গুলশান হামলার অস্ত্র সরবরাহকারী আটক

34

যুগবার্তা ডেস্কঃ রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে আলোচিত ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ‘গ্রেনেড অস্রসরবরাহকারী’ সোহেল মাহফুজসহ তার তিন সহযোগীকে পুলিশ চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিন সহযোগীসহ এই দুর্র্ধষ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে। সোহেল মাহফুজ জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) ভারতীয় শাখার আমির ছিল বলে দাবি করেছে পুলিশ। সেখানে তার নাম ছিল নসরুল্লাহ। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে ২০১৪ সালে বিস্ফোরণের পর ভারতে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ হিসেবে তাকে ধরিয়ে দিতে ১০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এবং সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গতকাল শনিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জেএমবি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সোহেল সংগঠনটির সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, গত শুক্রবার রাত ৩টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পুষ্কনি এলাকার একটি আমবাগান থেকে সোহেল মাহফুজ ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ওই তিনজন হলো নব্য জেএমবির ‘প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ’ হাফিজুর রহমান ওরফে হাফিজ, ‘অস্ত্র সরবরাহকারী’ জুয়েল রানা এবং নব্য জেএমবির রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার ‘সমন্বয়কারী’ জামাল হোসেন।

মনিরুল ইসলাম বলেন, সোহেল ২০০৪ সালে রাজশাহীর বাগমারার হামিরকুত্সায় সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাইয়ের জাগ্রত মুসলিম জনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ‘সর্বহারা’ নিধনে যুক্ত হয়। ককটেল ছোড়ার সময় তার হাত উড়ে যায়। ধরপাকড় শুরু হলে ২০০৬ সালে ভারতে পালিয়ে যায় এবং সেখানে জেএমবির ভারতীয় শাখার আমির নির্বাচিত হয়। বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের মামলায় এই সোহেল মাহফুজ ওরফে নসরুল্লাহ ১০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষিত একজন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামি। ওই পুরস্কার ঘোষণার পর সোহেল ভারত থেকে চলে আসে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করছিল। হাত উড়ে যাওয়ায় খুব সহজে চিহ্নিত হয়ে যেতে পারার আশঙ্কায় সোহেল মাহফুজ অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকত।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান জানান, গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা হয় যে বৈঠকে সেখানেও উপস্থিত ছিল সোহেল।

গতকাল বিকেলে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল ইসলাম বলেন, “গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে সোহেল মাহফুজ ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা মামলার আসামি। অন্য তিনজন নব্য জেএমবির সদস্য। সোহেল মাহফুজ বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতেও ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’। ২০১৪ সালে বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পর ভারতীয় সরকার তাকে ধরতে ১০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করে। এর আগে ২০০৬ সালে সে ভারতে পালিয়ে যায়। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সোহেল মাহফুজ জেএমবির ভারতীয় শাখার আমির ছিল। ”

মনিরুল ইসলাম আরো বলেন, ‘সোহেল মাহফুজ ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর সে পুরনো জেএমবি ছেড়ে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়। ’

গতকাল কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের এক খবরে বলা হয়, ‘খাগড়াগড় বিস্ফোরণের ৯ মাস পর বাংলাদেশ থেকে গ্রেপ্তার হলো মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) চাঁই হাত কাটা নাসিরুল্লাহ ওরফে সোহেল মাহফুজ। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জেএমবির আরো তিন জঙ্গিকে। ’ খবরে আরো বলা হয়, ভারতের ‘জাতীয় তদন্ত সংস্থার (এনআইএ) একটি সূত্রের দাবি, বৃহস্পতিবার রাতে নাসিরুল্লাহ বাংলাদেশ পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে বলে বেসরকারিভাবে তারা খবর পায়। ’

গতকাল আউটলুক ইন্ডিয়া অনলাইলের এক খবরেও সোহেল মাহফুজকে খাগড়াগড় বিস্ফোরণের ঘটনায় এনআইএর ‘ওয়ান্টেড’ ঘোষিত জঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৪ সালে খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের আগ পর্যন্ত ভারতীয় পুলিশের কাছে সোহেল মাহফুজ সম্পর্কে তথ্য ছিল না বলে উল্লেখ করেন মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের পর ওই ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ভারতীয় পুলিশ সোহেল মাহফুজের বিষয়ে জানতে পারে। তবে ভারতে সোহেল মাহফুজ নাসিরুল্লাহ নামে পরিচিত ছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীর বিভিন্ন জঙ্গি হামলায় তাঁর জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

সিটিটিসি ইউনিট সূত্রের দাবি, হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা বৈঠকে সোহেল মাহফুজ উপস্থিত ছিলেন। নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরী ওই হামলার জন্য অস্ত্র ও গ্রেনেড সরবরাহ করতে সোহেল মাহফুজের সহযোগিতা নিয়েছিলেন। ওই ঘটনার মাসখানেক পর তামিম নারায়ণগঞ্জে অভিযানে নিহত হলেও সোহেলকে এত দিন ধরে খুঁজছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, গুলশান হামলার আরো আগে থেকেই জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন সোহেল মাহফুজ। তিনি জেএমবির প্রতিষ্ঠাকালীন শুরা সদস্য। নব্য জেএমবির সাবেক প্রধান মুসার সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল। সিলেটে অভিযানে মুসা নিহত হওয়ার আগেও মোবাইল ফোনে কথা বলেছিলেন।

সোহেল মাহফুজকে গ্রেপ্তার করায় উত্তরাঞ্চলে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক তছনছ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এম খুরশীদ হোসেন। গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে এ দাবি করেন ডিআইজি। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে (সোহেল) দীর্ঘদিন ধরেই টার্গেট করছিলাম। অবশেষে তিন সহযোগীসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে তাকে ধরা হয়েছে। সোহেলকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক তছনছ হয়ে গেল। ’

খুরশীদ হোসেন বলেন, ‘রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোরের জঙ্গি আস্তানায় সোহেলের যাতায়াত ছিল। সে দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহ করত। বোমা বানাতেও পারদর্শী সে। সোহেল মাহফুজের সঙ্গে যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা মূলত জঙ্গিদের বিভিন্ন ধরনের সাপোর্ট দিয়ে থাকে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘হাতকাটা সোহেল উত্তরাঞ্চলে নব্য জেএমবিকে সংগঠিত করছিল। পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, ঈদে এ অঞ্চলে নাশকতার পরিকল্পনা ছিল জঙ্গিদের। তবে পুলিশের তত্পরতায় জঙ্গিরা কোনো অঘটন ঘটাতে পারেনি। ’

এক প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি বলেন, সোহেল মাহফুজসহ জেএমবির অন্তত দুই ডজন নেতা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার টার্গেটে। সোহেলকে ভারতেও খোঁজা হচ্ছিল। ডিআইজি জানান, কুষ্টিয়ার বাসিন্দা সোহেল মাহফুজ যেহেতু গুলশান হামলার সঙ্গে জড়িত, সেহেতু তাকে ঢাকায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজমের কাছে পাঠানো হয়েছে। আর বাকি তিনজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের একাধিক মামলার আসামি। তাই তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালতেই তোলা হবে।

সোহেলসহ পলাতক পাঁচ জঙ্গি পলাতক থাকায় হলি আর্টিজানে হামলার অভিযোগপত্র আটকে আছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলে আসছেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সোহেল মাহফুজকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন সিটিটিসি ইউনিটপ্রধান মনিরুল।

নানা নামে পরিচয় দিতেন সোহেল : বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সোহেল মাহফুজ (২৫) কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার সাদিপুর কাবলি পাড়ার রেজাউল করিমের ছেলে। দুই স্ত্রী ও সাত সন্তানের জনক সোহেল মাহফুজ এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগেই লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। জঙ্গি দলে যোগ দেওয়ার পর সে নিজেকে শাহাদাত, নসরুল্লাহ, রিমনসহ নানা নামে পরিচয় দিত। এক হাত না উড়ে যাওয়ায় সে ‘হাতকাটা সোহেল’ নামেও পরিচিত। নব্য জেএমবির অন্যতম শীর্ষ নেতা নুরুল ইসলাম মারজান তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে তার দুই শ্বশুরবাড়ি। তার দুই শ্বশুরও জেএমবির সমর্থক বলে গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার টি এম মোজাহিদুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শিবগঞ্জের কানসাট-চৌডালা সড়কের ‘পুস্কুনি’ এলাকার একটি আমবাগানে অভিযান চালিয়ে তিন সহযোগীসহ সোহেল মাহফুজকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আরো জানান, গোপন বৈঠক চলার সংবাদের ভিত্তিতে শক্রবার রাত ২টার দিকে জেলা পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের দল শিবগঞ্জ উপজেলার ওই আমবাগানে অভিযান চালায়। ওই সময় সোহেল মাহফুজ তার তিন সহযোগীসহ সেখানে অবস্থান করছিল। গ্রেপ্তারের পরপরই সোহেল মাহফুজকে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে যত মামলা : চাঁপাইনবাবগঞ্জের এসপি জানান, সোহেল মাহফুজ ও জুয়েল জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শিবনগর গ্রামে গত ২৬ এপ্রিল জঙ্গি আস্তানায় অপারেশন ঈগল হান্টের ঘটনায় শিবগঞ্জ থানার এবং নাচোল থানার মামলার এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি। সোহেল মাহফুজের বিরুদ্ধে রাজশাহী তানোর থানায় দুটি, নাটোর সদর থানায় একটি, চট্টগ্রামে একটি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে দুটিসহ আটটি মামলা এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তিনি আরো জানান, গত ছয় মাসে শিবগঞ্জ সদর, নাচোলসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২৬ জঙ্গি ও সহযোগীকে গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি সুসাইডাল ভেস্ট, অস্ত্র ও গুলিসহ বেশ কিছু বিস্ফোরক আটক করা হয়।

পুলিশ জানায়, সোহেল মাহফুজের তিন সহযোগীকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে।