কমরডে মাও সে তুং এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কমরডে লিও শাও চি। পরবর্তীকালে ১৯৬২ সালে পার্টির অভ্যন্তরে কমরডে মাও সে তুং চীন বিপ্লবের অন্যান্য দিকপাল কমঃ লিউ শাও চি ,কমঃ চৌ এন লাই,কমঃ র্মাশাল যু দে , কমঃ দেং শিয়াও পিং, কমঃ হো লুং সহ পরীক্ষীত কমরেডদেরকে ‘’সংশোধনবাদী ও পুজিবাদের পথ যাত্রী ’’ মনে করতে থাকেন। তিনি এ সময় প্রায় তিন মাস লোক চক্ষুর অন্তরালে ছিলেন।এর পর ইয়াংশি নদীতে সাঁতার কাটার মাধ্যমে তিনি পুনরায় জনসম্মুখে হাজির হন। ‘’ পুঁজিবাদের সদর দপ্তরে কামান দাগো” এই আহবান সম্বলিত একটি পোষ্টার সাঁটার মাধ্যমে কমরেড মাও সে তুং পরবর্তী দশ বছর স্থায়ী সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করেন।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অন্যতম টার্গেট ছিলেন চীনের রাষ্ট্র ও কমিউনিস্ট পার্টির দায়িত্বশীল পদে আসীন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ , যারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে বাম হঠকারিতার বিরুদ্ধাচারণ করে ছিলেন। ফলে চীনের সমাজ ও রাজনীতিতে অভুতপুর্ব বিশৃঙখলা দেখা দেয়। যার পরিনামে সারাদশে গুরুত্বর্পূণ বিশিষ্ট নেতাদের অনেকেই উৎপীড়িত, গ্রেপ্তার এবং কারারুদ্ধ হন। কমরেড লিউ শাওচি ১৯৬৯ সালে কারাগারে অন্তরীন অবস্থায় শোচনীয় মৃত্যুবরণ করেন। কমরডে হো লুং ছিলেন ডায়াবেটিকস এর রোগী। তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করবার জন্য তাকে খাবার হিসেবে দেয়া হতো মিষ্টি জাতীয় খাবার।চেন পো তা,,লিন পি য়াও ,চিয়াং চিং সহ অনেকেই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে নানা ধরনের অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকেন। ঐ সময়ে চীনা কমিউিনিস্ট র্পাটির অষ্টম ও নবম কংগ্রসে তত্ত্বগত যে বিরোধ, সে সর্ম্পকে আমি কোনো বিস্তৃত আলোচনায় যাচ্ছি না।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বাম হঠকারী লাইন বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলন কে ভুল পথে যেতে প্রভাবিত করেছিল। তার মধ্যে কম্পুচিয়ায় বিপ্লবের নামে পলপটকে সর্মথন করা, নকশালবাড়ি আন্দোলনকে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ আখ্যায়িত করা, ভারতের মোশাহাররি অভ্যুত্থান, অন্ধ্রে শাক্যগুলামরে লাল ফৌজ গঠনে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সর্মথন ইত্যাদির ফলে উপমহাদেশের কমিউনিষ্ট আন্দোলনের প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। উল্লেখ্য ওই সময়ে কমরডে কাং সেং ছিলেন দক্ষিন এশিয়া ডেস্কের দায়িত্বে। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে কমরেড কাং সেং চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে ভুল পথে পরিচালিত করেছিলেন। তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারী হয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে সক্রিয় ভুমিকা রেখেছিলেন । কমরেড মাও সে তুং এর ত্রিবিশ্ব তত্ত্বের ভ্রান্তি ইতিমধ্যে সপ্রমাণিত । ত্রিবিশ্ব তত্ত্বের নামে উদ্ভট শ্রেনী সমঝোতার লাইনের ওকালতি করা ছিল তার ভুল । এসব ভ্রান্তি সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়কালেও চীনে কৃষি-শিল্প সহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল।ঐ সময় চীনে ভূ-উপগ্রহ স্থাপন ও মহাশূন্য অভিযাত্রার ক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয় অগ্রগতি অর্জিত হয়।

কমরেড স্তালিন ১৯৩৭ সালে ’’ দ্বান্দিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’’ বইতে উল্লেখ করেছিলেন, সোভিয়েত সমাজ ব্যবস্থায় আর কোন শ্রেনী দ্বন্দ্ব নেই । কিন্তু মৃত্যুর আগে সমাজতন্ত্র নির্মানের অভিজ্ঞতার সারসঙ্কলন করে তিনি সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রেনীদ্বন্দ্বের অস্তিত্ব আছে বলে সিদ্ধান্তে উপনীত হন । তিনি ‘’ সোভিয়েত রাশিয়ার অর্থনৈতিক সমস্যাবলী’’’বইয়ে বিষয়টি তুলে ধরেন । কমরেড মাও সে তুং এই সিদ্ধান্ত কে আরো পরিবর্ধিত করেন । তিনি অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন,’’ বৈরী শ্রেনী গুলির মধ্যে কে জিতবে কে হারবে সমাজতান্ত্রিক সমাজেও সে সমস্যার চুড়ান্ত সমাধান হয়ে যায় নি। ‘’ শ্রমিক শ্রেনীর সংগ্রামের ক্ষেত্রে এটি এক মুল্যবান শিক্ষা।চীন বিপ্লব এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেনীর আন্দোলনে কমরডে মাও সে তুং এর অবদান বিশাল। কিন্তু সর্ব্ বিষয়ে তিনি অভ্রান্ত ছিলেন না।

কমরডে মাও সে তুং ও চীনা কমউিনিস্ট পার্টির সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে মূল্যায়ন করা সঠিক ছিলনা। তবে এটি আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভাঙ্গনের অনেক পরবর্তী কালের ঘটনা। এই ভাঙ্গন অবধারিত ছিলনা। ১৯৫৬ সালের সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে তৎকালীন ১২ টি কমিউনিস্ট পার্টির সম্মলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত এবং ১৯৬০ সালে ৮১ পার্টির সম্মেলনে যে সমঝোতা হয়েছিল তা মেনে নিলে তার ভিত্তিতে সোভিয়েত ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙন এড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ ছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি নেতা ক্রশ্চভের দক্ষিনপন্থি সুবিধাবাদী চিন্তা, শান্তিপূর্ণ উত্তোরণ , শান্তিপূর্ণ সহযোগিতা , শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা এবং চীন থেকে একতরফা সকল সাহায্য স্থগিত ও বিশেষজ্ঞ প্রত্যাহার সম্পর্কের অবনতির জন্য বহুলাংশে দায়ী। অধনবাদী পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ, জনগনের পার্টি, জনগনের রাষ্ট্র, বিপ্লব রফতানীর আফগান লাইন এসবই ছিল বিভ্রান্তিকর। কাজেই প্রাক্তন মস্কো পন্থীদের অভ্রান্ত লাইনের দাবি বা ভাঙনের জন্য প্রাক্তন পিকিংপন্থীদের দিকে আংঙ্গুল তোলার কোন সারবত্তা বা যুক্তি নেই। ১৯৮৩ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে পিকিং,, সাংহাই, নানজিং, ওয়াংচৌ প্রভৃতি প্রদেশের নেতাদের সাথে আলোচনা, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন দলিলাদি পর্যালোচনা, আমার ব্যক্তিগত প্রয়োগ লব্ধ অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি এই লেখার ভিত্তি। যে সব চীনা নেতাদের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে তাদের অনেকেই মাও সে তুং এর নে্তৃত্বে লংর্মাচে অংশ গ্রহন এর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং পরীক্ষিত বিপ্লবী নেতা। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একাদশ কংগ্রেস , ১৯৭৭ সালের প্লেনারি সেশনে গৃহীত চার করণীয় এবং সমাজতান্ত্রিক আধুনিক চীন বিনির্মাণে বর্তমানে যে লাইন অনুসৃত হচ্ছে ,সে সর্ম্পকে পরর্বতীতে লেখার আশা পোষন করি।

যারা কমরেড মাও এর অবদান,আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভাঙ্গন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এর পটভুমি সম্পর্কে বিশেষ জিজ্ঞাসু ,তাদের উদ্দেশ্যেই আমার এই লেখা। যদি এই লেখা এসব প্রশ্নে কিঞ্চিত হলেও আলোকপাত করে তাহলে শ্রম সার্থক হয়েছে বলে মনে করব। সবমিলিয়ে আমার আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডে কিছু মাত্রায় হলেও বিস্তারিত বলার চেষ্টা করেছি।-লেখকঃ কমরেড বিমল বিশ্বাস, প্রখ্যাত প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা।