খাদের কিনারে বাংলাদেশ

99

তাহমিমা আনাম।
বাংলাদেশ খাদের কিনারে চলে গেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা অসহিষ্ণুতার ঘটনাগুলো অসহনীয় উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যার শুরু হয়েছে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে রাজধানীর গুলশানে ইতালির নাগরিক তাবেলা সিজারের হত্যা দিয়ে। কয়েকদিন পরেই রংপুরে খুন হন জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও। তারপর আশুরা উপলক্ষ্যে শিয়াদের তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিতে হামলায় নিহত হয় এক কিশোর। সর্বশেষ এ সপ্তাহে ব্লগার ও প্রকাশকদের উপর বর্বর হামলা, যেখানে এক প্রকাশক নিহত ও অন্য তিনজন গুরুতর আহত হন। এসব অসহিষ্ণু ঘটনার মধ্য দিয়ে খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নৃতাত্ত্বিক, লেখক ও ‘আ গোল্ডেন এজ’র উপন্যাসিক তাহমিমা আনাম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে বুধবার প্রকাশিত এক প্রবন্ধে ‘বাংলাদেশ অন দ্য ব্রিঙ্ক’ নামক এক প্রবন্ধে কথাগুলো বলেছেন।
এতে তাহমিমা লেখেন, সাম্প্রতিক সময়ের হামলাগুলো এ বছরের শুরুতে পাঁচ ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার হত্যারই প্রতিধ্বনি মাত্র। রাজিব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাস ও নিলাদ্রি চট্টপাধ্যায়কে হত্যা করা হয় এ বছর। তারপরই এ সপ্তাহে বর্বর হামলার শিকার হন আহমেদুর রশীদ টুটুল ও প্রকাশক ফয়সল আরেফীন দীপন। তাদের উপর হামলার ঘটনা ছিল বর্বরতার পাশাপাশি নির্লজ্জও। দিনের আলোতে অফিসে ঢুকে তাদের উপর হামলা করা হয়। তাদেরকে কুপিয়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
প্রবন্ধে বলা হয়, তাবেলা হত্যার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে বাংলাদেশ সরকারের মতবিরোধ বাড়ছিল। কে বা কারা তার হত্যার পেছনে দায়ী তা নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, বাংলাদেশে আইএস জঙ্গিদের উপস্থিতির প্রমাণ তারা সরকারকে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার জোর দিয়ে বলছে, ওই হামলার সাথে সম্ভবত সরকার বিরোধীরা জড়িত। বাইরের কোন সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এর সঙ্গে জড়িত নয়।
তাহমিমা লেখেন, এটা সত্য বাংলাদেশের ভেতরে গড়ে উঠা উগ্রপন্থিরা আগে এ ধরনের অনেক হামলা করেছে। এমনকি তাদের সাথে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর যোগসাজশও রয়েছে। হামলা যখন নিয়মিত হচ্ছে তখন বিকল্প ব্যাখ্যা সরকারের গ্রহণ করতে না চাওয়াটা হতাশার। অন্তত নিহতদের পরিবারের কাছে তো অবশ্যই। অথচ আরেকজন প্রকাশক এ সপ্তাহের শুরুতে হত্যার হুমকি পেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে এ ধরনের হামলার ঘটনা দেশের যে কোন স্থানে আরো ঘটতে পারে।
এমন উদাসীন অবস্থায় (আমরা যারা বাংলাদেশের নাগরিক ও বন্ধু) নিজেদেরকে রাষ্ট্র ও উগ্রপন্থার মাঝে আটকে পড়া নগ্ন শিকার বলে বসে থাকতে পারি আমরা। কিন্তু আমরা তো আরো অনেক কিছু করতে পারি ও করা উচিত।
প্রথমত বাংলাদেশিদের প্রশ্ন করতে হবে আমরা কি এখনো দেশের প্রতিষ্ঠার মূলনীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কিনা। বাংলাদেশে তো উদার ইসলাম ধর্মের চর্চা ছিল ও আছে। ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র নিয়েই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমাদের সংবিধান ধর্মনিরেপেক্ষ। আমরা সব নির্বাচনে ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকে ভোট দিয়ে জয়ী করি। সেখানে কড়া ধর্মীয় শাসনের পক্ষের দলগুলো সমর্থন পায় না। তারপরও আমরা ব্যর্থ প্রতিষ্ঠার মূলনীতি মেনে একটি ধর্মনিরেপক্ষ ও সহিষ্ণু প্রজাতন্ত্র গড়তে।
প্রবন্ধে স্বাধীনতার পর থেকে হিন্দু জনসংখ্যা ১৪ ভাগ থেকে ৮ ভাগে নেমে আসা ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালী কর্তৃক উপজাতিদের ভূমি দখলসহ বিভিন্ন ইস্যু তুলে ধরেন তাহমিমা। ২০০৪ সালে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের (কাদিয়ানি) বই প্রকাশ বাতিলসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, হিন্দুদের দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে দেশব্যাপি উৎসবের সঙ্গে আয়োজিত হয়েছে। কিন্তু তারপরই তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিতে হামলা হলো। যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার দেয়া গোয়েন্দা তথ্যের পরও সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়নি।
এতে তাহমিমা লিখেন, ইসলামের নামে উগ্রপন্থিরা যেসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে সেটা কি ইসলামের আসল রুপ। যেভাবে বিদেশি ও মুক্তচিন্তা, উদারপন্থি বাঙ্গালী সংস্কৃতির ধারকদের উপর হামলা হচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশে কট্টর রক্ষণশীল ইসলামিক জাতীয়তাবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, অসহিষ্ণুতা বাড়ি থেকেই শুরু হয়।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত।