খোশ আমদেদ মাহে রমজান!!!

3166

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ বাংলা ভাষায় “খোশ আমদেদ” শব্দ দুটি সম্ভবত “মাহে রমজান” শব্দ দু’টির আগে ছাড়া আর কোথায়ও ব্যবহার হয় না। আবার অতি পরিচিত এই শব্দ দুটির অর্থও সম্ভবত বাংলা ভাষাভাষী অধিকাংশ মানুষ জানেও না। আমি নিজেও জানতাম না। তবে শুধু খোশ শব্দটির অর্থ জানতাম। কিন্তু আমদেদ শব্দটির অর্থ জানতামও না; জানার চেষ্টাও করিনি কোনদিন। নিশ্চিত ছিলাম, ফারসী কিংবা উর্দূ ভাষা থেকে শব্দ দু’টি এসেছে। কেবল নিশ্চিত ছিলাম না এর প্রকৃত অর্থ। সেদিন আমার শোনিমের জিজ্ঞাসার কারনে অনলাইন ডিকশনারী ঘেটেঘুটে জেনে নিলাম। খোশ আমদেদ মানে শুভেচ্ছা স্বাগতম।
শুভেচ্ছা স্বাগতম মাহে রমজান! তবে “মাহে” শব্দটিও খুব প্রচলিত নয়। এটিও রমজানের সাথে ছাড়া ব্যবহার হতে দেখি না। মাহে শব্দের অর্থ মাস। মূলত শব্দটি বাংলা শব্দ নয়; এবং বাংলা ভাষা এটিকে গ্রহনও করেনি। বছর ঘুরে বাংলার মুসলিম জাহানের কাছে আল্লাহর অশেষ নেয়ামত হয়ে বার বার ফিরে আসে রমজান এবং সাথে আসে মাহে শব্দটিও। মাস জুড়ে মিডিয়ায় মাহে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এক সময় রমজানও যায়; সাথে যায় মাহেও।
আবার “রমজান” শব্দটিও বাংলা শব্দ নয়। এমনকি আরবীও নয়। খোশ আমদেদ মাহে রমজান শব্দের মাঝে একটিও বাংলা শব্দ নেই; আরবীও নেই। ঐ একই জায়গা, মানে ফারসী কিংবা উর্দূ থেকেই চারটি শব্দের উৎপত্তি। রমাদান বা রামাদান থেকেই রমজানের জন্ম। সম উচ্চারিত অক্ষরের কারনেই রমাদান পরিবর্তিত হয়ে রমজান হয়ে আছে আমাদের বাঙালী সমাজে। তবে পুরো মুসলিম বিশ্বে যে নামেই হোক, যে ভাষাতেই হোক, রমজান অসম্ভব বরকতের মাস; সংযম এবং ত্যাগের মাস। একটি দ্বীনি ইবাদত এবং উৎসবের মাস। এবং উদযাপিত হয় কমবেশী সারা পৃথিবী জুড়ে।
তবে লক্ষণীয় যে, সারা পৃথিবী বললেও ইসলামের প্রসার ঘটেছে মূলত পৃথিবীর উষ্ণ অঞ্চলে। বিষয়টি গবেষণার কি না জানি না; তবে যেখানেই গরম সেখানেই যেন মুসলিমদের আধিক্য। শীত প্রধান অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যায় খুবই কম। কিংবা নাই বললেই চলে। আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আরব জাহান, কিংবা আফগান হয়ে বাংলাদেশ; অথবা ব্রনাই এবং ইন্দোনেশিয়া; এসবই মুসলিম জাতিতে ভরপুর। দেখার বিষয় হলো, এই প্রচন্ড গরমও মুসলিম জাহানকে মাসভর রোজা রাখা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। যদিও রমজানের রোজা রাখা অনেকটাই সহজ শীত প্রধান দেশে।
