কেন আমি জাসদে যোগ দিচ্ছি: কৈফিয়ত

102

ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনঃ
আমার বয়স ছেষট্টি পার হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার একচল্লিশ বছরও সম্প্রতি অতিক্রম করেছি। সামনের বছরের (২০১৭) জুনে আমি অবসরকালীন ছুটিতে যাব। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাড়তি এক বছর এবং আমার জন্ম জুনের পর আগস্ট মাসে হওয়াতে বয়স পঁয়ষট্টি পেরুলেও এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছি। আমরা অবসরে যাই জুন মাসে। জীবনের এই ক্ষণে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেব এবং তা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদে, যার সঙ্গে আমি অতীতে যুক্ত ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের আইনে পরিচালিত হয়। সে আইনে শিক্ষকদের সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে বাধা নেই। দলের সদস্যও হতে পারেন তাঁরা। তারপরও আমি জানি নানা কৈফিয়ত আমাকে দিতে হবে– পরিবার-পরিজন, বন্ধু-শুভানুধ্যায়ী, সহকর্মী-শিক্ষককুল, ছাত্রছাত্রী-তরুণ প্রজন্ম, সুশীল সমাজ, মিডিয়া, বিদ্যজন ও মান্যজন, নানা দর্শনের রাজনীতিবিদগণ এবং সর্বোপরি নিজের কাছে।
আমার জাসদে যোগ দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নিজেকে যুক্ত করবার পেছনের কারণগুলো প্রথমে উল্লেখ করে তারপর উপরের সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর বিষয়ে আমার কৈফিয়ত দিতে চেষ্টা করব।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় রকমের শূন্যতা বিরাজ করছে। রাজনীতি মুখ্যত ডান বলয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত এবং জাতীয় পার্টি এই বলয়ের রাজনৈতিক দল। এসব দলের মধ্যে একমাত্র আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনেকাংশে ধারণ করে। মুখ্যত এই দল সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি– গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছে।
তবে ১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রধানত প্রত্যাবর্তন করলেও দুটি মূলনীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র থেকে আওয়ামী লীগ চেতনাগতভাবে ও কার্যত সরে এসেছে। ডান বলয়ের রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা সমাজের ধনবান শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেও সমাজের মূল উৎপাদক শ্রেণি ও বিত্তহীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নানা সংস্কারমূলক কর্মসূচি নিয়ে থাকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বিদেশি ঋণনির্ভর না হয়ে স্বনির্ভর জাতীয় অর্থনীতি বিকাশে শেখ হাসিনার দৃঢ়চিত্ত সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণের সুফল বাংলাদেশ ও তার বিশাল জনগোষ্ঠী পাচ্ছে।
তারপরও সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডান বলয়ের বাকি তিনটি দল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। সংবিধানের চার মূলনীতির কোনোটি তারা বিশ্বাস করে না। দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি এদের আনুগত্য নেই। এই তিনটি দলের নষ্ট অতীত এবং সামরিক স্বৈরশাসন ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ের প্রবল গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে জেগে ওঠা বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের চেতনার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানের কারণে তারা আজ ক্ষয়িষ্ণু ও বিলীয়মান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড কার্যকর এবং জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকারের শক্ত অবস্থানের কারণে জামায়েত এখন দৌড়ের উপর আছে। জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য অটুট রাখতে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার নীতিগত অবস্থান ও জঙ্গি ঘাতকদের সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র বিএনপিকে অতি দ্রুত একটি অকার্যকর রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। এই দুজনকে নেতৃত্বে রেখে বিএনপির পক্ষে রাজনীতির মাঠ পুনর্দখল সম্ভব হবে না। বিকল্প কোনো নেতাও এই দলে দৃশ্যমান নেই।
রাজনীতিতে ক্লাউন হিসেবে পরিচিত জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি দ্রুত ভাঙ্গনের মুখে। এরশাদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টিও বিলিন হয়ে যাবে।
বাম বা মধ্য-বাম বলয়ে রাজনৈতিক শক্তি শতধা-বিভক্ত ও এই মুহূর্তে খুবই দুর্বল। সমাজের উৎপাদক শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী দল হিসেবে তারা আবির্ভূত হতে পারেনি। বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪দলীয় বাম মোর্চা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও গত দুবছরে এই মোর্চার সম্ভাবনাময় দুটি দল, জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি এখনও জনমনে তেমন ছাপ ফেলতে পারেনি।
এই মোর্চার বাইরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও দ্বিধাবিভক্ত বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ক্রমাগত তাদের ভ্রান্ত রাজনীতির কারণে আরও ক্ষুদ্র দলে পরিণত হয়েছে। জনমনে তাদের প্রতি আস্থা এখন আর তেমন অবশিষ্ট নেই।
সব মিলিয়ে রাজনীতির পরিমণ্ডলে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশে কার্যত কোনো বিরোধী দল নেই। আপাতদৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের জন্য এখন খুবই সুসময়। দূর ও নিকট অতীতে জামায়াত-বিএনপি ও ইসলামি নামধারী জঙ্গিদের জ্বালাও-পোড়াও-হত্যা ও সম্পদ ধ্বংসের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে শেখ হাসিনার পরিচালনায় আওয়ামী লীগের এমন একক সবল অবস্থান দেশের উন্নয়নের জন্য কাম্য বলে বিবেচিতও হতে পারে। বাস্তবেও তার ইতিবাচক ফলাফল স্পষ্টত দৃশ্যমান। বিএনপি-জামায়াত ও এরশাদের দীর্ঘ অপশাসনে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ সবই ভালো ও ইতিবাচক।
প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অর্থবহভাবে ধারণ করে ও সংবিধানের চার মূলনীতি বাস্তবায়নে দৃঢ়চিত্ত থাকে, এমন বিকল্প রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিতে বর্তমানের দৃশ্যমান সুসময় কতদিন বিরাজ করবে? তেমন রাজনৈতিক শক্তি কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত না হলে কী পরিণতি হতে পারে দেশের? তেমন অবস্থায় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ করবে কোন শক্তি? তা কি বর্তমানের উত্থানপর্বের বাংলাদেশের জন্য কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে? এ সব বিষয়ে বাংলাদেশের অতীত অবস্থা পর্যালোচনা করলে আমরা একটি বেদনাদায়ক ও ভয়াবহ চিত্রের সম্মুখীন হব।
১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীবলে বহুদলীয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতিশাসিত একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। দেশের সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল নামের একক রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাকশাল শাসন আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে প্রতিভাত হলেও দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক শূন্যতায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ষড়যন্ত্রকারী শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরে নিজেদের সংগঠিত করে এবং মাত্র ৭ মাসের মাথায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে দেশের সর্বময় ক্ষমতা দখল করে নেয়।
এই ষড়যন্ত্রে আওয়ামী লীগে বঙ্গবন্ধুর অতি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা ও বাকশালের কার্যকরী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশতাক ও রাষ্ট্রীয় সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রে বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিতজনেরা মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বাকশাল ব্যবস্থার যে লক্ষ্য ও রুপরেখা উপস্থাপন করেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হতে পারলে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে বিদ্যমান রাষ্ট্রের স্থলে স্বাধীন দেশের উপযোগী বিকল্প রাজনৈতিক শাসন গড়ে উঠতে পারত।
স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই তেমন একটি ব্যবস্থা কায়েমের দাবি করেছিল মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে অগ্রগামী ও বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন তরুণ নেতৃত্ব। কয়েক শত বছরে গেড়ে বসা ঔপনিবেশিক শাসনের কঠিন নিগড় ভেঙ্গে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের উপযোগী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের যথার্থ সময় ছিল তখন। কারণ মুক্তিযুদ্ধে জয়ী জনগণের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও সাহস তখন ছিল আকাশচুম্বী। সশরীরে না থাকলেও বঙ্গবন্ধুর নামেই মুক্তিযুদ্ধ করেছে মানুষ, অকাতরে জীবন দিয়েছে তাঁর নাম উচ্চারণ করেই। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রটি গুঁড়িয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জেগে ওঠা বিপুল শক্তিকে দিয়ে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। তার সেনাবাহিনী ও প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
কিন্তু সময়ের কাজ সময়ে না করা বা করতে না-পারার ফলে একদিকে সাধারণ মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বিদ্যমান রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী,আমলাতন্ত্র, বিচার ব্যবস্থাসহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সকল শাখায় নিজেদের সংগঠিত করেছে, ষড়যন্ত্র করেছে। মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগামী অংশ যারা সেই ষাটের দশক থেকে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রাম ফলবতী করতে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে গেছেন, স্বাধীনতার পরপর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিপ্লবী জাতীয় সরকারের সঠিক দাবি উত্থাপন করেছেন, তাদেরই নেমে পড়তে হয়েছে বঙ্গবন্ধুবিরোধী অবস্থানে।
অবশ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সিরাজুল আলম খানের দিকনির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধের পরীক্ষিত শক্তির এত দ্রুত বঙ্গবন্ধুবিরোধী অবস্থান গ্রহণ সময়ের বিচারে সঠিক ছিল কি না তা নিয়েও সঙ্গত প্রশ্ন আছে। তবে জাসদ নামে আবির্ভূত মুক্তিযুদ্ধের তারুণ্যমণ্ডিত রাজনৈতিক শক্তিকে একটি কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে গড়ে উঠতে দিলে রাজনৈতিক শূন্যতায় নিমজ্জিত হত না বাংলাদেশ। ষড়যন্ত্রকারীরা শূন্যস্থান পূরণে সমর্থ হত না।
উপরের পর্যালোচনার আলোকে এবং অতীতের ভুল-শুদ্ধের কষ্টিপাথরে আপন অবস্থান সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে করণীয় নির্ধারণ হবে আমাদের মুখ্য রাজনৈতিক কর্তব্য। আওয়ামী লীগের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অর্থবহভাবে ধারণ করে এমন মধ্য-বাম রাজনৈতিক শক্তির একমাত্র বিবেচনা হবে রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে নিজেদের সংগঠিত করা। সমাজের উৎপাদক শ্রেণির আস্থাভাজন বিকল্প শক্তি হয়ে ওঠা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য বজায় রেখেও কার্যকর এবং শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা।
আগেই বলেছি রাজনীতির ময়দানে ডানপন্থী বিভিন্ন শক্তির মধ্যেই ক্ষমতা ঘুরপাক খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতিতে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসী শক্তির অপেক্ষায় আছে দেশের মেহনতি মানুষ, সত্যিকার সুশীল সমাজ ও নতুন প্রজন্ম।
আমার বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এমন মধ্য-বাম রাজনৈতিক দলের মধ্যে একমাত্র জাসদের পক্ষেই এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন সম্ভব। কারণ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে এই শক্তির অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে জাসদের অনমনীয় সাহস, দৃঢ়তা ও নেতা-কর্মীদের অকাতরে জীবনদানের দৃষ্টান্ত, জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের পর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকা, প্রতিবিপ্লবের মুখে পরাজয়ের অভিজ্ঞতা, নানা বিভক্তির পরও জাসদের মূল ধারাটির মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে অনমনীয় অবস্থান গ্রহণ, আওয়ামী লীগ ও বাম রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে সামরিক স্বৈরশাসন ও বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলনে নিয়োজিত থাকা-– এইসব বিরল অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ জাসদ। অতীতে এই দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং এখনও বেঁচে আছেন এমন অসংখ্য রাজনীতি-সচেতন মানুষ সারা দেশে ছড়িয়ে আছেন।
অন্যদিকে, বিভিন্ন বেগবান সংগ্রামে, বিশেষ করে ঘাতক-দালাল-যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে দুর্বার আন্দোলন ও শাহবাগে জাতীয় পুনর্জাগরণে শামিল হওয়া তরুণ প্রজন্ম যারা সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে, তাদের প্রত্যাশা পূরণে অন্যতম রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদকেই এগিয়ে আসতে হবে।
তাই সক্রিয় রাজনীতিতে নিজেকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে জাসদকে বেছে নিতে আমাকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়তে হয়নি।
যেসব সম্ভাব্য প্রশ্নের কৈফিয়ত আমাকে দিতে হবে:
১) ‘আমরা রাজনীতিকে ঘৃণা করি’– কেন ঐ ক্লেদে নিজেকে জড়াবেন?
সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের চালু করা এমন অপসংস্কৃতি দেশে বিরাজনীতিকরণে প্রভূত ভূমিকা রেখেছে; রাজনীতিবিমুখ করেছে মেধাবী জনগোষ্ঠীকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব সময় ও স্বাধীনতা-লাভের অব্যবহিত পরেও রাজনীতিকে এমন হেয় দৃষ্টিতে দেখা হয়নি। রাজনীতিতে যোগ দেওয়া গৌরব জ্ঞান করেছে তারুণ্য। তার ফলেই মহান সব অর্জন সম্ভব হয়েছে।
তেমন একটি অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সকলের রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ জরুরি। রাজনীতিকে ক্লেদমুক্ত করতেও তা প্রয়োজন। বাংলা প্রবাদ, “উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম, যিনি চলেন তফাতে” আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।
২) শিক্ষকতার মহান পেশাই আপনার জন্য উত্তম। সক্রিয় রাজনীতিতে নামা যথার্থ হবে না।
উন্নততর এবং আলোকিত সমাজ গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, তাতে সন্দেহ নেই। চার দশকের অধিক সময় আমি এই মহান পেশায় নিবিষ্ট থেকে শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে অবিচল থেকেছি, দায়িত্ব পালনে কখনও শিথিলতা প্রদর্শন করিনি। শিক্ষকতায় থেকেও দেশের নানা সংকটে ভূমিকা রেখেছি। দুদুবার কারাবরণও করেছি। নিঃসন্দেহে এই পেশায় জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় আমি কাটিয়েছি।
শিক্ষক জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রাজনীতিতে আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের ব্যাপক ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের কাছে এই বার্তা হোক যে, তাদের শিক্ষক ও সহকর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে জীবনের পাঠশালায় ফিরে গেছেন।
৩) সক্রিয় রাজনীতির বাইরে থেকেও আপনি সুস্থ রাজনীতি বিকাশে অবদান রাখতে পারেন।
সে দায়িত্ব পালনে আমি সব সময় সচেষ্ট থেকেছি। এবার রাজনীতির কঠিন সংগ্রামে নিয়োজিত হয়ে জীবনের বাকি সময়টুকুর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে চাই। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখির যে চর্চা করে এসেছি, তাও অব্যাহত রাখার চেষ্টা করব।
৪) বাংলাদেশে জাসদের আবির্ভাব দেশের এবং জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনেনি। জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের জন্য জাসদ পরোক্ষভাবে দায়ী।
এই অভিযোগের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত নই। বাংলাদেশে জাসদ শুধু একা নয়, আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আমরা সবাই নানা গুরুতর ভুল করেছি, কঠিন মাশুলও দিয়েছি। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি, হারিয়েছি বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন তেমন জাতীয় নেতাদের। হারিয়েছি কর্নেল তাহেরের মতো বিপ্লবী প্রাণ, কাজী আরেফের মতো অনমনীয় ও সৎ রাজনৈতিক সংগঠক। হারিয়েছি অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকেও।
জাসদ সম্পর্কে শেষ কথা বলে দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। এর মূল্যায়ন চলছে, আগামী দিনেও চলবে। তবে এ কথা স্পষ্টতই বলা যায় যে, জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডের পর জাসদই হয়েছে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির আঘাতের মূল লক্ষ্যবস্তু। জাসদ ছিল বলেই একটি মধ্যপন্থী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ রক্ষা পেয়েছে। তা না হলে ইন্দোনেশিয়ার জাতির জনক সুকার্নর দলের পরিণতি হত আওয়ামী লীগের।
৫) সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির ক্ষমতাসীন হওয়া এবং দুই যুগের বেশি সময় নিরঙ্কুশভাবে দেশ শাসনের কারণে বাংলাদেশ যে বহু বছর পিছিয়ে গেল, তার দায়ভার জাসদের।
জাসদের সহযোগিতায় কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ৭ নভেম্বরের সিপাহী অভ্যুত্থান জিয়াউর রহমানের প্রতিবিপ্লবের কাছে পরাজিত হয়েছিল বলে জিয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ক্ষমতাসীন হতে পেরেছিল। সেই অর্থে এই অভিযোগের দায়ভার জাসদ, কর্নেল তাহের ও সিরাজুল আলম খান এড়াতে পারেন না। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা দখলকারী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ সিপাহীদের অভ্যুত্থান রচনা করে জাসদ অন্তত একটি উদ্যোগ নিয়েছিল, আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল তাও নিতে পারেনি।
জাতির সেই দুঃসময়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদ যদি ভূমিকা না রাখত, তাহলেও আওয়ামী লীগ নয়, দক্ষিণপন্থীরাই ক্ষমতায় আসত। তার কারণ জাসদ সৃষ্টি করেনি। স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্র অটুট রাখাই মূল কাল হয়ে দেখা দিয়েছিল। তাকে ভাঙতে জাসদ চেষ্টা করেছে, সফল হয়নি। ফলে প্রতিবিপ্লবী শক্তির মূল আঘাত নিজেকে সহ্য করতে হয়েছে।
৬) জাসদ বহুধা-বিভক্ত। এই দলের ভবিষ্যৎ নেই। জনসমর্থনও নেই।
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আস্থা অর্জন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বড় বিজয় লাভ সম্ভব হয় না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তা করতে পেরেছিল বলেই সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ ও তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্ভব হয়েছিল। যে নিবিড় জনসংযোগ ও গণসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু সারা দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন, তা রচনায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল যে তরুণ নেতৃত্ব, তারাই জাসদ প্রতিষ্ঠা করেছিল স্বাধীন বাংলাদেশে। সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অতি দ্রুত জাসদ আওয়ামী লীগের বাইরে একটি জনসম্পৃক্ত সম্ভাবনাময় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছিল।
কিন্তু ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানে পরাজয়, গোপন বিচার প্রহসনে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি এবং শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সাজা ও সারা দেশে নেতা কর্মীদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে জাসদ দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক দলের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এমন বিপর্যয়ের ঘটনার বহু নিদর্শন পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ইতিহাসেও এমন দৃষ্টান্ত আছে। লক্ষ্যে স্থির দৃঢ়চিত্ত ও সাহসী প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব আপোষহীন থেকে পুনরায় জনসমর্থনে পুষ্ট হয়ে পূর্বের চেয়েও শক্তিশালী দলে পরিণত হয়, বড় বিজয় অর্জন করে।
জাসদের ক্ষেত্রেও তেমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাজাপ্রাপ্ত শীর্ষ নেতা সিরাজুল আলম খানের পোশাক-বদল তত্ত্বের মোড়কে বিশ্বাসঘাতক সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে অনৈতিক আপোসের ফল হিসেবে তিনি নিজে এবং মেজর জলিল, আসম রব ও শাহজাহান সিরাজ জেল থেকে বেরিয়ে আসায় জনমনে জাসদের আপোসহীন ভাবমূর্তি মলিন হয়ে পড়ে। নীতিহীন আপোসের পথ ধরলে যে পরিণতি হওয়ার কথা জাসদের ক্ষেত্রে তাই হল। মুক্তিযুদ্ধের চার বরেণ্য নেতা সম্পূর্ণ অপাংক্তেয় ব্যক্তিতে পরিণত হলেন। জাসদ বহুধা-বিভক্ত হল।
এসব বিভক্তির পরও জাসদের মূল স্রোত দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও সফলতা-ব্যর্থতার পথ পেরিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির সঠিক পথটি অনুসরণ করছে। তা হল, মুক্তিযুদ্ধের ফসল সংবিধানের চার মূলনীতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে অবিচল থাকা। একটি মধ্যবাম রাজনৈতিক দল হিসেবে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বলিষ্ঠ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি হাজির করা। বর্তমান দেশীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে একটি ন্যায় ও সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সামাজিক গণতন্ত্রকে (ঝড়পরধষ উবসড়পৎধপু) মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য স্থির করে জনগণের আস্থা অর্জনে সতত নিয়োজিত থাকা। জাতীয় সংসদে আসন বৃদ্ধি করে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া।
তা সম্ভব হবে যদি জাসদ জনগণের সঙ্গে নিবিড় ও আস্থার সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। এই দুরুহ পথ অতিক্রম করতে পারলে জাসদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ থাকবে। আওয়ামী লীগের বিকল্প রাজনৈতিক দল হিসেবে জনসমর্থনও পাবে।
৭) রাজনীতিতে যোগ দিতে হলে আওয়ামী লীগে যোগ দিন। বহু বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও তার সভাপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে এসেছেন আপনি।
আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে এই দল ও তার কাণ্ডারী শেখ হাসিনাকে সমর্থন দেওয়া যথার্থ বলে মনে করেছি। জাসদে যোগ দেওয়ার পরও সংবিধানের চার মূলনীতি বাস্তবায়নে ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি বা অসাংবিধানিক শক্তির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার প্রতি আমার সক্রিয় সমর্থন অব্যাহত থাকবে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, ডান বলয়ের আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের মূল জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নে তেমন অবদান রাখা যাবে না।
৮) দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের শক্তি যে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে আছে, তাকে আরও শক্তিশালী করা এই মুহূর্তের রাজনৈতিক কর্তব্য। আপনার জাসদে যোগদান তাকে দুর্বল করবে।
আমার জাসদে যোগদানের অর্থ এই নয় যে, মুক্তিযুদ্ধের শক্তির ঐক্যবদ্ধ অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসা। বরং এই ঐক্য অর্থবহ করা হবে অন্যতম লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধের একটি দলের শক্তিশালী অবস্থান ১৪দলীয় জোটকে শক্তিশালী করবে।
৯) জাসদের অতীত রাজনীতির পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে না।
জাসদ অতীতের রাজনীতির অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করেই নতুন রুপে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবির্ভূত হবে। তার রুপরেখা পূর্বে উল্লেখ করেছি।
১০) শেখ হাসিনার সরকারের কাছ থেকে আপনার কিছু পাবার আশা নেই। তাই আপনার জাসদে যোগদান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা আমি সব সময় পরম জ্ঞান করেছি। আমার চাওয়া থেকে নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠিন দুঃসময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানাতেই উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম। স্বল্পতম সময়ে সিনেট ডেকে নির্বাচিত উপাচার্য হিসেবে উচ্চ নৈতিকতার স্থান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেছি। দায়িত্ব পালনে শিথিলতা দেখাইনি।
কিন্তু শিক্ষকদের একাংশের সৃষ্ট লাগাতার অনৈতিক ও চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থতিতে পদত্যাগই ছিল একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষকের একমাত্র করণীয়। সে পথ অনুসরণ করে আপন কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসেছি। যদিও নির্বাচিত উপাচার্য নিজে পদত্যাগ না করলে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া যেত না। পদত্যাগের বিনিময়ে সরকারের কাছে অন্য কোনো পদও চাইনি।
অন্যদিকে জাসদের রাজনীতিতে যোগ দিয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে পাওয়ার কিছু নেই। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করব, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশের জন্য জাসদের মতো দলের সবল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রয়োজনীয়তা যেন তিনি উপলব্ধি করেন। তাঁর কাছ থেকে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
১১) জীবনে বহু হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটিও তেমন একটি সিদ্ধান্ত।
আমার জীবন বেশ ঘটনাবহুল। আপাতদৃষ্টিতে আমার নেওয়া অনেক সিদ্ধান্তকে হঠকারী বলে মনে হতে পারে। তার কিছু উদাহরণ নিচে দেব:
১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ে লেখাপড়া ছেড়ে দেশ স্বাধীন করার বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিয়েছি সিরাজ সিকদারের সঙ্গে। টেকনাফ অঞ্চলে সশস্ত্র যুদ্ধের ঘাঁটি অঞ্চল গড়ে তুলতে চেয়েছি। বার্মার কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। সে অভিযাত্রা সফল হয়নি। পুনরায় লেখাপড়ায় ফিরে এসেছি।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসনামলে দ্বিতীয়বারের মতো লেখাপড়া ছেড়ে বান্দরবানের গহীন অরণ্যে চলে গিয়েছি একই উদ্দেশ্যে। এবার চট্টগ্রামে পাকিস্তানের কমান্ডো বাহিনীতে কর্মরত আমার অগ্রজ মেজর আবু তাহেরকে আমাদের উদ্যোগে শামিল করেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে গোপনে আমাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দানের দুরুহ কাজ তিনি শুরু করেছিলেন। কিন্তু সিরাজ সিকদারের সঙ্গে যৌথ নেতৃত্বের দর্শনে কাজ করা সম্ভব হয়নি বলে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে পুনরায় লেখাপড়ায় ফিরে আসতে পারলেও পরবর্তী ব্যাচে ভর্তি হতে হয়েছে।
ছাত্রজীবনে এভাবে লেখাপড়া ছেড়ে দেওয়া হঠকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীসহ অনেকে।
ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত না থাকার কারণে বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদপুষ্ট ‘নিউক্লিয়াসের’ কথা আমার জানা ছিল না। তা জানা থাকলে আমার ও তাহেরের রাজনৈতিক সংযোগ যে তাদের সঙ্গে হত তাতে সন্দেহ নেই। কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন করার প্রশ্নে নিউক্লিয়াস ও সিরাজ সিকদারের রাজনৈতিক তত্ত্বে বড় রকমের পার্থক্য ছিল না।
১৯৭১এর মার্চের পয়লা তারিখেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আমার নেতৃত্বে ‘সূর্যসেন স্কোয়াড’ গড়ে উঠেছে। এবার তাতে যুক্ত হয়েছিল এই হলে নিউক্লিয়াসের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রলীগের স্বাধীনতাকামী আমার বন্ধু ছাত্রকর্মীরা। ততদিনে তাদের উদ্যোগের কথা আমি জেনেছি। আমরা সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধে মেজর তাহেরের নেতৃত্বে ১১ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।
১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে আমার মাধ্যমেই কর্নেল তাহেরের সঙ্গে সিরাজুল আলম খানের ঐতিহাসিক বৈঠকটি হয়। তার আগের মাসে তাহের বঙ্গবন্ধুর কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র পেশ করেছিলেন। একটি সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন পূরণে তাঁরা একমত হন। জাসদ গঠিত হলে কর্নেল তাহেরের জন্য জ্যেষ্ঠ সহসভাপতির পদটি ফাঁকা রাখা হয় গণঅভ্যুত্থান সংগঠনে তাঁর বিশেষ ভূমিকা পালনের কথা বিবেচনা করেই। ১৯৭৪ সালে বিপ্লবী গণবাহিনী গড়ে তোলার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হওয়ার পর ওই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক করা হয় তাঁকে। দলের সভাপতি মেজর জলিল তখন কারাগারে।
১৯৭৫ সালের পয়লা জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতায় যোগ দিই। তার আগে ১৯৭৪ সালের শেষে সাংগঠনিকভাবে জাসদের সঙ্গে যুক্ত হই। আমাকে ঢাকা শহর গণবাহিনীর অধিনায়ক করা হয়। যেখানে শিক্ষকতায় যোগ দেব সেখানে শহর গণবাহিনীর অধিনায়ক হওয়া হঠকারী বৈকি!
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর কর্নেল তাহের ও গণবাহিনীর সহঅধিনায়ক হাসানুল হক ইনুসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ গ্রেপ্তার হয়ে যাওয়ার পর ২৬ নভেম্বর তারিখে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সমর সেনকে জিম্মি করে নেতৃবৃন্দের মুক্তি ও সিপাহী অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও জিয়াউর রহমানের বিশ্বাসঘাতকতা বেতার ও টিভিতে দেশবাসীকে জানাবার জন্য এক অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানটি সফল হয়নি। আমাদের চারজন সাথী শহীদ হয় এবং দুজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেপ্তার হয়। নিহতদের মধ্যে শাখাওয়াত হোসেন বাহার বীর প্রতীক ও আহতদের মধ্যে ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীর প্রতীক ছিল আমার অনুজ।
যদিও বিশেষ পরিস্থিতিতে এমন বিপ্লবী অভিযানের পরিকল্পনা পূর্বনির্ধারিত ছিল, তথাপি আমার উপরস্থ হাসানুল হক ইনু এবং কর্নেল তাহের কারাগারে থাকায় ঢাকা শহর গণবাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে এই ব্যর্থ অভিযানের সকল দায়-দায়িত্ব আমি নিজে গ্রহণ করি। একারণে বহু জনের কাছে আমি হঠকারী হিসেবে চিত্রিত হয়েছি।
১৯৭৫এর নভেম্বর অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার এড়াতে আমাকে আত্মগোপনে যেতে হয়। আমি শিক্ষকতার পদে ইস্তফা দেই, যদিও তার জন্য আমার উপর কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। তথাপি আমি শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনে অপারগ হচ্ছিলাম বলে ইস্তফা দেওয়াই নৈতিক মানদণ্ডে বিবেচনা করেছি। যদিও আমার শিক্ষক সহকর্মীগণ একে হঠকারী হিসেবে দেখেছেন। প্রচলিত অর্থে তাঁরা সঠিকও ছিলেন। তখন ইস্তফা না দিলে পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক জীবন থেকে ৫ বছর বাদ পড়ে যেত না।
প্রায় পাঁচ বছর কারাবাসের পর মুক্ত হয়ে পুনরায় শিক্ষকতায় যোগ দিই। তা সম্ভব হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ফসল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের রক্ষাকবজ ১৯৭৩ সালের আইনের কারণে। কারাগার থেকে মুক্তির পর আমার উদ্যোগে ‘কর্নেল তাহের সংসদ’ গড়ে উঠে। ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে জাপানের বিখ্যাত কিয়োতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় যোগ দিই। তিন বছরে তা সম্পন্ন করার পর আমেরিকায় আইভি লীগের সদস্য ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ব্যারি অসমণ্ডের সঙ্গে গবেষণার প্রস্তাব আসে। একজন বিজ্ঞানীর জীবনে এমন সুযোগ খুব বেশি আসে না। সে সুযোগ গ্রহণ না করে আমি বাংলাদেশে ফেরত আসি।
এই সিদ্ধান্ত আমার সহকর্মীরা হঠকারী হিসেবে মনে করলেও আমার সে সময় মনে হয়েছিল দেশে ফেরা প্রয়োজন আমার ছাত্রদের কাছে। দ্বিতীয়বারের মতো শিক্ষকতায় যোগ দেবার পরও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বর্তমান জাসদের মূল ধারার সঙ্গে আমার রাজনৈতিক সম্পর্ক অটুট ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ আইন বলবত হবার পর থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থক শিক্ষকগণ নীল দলে এবং বাম চিন্তার শিক্ষকগণ গোলাপি দলে বিভক্ত ছিলেন বিভিন্ন নির্বাচনে প্যানেল দেওয়ার সুবিধার্থে। আমি কোনো শিক্ষক মোর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না যদিও উভয় মোর্চায় আমার ঘনিষ্ঠ শিক্ষকেরা ছিলেন।
স্বৈর-সামরিক শাসক এরশাদের সঙ্গে বোঝাপড়ায় নীল দলভুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল হকের স্থলে বাম-গোলাপি মোর্চার অধ্যাপক আবদুল মান্নান উপাচার্য নিযুক্ত হওয়ার পর ইংরেজির অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ভুগোলের অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া, সমাজবিদ্যার অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী, পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হারুনর রশিদ, দর্শনের অধ্যাপক হাসনা বেগম, বাংলার অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদ প্রমুখ শিক্ষকদের উদ্যোগে সাদা দল গঠিত হলে আমি এই মোর্চায় যোগ দিই।
সংবিধানের চার মূল নীতিতে আস্থা আছে এমন শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত এই মোর্চা কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী হবে না বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। সে কারণেই মোর্চার নাম সাদা দল রাখা হয়। বলা হয় শিক্ষকদের মূল কাজ হবে একাডেমিক, তবে রাজনৈতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতির ব্যাপারে তাঁরা হবেন সচেতন।
খুব দ্রুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা দল গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদসহ বহু মেধাবী শিক্ষক সাদার মোর্চায় যোগদান করেছিলেন বলেই তা সম্ভব হয়েছিল। উপরে বর্ণিত শিক্ষকেরা সে সময় বাম চিন্তা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুসারী বলে পরিচিত ছিলেন।
জামায়াতভুক্ত শিক্ষক যারা গোপন ফোরাম নামের সংগঠনে থেকে কাজ করতেন তারা বিভিন্ন নির্বাচনে নীল দলের সঙ্গে প্যানেলভুক্ত হতেন। সাদা দলভুক্ত শিক্ষকগণ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এরশাদ কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার বিরুদ্ধে নির্বাচিত সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে আমি প্রধান বাদী হয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করি। আমার সঙ্গে সাদা দলের শিক্ষক সাইদ-উর রহমান এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদভুক্ত সকল ছাত্র সংগঠনের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক সহ-বাদী হয়েছিলেন। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথিতযশা আইনজীবীরা আমাদের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানে এই লড়াই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নব্বইএর গণঅভ্যুত্থানের পর অপ্রত্যাশিতভাবে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠন করলে সাদা দলের কয়েকজন শীর্ষনেতাসহ অনেক শিক্ষক সরকার-সমর্থক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এর প্রতিবাদে সর্বপ্রথম আমি সাদা দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করি। পরে উপরে বর্ণিত জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মধ্যে কয়েক জন সাদা দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি।
সাদা দলের শুরুতে আমার সেখানে যোগদান কেউ কেউ অনৈতিক ও হঠকারী বলেন। এ নিয়ে অপপ্রচারও চলছে ‘গবেষণা’র নামে। তার জন্যই এ বিষয়ে একটু দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে।
১৯৯১ সালের শুরুতে আমি আমেরিকার পারড়ু বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রকফেলার ফেলো’ হিসেবে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী জে সি আর্থার ডিস্টিংগুইশট প্রফেসর থমাস কে হজেসএর অধীনে বন্যা-সহনশীল ধান উদ্ভাবন গবেষণায় যোগ দিই। কী বিষয়ে গবেষণা করব তা নির্ধারণ করতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তাই ছিল আমার কাছে মুখ্য। ’৯৪ সালে যখন দেশে ফিরে আসি, ততদিনে সাদা দল বিএনপি ও জামায়াতভুক্ত শিক্ষকদের দলে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে বাম চিন্তার শিক্ষকদের অনেকে যুক্ত হয়েছেন নীল দলে। আমি নীল দলে যুক্ত হই কারণ তখন আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসের সবচেয়ে কাছে অবস্থান করছিল এই মোর্চার অধীনে সংগঠিত হওয়া শিক্ষকরা। বেগম খালেদা জিয়ার জনবিরোধী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নীল দল থেকে সক্রিয় থাকার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আমার ফ্ল্যাটে গভীর রাতে সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করে, গুলি চালায়।
২০০২ সালে রাতের অন্ধকারে শামসুননাহার হলের ছাত্রীদের উপর পুলিশের হামলা ও ১৮ জন ছাত্রীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীদের পাশে আমি দাঁড়িয়েছি আরও শিক্ষকদের সঙ্গে। পুলিশের লাঠির আঘাতে আমার হাঁটু ভেঙ্গে যায়। সাড়ে তিন মাস আমি শয্যাশায়ী থাকি। এভাবে বিপন্ন ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানো হঠকারী বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
২০০৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ছাত্র ও সেনা সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষ কেন্দ্র করে উত্তাল ছাত্র আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করেছি, বিপন্ন ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছি।
এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হলে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে শক্তিশালী এবং কার্যকর প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করেছি। সমিতির মুখপত্র হিসেবে সংবাদ মাধ্যমে বক্তব্য রেখেছি। অনেকের চোখে তা ছিল হঠকারী।
২০০৭ সালের ২২ আগস্ট সকাল ১১টায় ডিজিএফআই্এ ব্রিগেডিয়ার আমিনের নেতৃত্বে পাঁচ সেনা কর্মকর্তা ফুলার রোডের টাওয়ার ভবনে এসেছিলেন আমিসহ অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী ও অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদের সঙ্গে আলোচনা করতে। তিন ঘণ্টাব্যাপী সে আলোচনায় আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলাম, অবিলম্বে শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসতে, জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করে অনতিবিলম্বে জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে। আমার সেই বক্তব্য হঠকারী বলে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন উপস্থিত এক সহকর্মী। তাঁর বিবেচনা হয়তো মিথ্যা ছিল না।
