গোপনে শারীরিক সম্পর্ক করছে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা

228

ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধাঃ
বাংলাদেশ পশ্চিমা রাষ্ট্র না। এর সংস্কৃতি, মানুষের ধরন, ধর্ম সবকিছু আলাদা। সবই বুঝলাম। কিন্তু এসব ইসলামী রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বলে আদৌ কি কোন লাভ হচ্ছে? ইসলামী রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বলে আদৌ কি কোন লাভ হচ্ছে?
প্রতিদিন বাংলাদেশে অগণিত ধর্ষণ হচ্ছে। লোক-লজ্জার ভয়ে কত নারী-পুরুষ তা লুকিয়ে রাখছেন, তার ইয়ত্তা নেই। পত্রিকায় আসছে শুধু খুন হয়ে যাবার পর! কতজন পরিমলের বিরুদ্ধে মানুষ দাঁড়াচ্ছে বলুন? আমাদের মগজ ধোলাই করে রাখা হচ্ছে ধর্মের নামে। বলা হচ্ছে, বিয়ের আগে কোন মেয়ে যৌন-সম্পর্কে জড়ালে সে আর সতী থাকবে না।
আমাদের দেশের বেশিরভাগ পুরুষ নিজে একশ ঘাটের পানি খেলেও বিয়ের সময় এমন নারীর সন্ধানে থাকবে; যার যোনি পর্দার রক্তে বাসর রাতে বিছানার চাদর লাল হবে। তারা গর্ব করে বলেও আমার সতীবউ। সেই বউ কি একই গর্ব করতে পারে? বউ কি জানে, বিয়ের আগে তার স্বামী যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছে কিনা? কিংবা কতবার -কতজনের সঙ্গে তার পতিদেব যৌনতার স্বাদ নিয়েছে? আর নেয়াটা তো স্বাভাবিক। কিন্তু একজন নারীর বেলায় তা হয়ে যায় পাপ। কেন? কারণ, আমরা সমাজব্যবস্থাকে এমনভাবে বেঁধে রেখেছি যা কিনা আমাদের নারীদের যৌন চাহিদা অবদমন করতে শেখায়।
আমাদের সমাজে মেয়েরা কেন পারে অবদমন করতে, আর পুরুষেরা পারে না? মেয়েদেরকে যেভাবে ছেলেবেলা থেকে চোখে চোখে রাখার ব্যবস্থা করা হয়, ছেলেদের বেলায় তা হয় না। বলা হয়ে থাকে, একজন পুরুষের গায়ে দাগ লাগে না, কিন্তু একজন নারীর গায়ে সহজেই দাগ লাগে।
দাগ লাগাটা কি? – যৌনপর্দা ফেটে যাওয়া। সে তো একটা মেয়ে খেলাধুলা করলেও হতে পারে। তাই আমাদের দেশে মেয়েদের খুব সহজে ভারী কোনও খেলায় অংশগ্রহণ করতে দিতে রাজী হন না আমাদের অভিভাবকরা। অথচ পশ্চিমা রাষ্ট্রে যখন ক্লাস ফোর থেকে যৌনশিক্ষা দেয়া হয়, তখন এসব নারী যৌনপর্দার ধারও ধারে না শিক্ষকরা/ অভিভাবকরা। দাপটে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যেকোনো খেলায় অংশগ্রহণ করে। কেউ বলে দেয় না- ফুটবল ছেলেদের খেলা আর হাঁড়ি-পাতিল কিংবা পুতুল দিয়ে খেলা হচ্ছে মেয়েদের খেলা। একজন ডাক্তার এসে শিক্ষকদের সঙ্গে বসে ছাত্র-ছাত্রীদের ধারণা দেন- কিভাবে তারা এ পৃথিবীতে এলো। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে একই শ্রেণীতে বসে সেই শিক্ষাগ্রহণ করে।
এতে কি ধর্ষণ বেড়ে গেছে? না, বাড়েনি। বরং কারো মাঝে যদি যৌন-সম্পর্কের সৃষ্টি হয়, তা হয় স্বেচ্ছায়, জোরপূর্বক নয়।
ইউরোপে কি ধর্ষণ হয় না?
অবশ্যই হয়, কিন্তু সংখ্যাটা দেখতে হবে। কেন অঢেলভাবে ধর্ষণ হয় না বলতে পারেন? – হয় না কারণ, প্রথমত: এখানে যৌনতাকে ট্যাবু করে রাখা হয় না। ১৬ বছর হয়ে গেলে এখানকার বাবা-মায়েরা মনে করেন, তাদের ছেলেমেয়েদের বয়স হয়েছে যৌনসম্পর্ক করার। তারা তাদের সন্তানকে সুযোগ করে দেন যৌন সম্পর্ক তৈরি করতে। কোনও ছেলেমেয়ে যদি তাতে অদক্ষতা দেখায়, তখন বাবা-মায়েরা প্রশ্ন করে জেনে নেন, তার সন্তানটি শারীরিক ও মানসিকভাবে কোনও সমস্যায় ভুগছে কিনা? কিংবা সে সমকামী কিনা? তারা ছেলেমেয়েদের কনডম বা সন্তান নিরোধীকরণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিয়ে থাকে।
দ্বিতীয়ত: ইউরোপে সরকার অনুমোদিত অসংখ্য যৌনপল্লী আছে, যেখানে ছেলে এবং মেয়েদের – উভয়পক্ষেরই যাওয়ার অনুমতি আছে। যৌনকর্মীদের প্রতি ৩ মাসে এইচআইভি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। এ দেশের সরকার চায় না তাদের নাগরিকদের এইডস হোক- তা সে যৌনকর্মী হলেও। একজন যৌনকর্মী ও একটি যৌনপল্লী সরকারকে বিশাল পরিমাণে ট্যাক্স দেয়, ঠিক সিগারেটের ফ্যাক্টরিগুলোর মতো। তাই অর্থের বিনিময়ে যৌন-পেশাটি এ দেশে অবৈধ নয়। আর এটাই কারণ, পশ্চিমা দেশগুলো তুলনামূলক কম ধর্ষণ হওয়ার। তাদেরকে যৌন আগ্রহ ও চাহিদা মেটাতে কোন নারী বা শিশুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় না। কিংবা পরে জানাজানির ভয়ে ভিক্টিমকে খুন করতে হয় না।
এখানে প্রসঙ্গত বলতেই হয় এখনো বাংলাদেশে সমকামিতা নিয়ে রয়েছে বিশাল দ্বন্দ্ব। যা ষাটের দশকে এক সময় ইউরোপেও ছিল। যখন সবাই জানতো অমুক অমুক স্থানে রাতের অন্ধকারে সমকামীরা মিলিত হয়, যা বৈধ ছিল না। ষাটের দশকে জার্মানির মতো দেশেও নারীকে চাকরি করতে যেতে হলে স্বামীর দস্তখত নিয়ে যেতে হতো – যেখানে লেখা থাকতো আমার স্ত্রী চাকরি করলে তাতে আমার কোনও আপত্তি নাই। সে অবস্থা থেকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো বের হয়ে এসেছে। সমকামিতা এখন আর কোনও অপরাধ নয়। অথচ বাংলাদেশে এখনো বি-সমকামীদেরই বিবাহপূর্ব যৌন সম্পর্ককে অবৈধ ও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
কিন্তু তাতে কি বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা বিয়ের আগে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছে না? অবশ্যই হচ্ছে। অনেক নারী-পুরুষই লিভ-টুগেদার বন্ধনে জড়িত হয়েছে বা হচ্ছেন, কিন্তু তা মহা গোপনে। যাতে করে আত্মীয়-স্বজন যেন টের না পায়। অনেকেই বিবাহিত বলে আলাদা বাড়ি ভাড়া করেও থাকেন। “বিবাহিত” শব্দের তকমা জড়ানো থাকলেই হয় কেউ আর আড়চোখে তাকান না সেদিকে। শুধু কি তাই? আমাদের দেশে দুই ধর্মের দু’জন মানুষের বিবাহ সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে কিছু বৈধ হলেও, সামাজিকভাবে অবৈধ। দুই ধর্মের দু’জন বিয়ে করেছে শুনলে বাড়িভাড়া দিতে রাজি হোন না বাড়িওয়ালারা। অথচ তারা কিন্তু ঠিকই সামাজিকভাবে বিবাহ বন্ধনের দলিলে দস্তখত দিয়েছে।