ছাত্রাবস্থায় চার বছর ছিলাম জাপানের উত্তরাঞ্চলের প্রচন্ড শীতের দ্বীপভূমি হোককাইদোর কিতামী শহরে। বছরের ৭মাস তুষারপাত হয় এখানে। তাপমাত্রা মাইনাস ত্রিশেও নেমে যায়। শীতের সময় ওখানের রাত অনেক বড় হয়। ঘটনাক্রমে আমার থাকাকালীন এই চার বছরেই রমজান এসেছে শীতের সময়। সেহেরী খেতাম ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে আর ইফতার করতাম সন্ধ্যা তিনটার পর পরই। প্রচন্ড শীতের কারনে পানির পিপাসাতো থাকতোই না; উপরন্তু মাত্র কয়েক ঘন্টা ছিল রোজা রাখার সময়। তিনটে বাজলেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাফেতে বসে যেতাম ক’জন মুসলিম বন্ধু। জীবনের সবচেয়ে সহজ এবং উপভোগ্য রমজানের ইফতার করার জন্যে।
রোজাকে ইংরেজীতে বলে fasting করা। আর ইফতার হলো fasting break করা বা breakfast করা। ইফতার করা খুবই তৃপ্তিদায়ক এবং মজার। তবে ইফতার কিংবা সেহেরী; এসব ছেলেবেলায় খেয়ে কিংবা দেখে যে মজা পেতাম তা আর কোথায়ও পাইনি। আমাদের ছেলেবেলার সময়টাই ছিল মজার সময়। রাত তিনটে বাজলেই একদল মানুষ নেমে পড়তো রাস্তায়। সারা গ্রাম ঘুরে গজল গেয়ে গেয়ে সবাইকে ঘুম থেকে জাগাতো। ইসলামিক গান কিংবা গজল গেয়ে গেয়ে পাড়াময় ঘুরতো। আমরা সবাই ধরমর করে লাফিয়ে জেগে উঠতাম। আমার তিনজন খেলার সাথী ছিল; রফিজ, মোখলেস আর খোকা। ওরা জাগতো রাত দু’টোর সময়। সম্পর্কে এরা তিন ভাই। বড় পরিবার; পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনেক। এই তিন ভাইয়ের কাজ ছিল আগেভাগে উঠে ভাত রান্না করা। গরম গরম ভাত দিয়ে সবাই সেহেরী খাবে। মজাই আলাদা।
তখনকার দিনে এলার্ম ঘড়ি ছিল না। তাই কেউ না জাগিয়ে দিলে সেহেরীর সময় পার হয়ে যেত। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে দেখতাম পুরো ঘর জুড়ে বাইরের আলো। লাফিয়ে উঠতাম। পুরো একমাসের রমজানে দু’তিন বার এমন ঘটনা প্রায় সবার বেলায়ই ঘটতো। বিষয়টি বেশী হতো সেদিন, যেদিন ভাল ভাল রান্না থাকতো ঘরে। সন্ধ্যা বেলায় না খেয়ে রেখে দেয়া হতো ভোর রাতের জন্যে। সকালে উঠে সে কী আফসোস! সারাদিন যেত আফসোসে। কাউকে পেলেই সেহেরীতে টের না পাওয়ার গল্প আর ভাল ভাল আইটেমের ফিরিস্তি। আর কথার ফাঁকে ফাঁকে ডানে বামে একটু করে থুথু ফেলা। তিন রোজাদার একসাথে বসলে আশপাশ ভরে যেত তাদের মুখের থুথুতে। রোজা রেখে মুখের থুথুও গেলা যাবে না। রোজা বলে কথা! এভাবে সারাদিন নানা কথা।
ইদানীং কথার ধরন বদলেছে। কথার ভিতর পান্ডিত্য ভর করছে। আফটার অল রমজান মাস। কথাবার্তায় সবাই সাবধান। ভুল করা যাবে না শব্দ উচ্চারণেও। শব্দটা সেহরী, না সাহরী; নাকি সেহেরী? এসব নিয়ে দিন পার হয়ে যাচ্ছে। ইবাদত, নাকি এবাদত এসব নিয়ে রোজাদার তটস্ত। পানি মুখে দিয়েই মাগরিব পড়তে হবে, নাকি ইফতার শেষ করেও পড়া যাবে এ নিয়ে কথার শেষ নেই। আবার বেজায় ভাবনা সেহেরীর শেষ সময় নিয়ে। আযান শুরুর সাথে সাথে সেহেরী খাওয়া বন্ধ, নাকি আযান শেষ হওয়া পর্যন্ত খাওয়া যাবে এ নিয়েও কথা আর কথা। নানান কথা। ইদানীং শুনছি আযান দেবার পাঁচ মিনিট আগেই সেহেরীর সময় শেষ। আবার রোজা রেখে দিনে বেশী ঘুমানো যাবে না, বমিও করা যাবে না। তাহলেই শেষ। রক্ত বের হলে তো কথাই নেই। এসব নিয়ে সে কালেও কথা হতো, এ কালেও হয়।
তবে এ কালে বেশী হয় রোজা রেখে শপিং করা। রোজা মানে মাসভর শপিং করা। নিত্য রোজ এ মার্কেট সে মার্কেট ঘোরা আর হাত ভর্তি রঙ্গিন শপিং ব্যাগ নিয়ে ঘরে ফেরা। এখন রোজা মানে উদর পূর্তি করা। দু’চার পদ নয়, হরেক পদের আইটেম দিয়ে ইফতার করা। রোজা মানে পেট পুরে সেহেরী খাওয়া। ভূনা খাওয়া, ঝোল খাওয়া; মাছ খাওয়া, মাংশ খাওয়া। রোজা মানে রাতভর গলা ভরে খাওয়া। রোজা হলো সংযমের মাস; ত্যাগের মাস। অথচ বাংলাদেশে এই রমজান মাসে মানুষ সবচেয়ে বেশী কেনাকাটা করে। যেমনি কেনাকাটা পোষাকে, তেমনি খাওয়া দাওয়ায়।
এসব করে রোজার মূল স্পিরিট থেকে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি। রোজা মানে তো দেহের রোজা, মনের রোজা। রোজা মানে অনুশীলন; মাসভর কঠিন অনুশীলন। রোজা মানে আমল করার অনুশীলন, বেশী বেশী ইবাদতের অনুশীলন। রোজা মানে অভ্যাস; কম কথা বলার অভ্যাস, মিথ্যে না বলার অভ্যাস। রোজা হলো বিরত থাকা; খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা, অপরাধ করা থেকে বিরত থাকা। রোজা মানে মুক্ত হওয়া; সারা বছরের পাপ থেকে মুক্ত হওয়া। রোজা হলো তৈরী হওয়া; মাস ভর রোজা রেখে নিজেকে নিস্পাপ করে তৈরী করা।
রোজার মাসের অন্যতম কালচার তারাবীর নামাজ। কালের পরিক্রমায় পুরো দেশ জুড়েই খতম তারাবীর রেওয়াজ শুরু হয়েছে। মসজিদ ভরে যায় মুসুল্লীতে। এই একটা জায়গা নিয়ে আগে কোন কথা ছিল না; বিতর্ক ছিল না। এখন এখানেও শুরু হয়েছে। এশার জামাতের পর পর ভাবগম্ভীর পরিবেশে শুরু হয় বিশ রাকাত তারাবীর জামাত। যেই না আট রাকাত শেষ হয়, অমনি একদল মুসুল্লী জামাত ছেড়ে বসে থাকা মুসুল্লী দের ডিঙ্গিয়ে বেরিয়ে যায়। এভাবে ফি বছর বেরিয়ে আসা মুসুল্লীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বাকীরা যারা বসে থাকি তারা চুপচাপ বসেই থাকি। নিকট ভবিষ্যতে সংখ্যালঘু হবার ভয়তে গায়ের জোরে বসে থাকি।
গায়ের জোরে বসে থাকি বটে, তবে মনের জোরে কমতি থাকে। আমরা অসহায়, তাই মনে জোর কম। অবুঝ মন বোঝে না কাদের কথা সত্যি! কেবল বোঝে নিজ সম্প্রদায়ের মাঝে এ এক বিশাল বিভেদ। বসে বসে এমন বিভেদ কিংবা ফিৎনা দেখতে ভাল লাগে না। এ ফিৎনা আমাদের নিজেদেরই সৃষ্টি। এসব নিয়ে সবার একত্রে বসে ভাবা দরকার। কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে পবিত্র রমজানে আমাদের কত ভাবনা, কত সতর্কতা! অথচ অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয় নিয়ে আমাদের তেমন ভাবনা নেই। অবশ্য ভাবার মত বিষয়গুলো নিয়ে ভাবনা করার সময় কোথায় আমাদের? আমাদের কি বেহুদা কামের এতই অভাব!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা