চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একশো এক বছর

সৈয়দ আমিরুজ্জামান :

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একশত এক বছর পূর্ণ হয়েছে এবার। দিবসটি উদ্‌যাপন উপলক্ষে সেজে উঠেছে সমগ্র চীন। ১৯২১-র ১ জুলাই সাংহাইয়ে পার্টির প্রথম কংগ্রেস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টি তৈরি হয়। বিগত একশ এক বছর চীনের ইতিহাসে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে পার্টি। পার্টি গঠনের ২৮ বছরের মাথায় বিপ্লবের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে ‘নয়া চীন’। কমিউনিস্ট পার্টির গণ মুক্তি ফৌজ ১৯৪৯ সালে আমেরিকা সহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির কৃপাধন্য শাসকদের পরাজিত করে এবং চীনে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে। চীনে কমরেড মাও সে তুংয়ের বিপ্লবের প্রধান শক্তি ছিল তাঁর বিশাল কৃষক সৈনিক বাহিনী।
জনগণের জীবনের বিপুল পরিবর্তন এনে দিয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন। তার প্রতিফলন পড়ছে উৎসবের চেহারায়। দেশজুড়ে আলোকসজ্জা, পার্টির পতাকা ও প্রতীকে সাজানো ফুলের বাগান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনীতে পার্টির সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার কথাই উচ্চারিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তরফ থেকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকেই ‘প্রধান শত্রু’ হিসাবে যখন চিহ্নিত করা হচ্ছে তখন চীনের পার্টিও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করছে নিজের ইতিহাসের খোলা পৃষ্ঠা তুলে ধরে।
২০২১ সালে শতবর্ষ উদযাপনের প্রাক্কালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠন সংক্রান্ত দপ্তর পার্টির সাংগঠনিক চিত্রের একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। এই রিপোর্ট অনুসারে পার্টির মোট সদস্য ৯ কোটি ৫০ লক্ষ। পার্টি তৈরির সময়ে ৫৭ জন সদস্য ছিলেন। ১৯৪৯ থেকে সদস্যসংখ্যা বেড়েছে ২০ গুণ। ২০০০-র ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৫ জুন পর্যন্ত নতুন সদস্য হয়েছেন ৩২লক্ষ। এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন ২৩ লক্ষ নতুন সদস্যপদ পেয়েছেন। ২০১৯ থেকে হিসাব করলে সদস্যপদ বৃদ্ধি হয়েছে ৩.৫ শতাংশ।
এই রিপোর্ট অনুসারে পার্টি সদস্যদের ৭১.২ শতাংশ পুরুষ, ২৮.৮ শতাংশ মহিলা। ৩০ বছরের নিচে পার্টিসদস্য ১ কোটি ২৫ লক্ষ। ৩১-৩৫ বয়সি ১ কোটি ১১ লক্ষ। পার্টি সদস্যদের ২৪.৯ শতাংশের বয়স ৩৫-র কম। ৩৬-৪০ বয়সি ৯৩ লক্ষ। ৪১-৪৫ বয়সি ৮৭ লক্ষ। ৪৬-৫০ বয়সি ৯৩ লক্ষ। ৫১-৫৫ বয়সী ৮৬ লক্ষ। ৫৬-৬০ বয়সী ৮৩ লক্ষ। ৬১-র বেশি ২ কোটি ৬৯ লক্ষ। শ্রমিক-কৃষক মিলিত ভাবে মোট সদস্যদের ৩৩.৯ শতাংশ। পেশাগত দিক থেকে কৃষক, প্রাণীসম্পদ পালনকারী, মৎস্যজীবী ২কোটি ৫৮ লক্ষ। টেকনিশিয়ান ৬৪ লক্ষ। বিভিন্ন এন্টারপ্রাইজ, সরকারি সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনে কর্মরত পেশাদার ১ কোটি ৫০ লক্ষ। বিভিন্ন সংস্থার ম্যানেজার ১ কোটি। পার্টি ও সরকারের কর্মী ৭৭ লক্ষ। ছাত্র ৩০ লক্ষ, অন্যান্য পেশায় নিযুক্ত ৭২ লক্ষ। অবসরপ্রাপ্ত ১ কোটি ৯০ লক্ষ। ৫২ শতাংশ জুনিয়র কলেজ স্তর বা বেশি শিক্ষা লাভ করেছেন।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছিল ১৯২১ সালে, সাংহাইয়ে এক গোপন আস্তানায়। ১৯২৭-এ জিয়াঙশি প্রদেশের জিয়াঙশানে প্রথম গ্রামীণ বিপ্লবী ঘাঁটি তৈরি হয়। ১৯৩৪ সালে লাল ফৌজ শুরু করে লং মার্চ। ১৯৩৭ সালে জাপ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র বিরোধী লড়াই জয়ী হয় ১৯৪৯ সালে। তৈরি হয় গণপ্রজাতন্ত্রী চীন। ১৯৫০-এ শুরু হয় মুক্ত অঞ্চলে ভূমি সংস্কারের কর্মসূচি। চীনের স্বেচ্ছাসেবকরা কোরিয়ায় মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেয়। ১৯৬০-র দশকে গণকমিউন ব্যবস্থার সঙ্গেই বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন ঘটতে থাকে। সাফল্য সত্ত্বেও কিছু সমস্যাও তৈরি হয় এই সময়ে। ১৯৬৬ থেকে প্রায় দশ বছর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফলে চীনে উথাল পাতাল ঘটে। পরবর্তীকালে চীনের পার্টি এই অভিযানকে ভ্রান্ত বলেই চিহ্নিত করেছে। ১৯৭৮ সালে একাদশ কেন্দ্রীয় কমিটির তৃতীয় অধিবেশনে সংস্কারের কাজ শুরু হয়। ১৯৮১ থেকে তা নির্দিষ্ট চেহারা পেতে শুরু করে। চীনের অর্থনীতি দ্রুত গতিতে এগিয়েছে।

শতবর্ষের প্রাক্কালে এই ইতিহাসের নানা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিকে প্রদর্শনী ও পর্যটন স্থলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। সাংহাইয়ের পার্টি গঠনের বাড়িতে স্থায়ী মিউজিয়াম তৈরি হয়েছে। সেখানে দর্শকদের দীর্ঘ সারি শুরু হয়ে গেছে। পার্টি গঠনের সময়ে উপস্থিত নেতাদের প্রতিমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, তাঁদের তখনকার চেহারাতেই। ১৯৪৯ সালের পর প্রথম পার্টি কংগ্রেস ছিল অষ্টম কংগ্রেস। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে যেখানে সেই কংগ্রেস হয়েছিল সেখানেও এক স্থায়ী প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়েছে। ওই কংগ্রেস থেকেই সমাজতন্ত্র গঠনের মৌলিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ‘পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের’ রেড হাউসও উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এক সময়ে মহান নেতা কমরেড মাও সেতুং ও অন্যান্য নেতারা এখানে থাকতেন।
বেইজিংয়ে বড় আকারে অনুষ্ঠান হয়। সেখানে চীনের পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড শি জিনপিঙ ভাষণ দেন। বেশ কয়েকটি নতুন পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেন তিনি।
কমরেড শি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ভাষণ দিয়েছেন। তার এই ভাষণে তিনি আধুনিক চীনে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। বলেছেন চীনের উন্নতি এই দলটির কর্মসূচির একেবারে কেন্দ্রে এবং জনগণের কাছ থেকে এই দলটিকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা সফল হবে না।
“একমাত্র সমাজতন্ত্র চীনকে রক্ষা করতে পারবে, এবং চীনা ধাঁচের সমাজতন্ত্রই পারবে চীনের উন্নয়ন ঘটাতে,” বলেন তিনি।
তিনি বলেন, “কেউ আমাদের ভয়ভীতি দেখাতে পারবে না, নিপীড়ন করতে পারবে না এবং চীনকে পরাভূত করতে পারবে না।”
“কেউ যদি সেটা করার সাহস দেখানোর চেষ্টা করে, চীনের গ্রেট ওয়াল অব স্টিলে তার মাথা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রক্ত ঝরবে, যা ১৪০ কোটি মানুষ তৈরি করেছে।”
চীন বারবারই অভিযোগ করে আসছে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রবৃদ্ধি থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি তার ভাষায় “নতুন পৃথিবী” সৃষ্টির জন্য তার জনগণের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া এই পৃথিবী তৈরি হতো না।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে জনতার মাথার উপর দিয়ে সামরিক বিমান এমনভাবে উড়ে যায় যাতে ১০০ সংখ্যাটি ফুটে ওঠে।
সমবেত জনগণ সেসময় সমস্বরে একটি গান গেয়ে ওঠে যার মূল কথা: “কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া নতুন চীন হতো না।”
চীনা বিপ্লবের মহান নেতা কমরেড মাও সেতুং পরবর্তী সময়ে চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা কমরেড শি। তার অধীনে কমিউনিস্ট পার্টি চীনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। কোভিড মহামারী জয় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অবস্থান শক্ত করা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই এগিয়েছে চীন।
গোপনীয়তা রক্ষা ও কড়া নিরাপত্তাজনিত কারণে শত বর্ষপূর্তি পালনের দিনটিতে ঠিক কী কী আয়োজন থাকছে সে ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ওড়ানো হতে পারে এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
দলটির দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সদস্যদের সম্মানার্থে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট শি বলেন, “গত ১০০ বছরে চীনের রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন এবং মানবতার প্রসারের ইতিহাসে এক যুগান্তকরী অধ্যায় রচনা করেছে কমিউনিস্ট পার্টি।”
কমরেড শি জিনপিং কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় প্রভাব বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছেন। ২০১২ সালে তিনি পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন এবং ২০১৩ সালের মার্চে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট হন। এরপরই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরেন তিনি। তার সময়েই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে ৯ কোটির বেশি সদস্য রয়েছে এ দলে।
তবে পার্টি শক্তিশালী হলেও শি জিনপিং- এর আমলে চীনকে অনেক চ্যালেঞ্জেরও সম্মুখীন হতে হয়েছে। হংকং, শিনজিয়াং, তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর তীব্র সমালোচনার শিকার হয়েছে চীন। এ সমস্ত ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে চীনের উত্তেজনাও বেড়েছে।
আবার কোভিডের উৎপত্তি এবং প্রথমদিকে তা সামাল দেওয়া নিয়ে চীন আন্তর্জাতিক মহল থেকে চাপের মুখে আছে। মহামারী করোনায় পুঁজিবাদী উন্নত রাষ্ট্রগুলো যখন দিশেহারা, তখন সমাজতান্ত্রিক চীন নিজের দেশকে করোনার ছোবল থেকে রক্ষা করে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে ছুটে গিয়েছে দুনিয়ার দেশে দেশে। সমালোচকদের নিন্দাকে উপেক্ষা করে বিশ্ব মানবতার কল্যাণে চীন দাঁড়িয়েছে মানুষের পাশে।
তবে এতকিছুর পরও দেশে কমিউনিস্ট পার্টির জনপ্রিয়তা কমেনি। এখনও এ পার্টিকে আরও ১০০ বছর ক্ষমতায় দেখতে আগ্রহী প্রগতিশীল শক্তির সকলেই।

-লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।