খাদ্য, পানি, ওষুধ সংকট : বানভাসি এলাকায় হাহাকার ফটোসেশনেই ব্যস্ত মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক নেতারা

154

যুগবার্তা ডেস্কঃ সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় বন্যা দুর্গত এলাকায় অনেকে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। সাহায্য-সহযোগিতার নামে মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক নেতারা বড় বড় ব্যানার নিয়ে দল বেঁধে সেখানে গেলেও তারা মূলত সামান্য চিড়া-মুড়ি-গুড় দিয়ে ফটোসেশনেই ব্যস্ত ।ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধির কারণে গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন এলাকা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার ফুলছড়ি উপজেলার হারোডাঙ্গা চরের শতাধিক পরিবারকে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে দেখা যায় থফোকাস বাংলাবন্যায় দেশের ১৭ জেলার প্রায় ২০ লাখ পানিবন্দি। এসব এলাকায় খাবার, সুপেয় পানি ও ওষুধের জন্য হাহাকার চলছে। পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় বিপুলসংখ্যক গৃহহীন মানুষ বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন উঁচু জায়গায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় তাদের অনেকের অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে। সাহায্য-সহযোগিতার নামে মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক নেতারা বড় বড় ব্যানার নিয়ে দল বেঁধে সেখানে গেলেও তারা মূলত সামান্য চিড়া-মুড়ি-গুড় দিয়ে ফটোসেশনেই ব্যস্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।অথচ বেশ কিছু জলমগ্ন এলাকায় মানুষকে গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন গবাদি পশুর পাশে শুয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে। পশুখাদ্যের চরম সঙ্কট থাকায় কেউ কেউ নিজে আধাপেটা খেয়ে ত্রাণের খাবার গরু-ছাগলকে খাওয়াচ্ছে। এমনকি দূর-দূরান্ত থেকে কষ্ট করে বয়ে আনা খাবার পানিতেও তাদের ভাগ দিতে হচ্ছে।এদিকে জলমগ্ন এলাকায় এবং যেসব এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে ওইসব স্থানে ডায়রিয়া ও বিভিন্ন চর্মরোগ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ ছাড়াও শিশুরা জ্বর-নিমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পানিবন্দি এলাকার মানুষের সেবায় বিপুলসংখ্যক মেডিকেল টিম কাজ করলেও ওষুধ সঙ্কটের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েই গেছে।পানিবন্দি এলাকার স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, কাগজে-কলমে সরকারি কিছু ত্রাণকার্যক্রম থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় না থাকার মতো। অধিকাংশ এলাকার মন্ত্রী-এমপি ও জনপ্রতিনিধি তাদের পাশে নেই। অন্যান্য বছরগুলোর বন্যা-দুর্যোগের সময় শিল্পপতি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে দলগত বিভিন্ন কার্যক্রম দেখা গেলেও এবার তা অনুপস্থিত। রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বিভিন্ন এনজিওগুলোও অনেকটা নীরব। নাগরিক সমাজ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও দর্শকের ভূমিকায়। জলমগ্ন এলাকার রাজনৈতিক নেতা এবং জনপ্রতিনিধিরা অনেকেই এলাকা ছেড়ে শহরে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে বসে তারা ফেসবুক-টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মায়াকান্না’ কাঁদছে।পানিবন্দি মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ত্রাণও নেই, কেউ খোঁজও নেয় না। সামনে যদি ভোট থাকত, তাহলে সবাই দলবেঁধে আসত। এখন তো ভোট নেই, তাই খবর নেয়ার প্রয়োজন মনে করে না। এনজিওগুলোর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা আরও জানান, বিদেশি ত্রাণ নেই, তাই এনজিওগুলোও আসছে না।এদিকে পানিবন্দি এলাকার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বেশকিছু স্কুল-কলেজে পানি ঢুকে পড়ায় সেখানে অঘোষিত ছুটি চলছে। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গৃহহীন দুর্গত মানুষ আশ্রয় নেয়ায় সেগুলোর শিক্ষাকার্যক্রমও গুটিয়ে নেয়া হয়েছে।ফসলি জমি, পুকুর ও হাটঘাট পানিতে তলিয়ে থাকায় শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। তাই তাদের একটি বড় অংশ সকাল-সন্ধ্যা ত্রাণের আশায় এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে দিন কাটাচ্ছে। এ দলে সাধারণ কৃষকের পাশাপাশি নারী-শিশু-বৃদ্ধরাও রয়েছে। দোকানপাট-ব্যবসা কেন্দ্র পানিতে ডুবে যাওয়ায় স্বচ্ছল ব্যবসায়ীরা বেকার হয়ে পড়ায় তাদের অনেকে পুঁজি ভেঙে অন্নের সংস্থান করলেও কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ত্রাণ-সহায়তায় হাত পাতছে। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল হওয়ায় সম্ভ্রম খুঁইয়ে তারা কাড়াকাড়ি করে ত্রাণ সংগ্রহে প্রায়ই ব্যর্থ হচ্ছে।সরকারি সূত্রগুলো জানায়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়সহ যে কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারি গুদামে যথেষ্ট খাদ্য রয়েছে। তবে রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সড়কপথে জলমগ্ন সব এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না। ওইসব এলাকায় নৌপথে খাবার, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।তবে সংশ্লিষ্ট অনেকের অভিযোগ, পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ থাকলেও তা বিতরণ ব্যবস্থায় যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে এ ব্যাপারে আগাম প্রস্তুতি না থাকায় সঙ্কটময় মুহূর্তে হযবরল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম-দুর্নীতি আগের মতোই চলছে।সরকারি বিভিন্ন প্রেসনোট এবং স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, বন্যাকবলিত সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার চরাঞ্চলসহ দুর্গম এলাকাগুলোতে সোমবার পর্যন্ত সরকারি কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। সারিয়াকান্দি উপজেলার চন্দনবাইশা ইউনিয়নের দুর্গম বানিয়ার চর, আদবাড়িয়া চর, টেকামাগুড়া চর ও ঘুঘুমারি শেখপাড়া এলাকায় পানিবন্দি অধিকাংশ পরিবার ত্রাণের অভাবে মানবেতন জীবন যাপন করছে। সিরাজগঞ্জ সদর, কাজীপুর, চৌহালী, শাহজাদপুর ও বেলকুচি উপজেলার ৪৮টি ইউনিয়নের ৬৭ হাজার ৫০০ পরিবারের প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন থেকে গত দুই সপ্তাহ থেকে ৫০০ টন চাল ও সাড়ে আট লাখ টাকার সাহায্য দিয়েছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খুবই অপ্রতুল। জেলায় সদর, কাজীপুর, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, চৌহালী ও বেলকুচি উপজেলায় কমপক্ষে ৬৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি। সেখানে মাত্র ৪২ হাজার পরিবার নামমাত্র ত্রাণ পেয়েছে। রাস্তাঘাট না থাকায় দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে প্রশাসন সূত্র স্বীকার করেছে।এদিকে কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিবন্দিদের অভিযোগ, গত তিন সপ্তাহে ক্ষতিগ্রস্ত অর্ধেক মানুষ নামমাত্র সরকারি সহায়তা পেয়েছে। বাকিরা এর বাইরে রয়েছে। অন্যান্যবারের মতো এবার ত্রাণ নিয়ে কোনো এনজিও মাঠে নামেনি। তবে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার পর্যন্ত ত্রাণ হিসেবে ৯৫০ টন চাল এবং ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৮০৬ টন চাল এবং ৬ লাখ ২৩ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।এদিকে সরকারি হিসাবে সোয়া ৪ লাখ একর ফসল পানির নিচে। পানিবন্দি জেলাগুলোর মধ্যে সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম ও জামালপুরে কৃষিজমি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের (এনডিআরসিসি) হিসাবে, ১৭ জেলার ৮৬ উপজেলার ২০ লাখ ৬৮ হাজার ৭১৮ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ৪২১ ইউনিয়নে পানিবন্ধি পরিবারের সংখ্যা হচ্ছে ৪ লাখ ৭২ হাজার ১০৫টি। ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩১ হাজার ৬৬৩টি। আর আংশিক ক্ষতি হয়েছে এক লাখ ৮৮ হাজার ২৯৫টি। এরই মধ্যে সাতজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাঁচ হাজার ৩৬১টি গবাদিপশু মারা গেছে। ১ হাজার ৪৮০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির তোড়ে ৬৫৩ কিলোমিটার বাঁধ ও ২৪টি ব্রিজ ভেঙে গেছে। জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি : একদিন স্থিতিশীল থাকার পর জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির ফের অবনতি হয়েছে। জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নব কুমার চৌধুরী জানিয়েছেন, রোববার ও সোমবার বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। মঙ্গলবার দুপুরে একই পয়েন্টে যমুনার পানি বেড়ে বিপদসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।তিনি জানান, যমুনার পানি বৃদ্ধি আগামী দুই-তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে। যমুনার সঙ্গে একই হারে ব্রহ্মপুত্র, ঝিনাইসহ শাখা নদীগুলোর পানিও বাড়ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।এদিকে বন্যায় জেলার ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ, সরিষাবাড়ি, মাদারগঞ্জ ও জামালপুর সদরের ২৫টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন উঁচু বাঁধে। ডাইভারশনে পানি ওঠায় ব্যাহত হচ্ছে মেলান্দহ-মাহমুদপুর সড়ক যোগাযোগ। কুড়িগ্রামে দুর্ভোগ বেড়েছে : কুড়িগ্রামে সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ১৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ও সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি ৫৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বেড়েছে তিস্তা ও দুধকুমারসহ অন্যান্য নদীর পানি। বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর, নাগেশ্বরী ও সদর উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের চর ও দ্বীপচরসহ প্রায় আড়াই শতাধিক গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এসব এলাকার প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার মানুষ। বানভাসি মানুষজন ঘরবাড়ি ছেড়ে বাঁধ ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। টানা ৫ দিন ধরে বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকা এলাকাগুলোতে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট। অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিলেও তাদের হাতে কোনো কাজ না থাকায় খেয়ে না খেয়ে অতিকষ্টে দিন যাপন করছে। বন্ধ রয়েছে জেলার দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান।কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী সরকার জানান, ইউনিয়নের চরাঞ্চলগুলোর ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি জীবন-যাপন করছে। এর মধ্যে ১৫০ জনকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। এই ৩০ হাজার বন্যা দুর্গত মানুষের জন্য ১১ মেট্রিক টন চাল পেয়েছি, যা বুধবার বিতরণ করা হবে। জেলা ত্রাণ শাখা সুত্রে জানা গেছে, বন্যার্তদের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে ২৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক বন্যাকবলিত মানুষের জন্য তা অপ্রতুল।এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে বন্যার পানিতে জেলায় ৭৭১ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে উঠতি আউশ ৭৪ হেক্টর, বীজতলা ১১৩ হেক্টর, সবজি ৩৪৪ হেক্টর, পাট ২০০ হেক্টর এবং আখ ৪২ হেক্টর।ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে : নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদের পানি ফুলছড়ি পয়েন্টে ৩৮ সে.মি. ও ঘাঘট নদীর শহরের ব্রিজ এলাকার পানি বিপদসীমার ২৪ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জসহ ৪ উপজেলার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে করে ৪ উপজেলার ৬০ গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এসব এলাকায় শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদি পশুর গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানির প্রবল চাপে সিংড়া-রতনপুরসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে।বন্যাদুর্গতরা ৫ দিন ধরে পানিবন্দি থাকলেও সেখানে কোনও ত্রাণ এখনও পৌঁছায়নি। বিষয়টি স্বীকার করে জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল জানান, ‘চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে বন্যা মোকাবেলায় প্রশাসনের যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে। বন্যাদুর্গতদের মধ্যে দ্রুত ত্রাণ তৎপরতা শুরু করা হবে। তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে : ভারী বর্ষণ আর তিস্তা ব্যারেজের উজানের পাহাড়ি ঢলসহ ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের বেশ কিছু সস্নুইচ গেট (জলকপাট) খুলে দেয়ায় ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সোমবার (১০ জুলাই) ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিকে বন্যায় চরাঞ্চলের প্রায় ১৫ হাজার পরিবার এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের পানি পরিমাপক উপ-সহকারী প্রকৌশলী আমিনুর রশিদ ও গেজ রিডার নুর ইসলাম জানান, মঙ্গলবার সকাল ৯টায় ওই পানি প্রবাহ কমে ডালিয়া পয়েন্টে ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।স্থানীয়রা জানান, ভাসানচর গ্রামের প্রতিটি বাড়ি কোমর পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা ও কালিগঞ্জ উপজেলার তিস্তা বেষ্টিত চর ও চরগ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে। নয়টি নদীর পানি আরও বাড়বে : বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস থেকে জানা গেছে, সকাল ৯টায় ধরলা নদী কুড়িগ্রামে ১৫, তিস্তার ডালিয়ায় ১৪, গাইবান্ধায় ঘাঘট নদ ২৭, চিলমারিতে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদে ৬৪, সারিয়াকান্দিতে ৪০, কাজীপুরে ৪২, সিরাজগঞ্জে ৪৫ সেন্টিমিটার, এলাসিনে ধলেশ্বরীর পানি ২৫ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। এ ছাড়া কানাইঘাটে সুরমা ৫৯, কুশিয়ারার পানি অমলশীদে ৬৩ ও শেওলায় ৬২ মিলিমিটার ওপর দিয়ে বয়ে চলছিল। জারিয়াজঞ্জাইলে কংস নদীর পানি ছিল বিপদসীমার ৩১ সেন্টিমিটার ওপরে।পদ্মা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি আরও ৪৮ ঘণ্টা এবং সুরমা, কুশিয়ারার পানি ২৪ ঘণ্টা বৃদ্ধি পেতে পারে।এদিকে বৃষ্টির এই ধারা আরও তিন দিন থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। মঙ্গলবারের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ুর বলয় পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি ও উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় সক্রিয় রয়েছে। এর ফলে সারা দেশে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে।মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই বৃষ্টি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে ডিমলায়। সেখানে ৬৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। বেলা ৩টা পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৪৩ মিলিমিটার।প্রতিবেশী ভারতের উত্তর-পূর্বের আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, উত্তর প্রদেশ, বিহার, হিমাচল প্রদেশ, ছত্তিশগড়সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব রাজ্যে ১৩ জুলাই পর্যন্ত প্রচ- ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এরপর ১৪ জুলাই থেকে ভারতের গুজরাট, গোয়া, পূর্ব রাজস্থানে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে।-যায়যায়দিন