ক্ষোভে ফুঁসছে তৃণমুল

যুগবার্তা ডেস্কঃ আওয়ামী লীগের সম্মেলনে এবার তোপের মুখে পড়তে পারেন ক্ষমতাসীন অনেক মন্ত্রী-এমপি ও বিতর্কিত নেতারা। কথা বলার সুযোগ পেলে তৃণমূলের নেতারা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটাবেন এই সম্মেলনে। তারা বঞ্চনা ও উপেক্ষার কথা তুলে ধরবেন। দলীয় এমপির অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও আত্মীয়-স্বজনদের অনিয়ম-দুর্নীতির কথা বলতে চান তারা। বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের দলে নিয়ে পেশিশক্তি প্রদর্শন, আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবহেলা এবং মামলা-হামলার বর্ণনা দিতে চান। পৌর ও ইউপি নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে এসব নেতার ভূমিকা কী ছিল তা নেত্রীর সামনে তুলে ধরতে চান। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আজ সকালে সম্মেলন উদ্বোধন করবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুপুরের খাবার বিরতির পর শুরু হবে কাউন্সিল অধিবেশন। চলবে আগামীকাল পর্যন্ত। সম্মেলনে যোগদানে ইচ্ছুক সারা দেশ থেকে দলীয় নেতাকর্মীরা এরই মধ্যে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। তারা দল বেঁধে বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করছেন। চলছে শলাপরামর্শ। সুযোগ পেলে কী কথা বলবেন, তা ঝালাই করে নিচ্ছেন তারা। তবে তার আগে নেত্রীর (সভানেত্রী শেখ হাসিনা) মনোভাব বুঝে নিতে চান ঢাকায় আগত নেতারা। এদিকে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূল নেতাদের মনের কথা শুনতে চান দলের সভানেত্রী। এরপর থেকেই মূলত প্রস্তুতি নিচ্ছেন তৃণমূলের নেতারা। তাই কোনো কোনো নেতার আপত্তি সত্ত্বেও সম্মেলনে মাঠপর্যায়ের নেতাদের বক্তৃতা দেয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। তবে জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের কতজন এ সুযোগ পাবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য শোনার জন্যই সম্মেলন একদিনের স্থলে দুই দিন করা হয়েছে। আজ দুপুর থেকে শুরু হওয়া কাউন্সিল অধিবেশনের শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য শোনা হবে। সেখানে মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তা আমলে নেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, নেত্রী সব বক্তব্য শুনবেন। এরপর তা মূল্যায়ন করবেন।
যশোর-১ শার্শা আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ- তিনি অরাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মানুষ। নানাভাবে সংকট জিইয়ে রেখেছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটন বলেন, সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ পেলে এমপির অপকর্মের চিত্র তুলে ধরবেন। এই এমপি দলীয় গঠনতান্ত্রিক নিয়ম ভেঙে কাজ করতেই উৎসাহ বোধ করেন। জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করে নৌকার প্রার্থীকে ফেল করিয়েছেন। বিষয়গুলো সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়ে সমাধান চাইবেন।
উত্তরের জেলা দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকারিয়া জাকা শুক্রবার বলেন, ‘যেভাবে নির্যাতিত হয়েছি সুযোগ পেলে সব বলব।’ এমপি মনোরঞ্জন শীল গোপালের নিয়োগ বাণিজ্য, টিআর, কাবিখা ও দুস্থদের চাল লুটপাটের কথা এলাকার কে না জানে। তিনি বলেন, উপজেলা শিবিরের সভাপতি খোদা বক্সকে শিতলাই আলিম মাদ্রাসায় প্রভাষক পদে চাকরি দেন এই এমপি। জাগপা থেকে আসার কারণে তার কাছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপেক্ষিত। জাগপা, জামায়াত ও বিএনপির লোকজনদের নিয়েই তিনি থাকেন। জামায়াত ছাড়াও বিএনপি নেতাকর্মীদের গণহারে চাকরি দিয়েছেন এমপি গোপাল। এর মধ্যে স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মনোয়ার হোসেনও রয়েছেন। তাকে একটি কলেজে চাকরি দেয়া হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, স্থানীয় (শিবগঞ্জ) এমপি গোলাম রাব্বানীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে এখানকার আওয়ামী লীগের পুরনো নেতাকর্মীরা অতিষ্ঠ। অন্যদল (গণফোরাম) থেকে আসা এ এমপি কর্মীদের মূল্যায়ন করেন না। নিজস্ব বাহিনী নিয়ে ঘোরাফেরা করেন। ছেলে ও ভাতিজারা সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। বিএনপি-জামায়াত থেকে আসা লোকজনের গুর“ত্ব তার কাছে বেশি। গরিবের ১০ টাকার চাল বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এ চাল যাচ্ছে সচ্ছলদের ঘরে। ডা. শিমুল জানান, সুযোগ পেলে তিনি এসব অভিযোগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করে প্রতিকার চাইবেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জিয়াউর রহমান তোতা বলেন, কয়েক দিন আগে যারা বিএনপি ও জামায়াত থেকে দলে এসে যোগ দিয়েছে, তারা কাউন্সিলর হিসেবে মনোনীত হয়ে এখন ঢাকায়। আর তিনি সারা জীবন আওয়ামী লীগ করেও কাউন্সিলর হতে পারেননি। ডেলিগেট হিসেবে সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। মিথ্যা মামলায় জেলে গিয়ে ক’দিন আগে মুক্তি পেয়েছেন তিনি। তোতা জানান, বিএনপি থেকে আসা ব্যক্তি আবদুল ওদুদ এখানকার আওয়ামী লীগের এমপি। দলে দলে জামায়াত নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে আসছে। আর দলীয় নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পুরছেন। যদি সুযোগ থাকে, তাহলে এ এমপির অত্যাচার-নির্যাতনের কথা তুলে ধরবেন তিনি।
শুধু নেত্রকোনা নয়, ঢাকাসহ সারা দেশে এখন আলোচিত চরিত্র ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়। প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনসহ মারধরের ঘটনায় সমালোচিত এ তরুণ উপ-মন্ত্রী ও জাতীয় দলের (ফুটবল) সাবেক খেলোয়াড়। নেত্রকোনাতেও তাকে নিয়ে স্বস্তিতে নেই সংশ্লিষ্টরা। জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী খান খসরু বলেন, সম্মেলনে অবস্থা বুঝে তিনি কথা বলবেন। নেত্রী (সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) যদি জানতে চান তাহলে জয়ের বিষয়ে বলবেন।
সিরাজগঞ্জের সরকারি দলের এমপি আমজাদ হোসেন মিলন সম্প্রতি তার দলের কর্মী বাবর আলীকে গালাগাল করে দেশব্যাপী সমালোচিত হয়েছেন। এ ব্যাপারে এমপির নিজ এলাকাতেও সমালোচনার ঝড় বইছে। এ ব্যাপারে তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল হক বলেন, এমপি লিটন দলের লোকজনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেন না। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তারা যদি দলের এ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ পান, তাহলে এমপির বিষয়ে কথা বলবেন।
তৃণমূলের নেতাদের বক্তৃতা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, বিষয়টি সময়ের ওপর নির্ভর করছে। সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট পেশের পর কাউন্সিলর ও প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নিয়ে থাকেন। যুগান্তর