বাংলাদেশে ছেলেমেয়েরা রাস্তায়-রেস্তোরায় ডেটিং এর জন্য ঘুরছে। কখনো বন্ধুর বাসায়, কখনো বাবা-মা বেড়াতে গেলে ছেলেবন্ধু বা মেয়েবন্ধুকে গোপনে ডেকে নিজ ঘরে অভিসারে লিপ্ত হওয়া। কিংবা ভাবী বা বোনের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল হলে, তাদের বাসায় গিয়ে ডেটিং করা। কিংবা সম্পর্কে ভাবী পাতিয়ে ঘণ্টার জন্য ঘর ভাড়া করে যৌনচাহিদা মেটায় বাংলাদেশের প্রেমিক-প্রেমিকেরা।
হ্যাঁ, গোপনে শারীরিক সম্পর্ক করছে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরাই। আর গোপনে করা মানেই অপরাধবোধের সৃষ্টি হওয়া। আর সেই অপরাধবোধের সুযোগ নেয় বিশেষ মহলের মানুষেরা। বাংলাদেশে রাতের বেলায় পার্কে হাঁটা যায় না। দাঁড়িয়ে আছে ভাসমান পতিতা ও তাদের খদ্দেররা। হোটেলে হোটেলে বোরখা পরা নারীদের আনাগোনা। পুলিশ হয়রানি করছে তাদের। বিরাট অংকের একটা ভাতা ও চাঁদা আদায় করছে তারা।
কিছুদিন ধরে প্রগতিশীলদের মধ্যে রব উঠেছে, ছেলেমেয়েদের যৌনশিক্ষা সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। আর ঠিক সেইসব প্রগতিশীলরা প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার দাবির কথা শুনলে বলছেন, এটা বাংলাদেশ; পশ্চিমা বিশ্ব নয়, যে এখানে প্রকাশ্যে চুমু খাবার দাবিকে বৈধতা দেয়া হবে। সত্যি যদি কোনও বাংলাদেশে ছেলেমেয়েদের যৌনশিক্ষার শিক্ষায় শিক্ষিত করতে যাওয়া হয়; তখন এসব প্রগতিশীলদেরকেই বলতে শোনা যাবে, ছিঃ!! ছিঃ!! লজ্জা!! লজ্জা!! আমার মেয়ে কিনা আমায় যৌনতা নিয়ে প্রশ্ন করছে? আমার মেয়ের সারল্য/সরলতা কেড়ে নেয়া হয়েছে, আমি তার প্রতিবাদ জানাই। “ফিরিয়ে দাও সারল্য” নামের ইভেন্টও খোলা হতে পারে।
এভাবেই দিনের পর দিন আমাদের সবকিছু গোপনে, আড়ালে-আবডালে করার শিক্ষা সামাজিকভাবে দিয়ে আসা হচ্ছে। কখনো সংস্কারের নামে, আবার কখনো বা ধর্মের নামে। যতদিন পর্যন্ত আমরা এসব গোপনীয়তা ও ট্যাবু থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো না, ততদিন পর্যন্ত আমাদের দেশে প্রতিদিনই সংবাদপত্রে ধর্ষণ ও খুনের সংবাদ দেখে যেতে হবে। আর তনু -কল্পনাদের মতো প্রভাবশালীদের দ্বারা ধর্ষণ ও খুন হলে তার বিচারও হবে না।
ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা: ব্লগার