চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উম্মোচন

মামুন ফরাজীঃ
বাংলাদেশ সফর করে গেলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সাড়ে ২২ ঘন্টার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এই সফরকালে তিনি বন্ধুত্ব দৃঢ় করার খেলায় যে পারদর্শীতার স্বাক্ষর রেখেছেন তা সত্যিই অভাবনীয়। তার এই সফরের মধ্যদিয়ে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উম্মোচন হয়েছে। নতুন দিগন্তে পৌছে যাওয়ার এ দৃশ্য বাংলাদেশের জনগণতো বটেই বিশ্ববাসীও প্রত্যক্ষ করেছে।
তার সফর ঘিরে যে জল্পনা-কল্পনা, হিসেব-নিকেশ চলছিল; প্রাপ্তি তার চেয়ে অধিকতর। স্বল্প সময়ের এ সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ইকোনমি, বিসিআইএম-ইসি, সড়ক ও সেতু, রেলওয়ে, বিদুৎ, মেরিটাইম, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প উন্নয়ন খাতে ২৭টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। যদিও সফরের আগের খবর ছিল ২৫টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে। চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের আওতায় ১২টি প্রকল্পে ঋণ দেবে চীন। একই সঙ্গে চীনের অর্থায়নে ৬টি মেগা প্রকল্পের ফলক উন্মোচন করা হয়েছে।

শি’র সফরকালে ১৩৬০কোটি ডলারের ১৩টি যৌথ বানিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি বেসরকরি পর্যায়ে। এসব চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের গার্মেন্টস চামরা, ওষুধ, সিরামিকসহ বেশ কয়েকটি খাতে বিনিয়োগ করবে চীন। কল্পনায়ই ছিলনা স্বল্প সমেয়র এ সফরে এতোগুলো চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তি প্রত্যাশা অতিক্রম করেছে।
চুক্তি অনুযায়ি কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মান, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারাখান নির্মানসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দেবে চীন। এর মধ্যে কর্ণফুলী নদীতে টানেল, শাহজালাল সার কারখানা, বাংলাদেশ ফোর টিয়ার ন্যাশনাল ডেটা সেন্টার, পায়রায় ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদুৎকেন্দ্র, চট্টগ্রামে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদুৎ কেন্দ্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট নির্মান প্রকল্পের ফলক উন্মোচন করেছেন শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
যেসব ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে তাহলো- এক অঞ্চল-এক পথ, তথ্যপ্রযুক্তি, সন্ত্রাসবাদ দমন, সামুদ্রিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা।

‘এক অঞ্চল-এক পথ’- শি জিনপিংয়ের চিন্তাপ্রসূত নীতি; যার লক্ষ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নের মাধ্যমে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে এক সূতোয় গাঁথা। বাংলাদেশ চীনের এই নীতিতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। একসঙ্গে এতোগুলে চুক্তি ও সমঝোতা এর আগে কোন দেশের সঙ্গে হয়নি। বেসরকারি খাতে ১০টি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি হওয়ায় বাংলাদেশী ব্যবসায়িরা অতিশয় উজ্জিবীত। তারা বলেছেন, এসব চুক্তি বাংলাদেশকে ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
সারে চার দশক আগে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হয়। এর পর থেকে সব সরকারই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা চেষ্টা রাখে। কিন্তু শি জিনপিংয়ের এবারের ঢাকা সফর এবং সফরকে ঘিরে যা হয়ে গেল, তা সত্যিই অভাবনীয়। এই সফরের মধ্যদিয়ে চীন- বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন এক উচ্চতায় পৌছে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পূর্বমূখী পররাষ্ট্রনীতির কারনেই এটা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নে আঞ্চলিক সহযোগিতা তথা কাছের দেশগুলোর সঙ্গে সৌহার্দ্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতে বিশ্বাসী শেখ হাসিনা। অনেকে মনে করতে পারেন চীনের সঙ্গে বেশি দহরম মহরমে বাংলাদেশের প্রতি নাখোশ হতে পারে ভারত। কিন্তু না। বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ভিত্তি সামরিক নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিনিময়ের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নই দু’দেশের সম্পর্কের ভিত্তি। ১৪ অক্টোবর যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলো স্বাক্ষরিত হয়েছে তার মধ্যে সামরিক কোন উপাদান নেই। কাজেই এতে ভারতের অখুশী হওয়ার কারন নেই। সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতকে যে রকম গুরুত্ব দেয়; চীনকেও সে রকমই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে পক্ষ অবলম্বনের কিছু নেই। বাংলাদেশের নিকট অতীতের কূটনৈতিক কর্মকান্ড বিশ্লেষণ করলে এই বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রক্ষা করে চলছে। বিভিন্ন ফোরামে এক হয়ে কথা বলছে। এতে কিন্তু চীন বিগড়ে যায়নি। যদি বিগড়ে যেতো ঢাকায় চীনের প্রেসিডেন্টের পদধূলি পড়তো না। আর এতোগুলো চুক্তিও হতো না। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ নীতিকে ভারসম্যের কূটনীতি বলে অবিহিত করা যায়। আসলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তিই হলো-‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়।’ আর এই একটি বাক্যের মধ্যেই ভারসাম্যের কূটনীতির বিষয়টি নিহিত।
আসলে কোন একক দেশের প্রতি বাংলাদেশের নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। কারন সব সহযোগিতা কোন একক দেশ থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। অনেক সহযোগিতা আছে যেটা চীন দিতে পারবে, কিন্তু ভারত পারবে না। আবার অনেক সহযোগিতা আছে যেটা ভারত দিতে পারবে, চীন পারবে না। কাজেই বাংলাদেশকে ভারসাম্যের নীতি অনুসরন করে চলাই উচিত। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানগত বিবেচনায় বাংলাদেশ খুবেই সুবিধাজনক জায়গায়। ভারত-চীন উভয়েরই বাংলাদেশকে দরকার। তাই এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের সম্পর্ক বৃদ্ধিতে তৃতীয় দেশ নাখোশ হবে- এ ধরনের চিন্তা অবান্তর। তাই এ মুহুর্তে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে ভারসাম্যের কূটনীতিই অনুসরন করাই সঠিক পথ।- লেখকঃ সাংবাদিক