সেই দিন রাত বারটার পরপর যৌথ বাহিনী হানা দিয়েছিল টাওয়ার ভবনে। আমাকে ও সেই সহকর্মী অধ্যাপক হারুনকে চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল ডিজিএফআই সেলে। ১২ দিনের রিমান্ডসহ ৫ মাসের দুঃসহ কারাজীবনকালে সিএমএম কোর্টে যে জবানবন্দী দিয়েছিলাম, সেটিও হঠকারী বলেছেন সহবন্দী শিক্ষকগণ।
সম্ভবত উপরে বর্ণিত কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ আমাকে আস্থায় নিতে পেরেছিলেন। নীল দলের প্রার্থী হয়ে আমি জীব বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির দুবছরের সাধারণ সম্পাদক এবং পরপর দুই বার সভাপতি নির্বাচিত হই। নীল দলে আহ্বায়কের দায়িত্বও পালন করি।
২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একাংশের প্রবল বিরোধিতার মুখেও সর্বোচ্চ আদালতের আইনী সহায়তায় সিনেটে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন হঠকারী আখ্যা দিয়েছেন অনেকে। ২০১৩ সালে সরকারেরে সঙ্গে পূর্ব-আলোচনা ছাড়া জাকসু নির্বাচন দেওয়াও হঠকারী বলে আখ্যায়িত করেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী। ২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারি নির্বাচিত উপাচার্যের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ হঠকারী বলেছেন নিকটজনেরা।
২০১৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধাপরাধী ঘাতক কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে শুরু হওয়া গণজাগরণে আমি শুরু থেকেই যোগ দিয়েছি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদে থেকে আমার এভাবে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে গণজাগরণে অংশ নেওয়া কিছু শিক্ষক হঠকারী বলেছেন শুধু নয়, রাতের অন্ধকারে জামায়াত-শিবিরের জঙ্গিরা উপাচার্য ভবন আক্রমণ করেছে, আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
জীবনে এত হঠকারী সিদ্ধান্তের পরও আমার চেতনা ও লক্ষ্যে আমি এখনও একজন বিপ্লবীই রয়ে গেছি। জীবনে বড় অর্জন তেমন কিছু নেই, তাতে আমার খেদও নেই। আমি পরিপূর্ণভাবে সুখী মানুষ। আমি আমার স্বপ্নগুলো গভীর যতেœ হৃদয়ের গভীরে লালন করে যাচ্ছি।
জীবনের পরিণত বয়সের এই ক্ষণে জাসদে যোগদান যদি হঠকারী হিসেবে চিত্রিতও হয়, তাতে আমি বিচলিত হব না। অতীতের আপাতদৃষ্টিতে হঠকারী কোনো সিদ্ধান্তই হঠকারী বলে মনে করি না; কারণ আমার নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল আমার মনে এবং হৃদয়ে ধারণ করা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতিতে পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাসী রাজনৈতিক শক্তির খুব বেশি প্রয়োজন আজ। তা অর্জনে দরকার সাহসী, সময়োপযোগী ও নিঃস্বার্থ সিদ্ধান্তের। তাহের ভাই বলতেন, ‘‘নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর বড় কোনো সম্পদ নাই। আমি তার অধিকারী। আমি আমার জাতিকে তা অর্জন করতে ডাক দিয়ে যাই।’’
তাহের ভাইয়ের ডাকে নিঃশঙ্ক চিত্ত অর্জনের পথ ধরে হাঁটছি বহু বছর, কিছু পথ এখনও বাকি আছে। নিঃশঙ্ক চিত্ত অর্জন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন, তাহেরের মতো মহাপ্রাণেরা। তাঁরা বাংলাদেশের ভিত্তি হিসেবে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চেয়েছিলেন, যে সমাজে মতপার্থক্য থাকলেও মানুষ মানুষের চিন্তার ভিন্নতাকে সম্মান করবে। এমন একটি আলোকিত সমাজ সৃষ্টি করতে গিয়েই হুমায়ুন আজাদ-অভিজিৎ-অনন্তের মতো মানুষ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জঙ্গিবাদী শক্তির হাতে প্রাণ দিয়েছেন।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন নিয়ে আমরাও নিঃশঙ্ক চিত্ত অর্জন করতে পারব, গড়ে তুলতে সক্ষম হব একটি ন্যায় ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজের, যে সমাজ দুর্বলের উপর চড়াও হয় না, সংখ্যালঘুরা নিজেদের শক্তিহীন মনে করে না। একজন রাজনীতি-সচেতন শিক্ষক হিসেবে জীবনে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের স্বার্থ এবং মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির বিপরীতে কিছু করিনি।
সামনের দিনগুলোতে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবেও সে পথ থেকে বিচ্যুত হব না এই আশ্বাস দিচ্ছি।
জয় বাংলা।
-লেখকঃ ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক উপচার্য, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়।