Home মতামত “কার্বন নির্গমনঃ জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস”

“কার্বন নির্গমনঃ জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস”

56

মোঃ আকিক তানজিল জিহান: কালের পরিক্রমায় মানবসভ্যতার ক্রমবর্ধমান বিকাশ সাধিত হয়েছে। গত কয়েক শতকের শিল্প বিপ্লবের দরুন প্রভাবে কৃষিনির্ভর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ক্রমেই পরিবর্তিত হয়ে যন্ত্রনির্ভর ব্যবস্থার আকার ধারণ করে। ফলস্রুতিতে, প্রকৃতি ও পরিবেশের এক ধারা থেকে অন্য ধারায় পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্টই লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতির মৌলিক উপাদান তথা মাটি, বায়ু, পানি, বায়ুমন্ডল ও আলো – যার উপর পুরো জীববৈচিত্র্য নির্ভরশীল, তা আজ কার্বন নির্গমনের যাঁতাকলে পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছে। একদিকে, অতিরিক্ত কার্বন নির্গমনের ফলে সৃষ্ট গ্রীনহাউজ গ্যাসের প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, এর প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তিত হবার ফলে প্রাণ-প্রকৃতি, বাস্তুতন্ত্র বা পরিবেশ তার স্ব-বৈচিত্র্য হারাচ্ছে।

নোবেলজয়ী বায়ুমন্ডল বিষয়ক রসায়ন বিজ্ঞানী পল জে. ক্রুটজেন মানুষ ও পরিবেশের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে ভূতাত্ত্বিক কাল বিভাজনে দুটি পর্বের ইঙ্গিত করেছন। একটি হলোসিন(holocene), অপরটি অ্যানথ্রোপসিন(Anthropocene)। প্রথম পর্বে কৃষিনির্ভর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় মানুষকে বায়োলজিকাল এজেন্ট(biological agent) হিসেবে অবিহিত করলেও, দ্বিতীয় পর্বে সমসাময়িক যন্ত্রনির্ভর পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় মানুষকে জিওলজিকাল এজেন্ট ( geological agent) হিসেবে অবিহিত করেছেন।[১] এ থেকে স্পষ্টই ধারণা পাওয়া যায় যে, কৃষিনির্ভর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় মানুষ পরিবেশের উপাদানের উপর কিছুটা প্রভাব ফেললেও ব্যবহারের দ্বারা সর্বপরি উপকৃত হত। কিন্তু যন্ত্রনির্ভর পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় মানুষের জীবনযাত্রা সহজতর হলেও প্রাকৃতিক সম্পদের বিধ্বংসী ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত ধোঁয়া ও বর্জ্য নিষ্কাশনের মাধ্যমে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে চলেছে প্রতিনিয়তই। অন্যভাবে বলতে গেলে নগরায়ন, অরণ্যবিনাস, জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, জলাভূমি ভরাট, কৃষি জমি ধ্বংস এবং কলকারখানার অপরিকল্পিত বর্জ্য নিষ্কাশনের দরুন প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, জলচ্ছাসসহ, ভূমিকম্পের মত প্রাকৃতিক দূর্যোগের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। একইসাথে মাটি, বায়ু, পানির মত পরিবেশের উপাদানগুলো বিনষ্ট হবার পথে।

ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইন্সটিটিউটের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ১৮৫০ সালের চেয়ে ২০১১ সালে এসে কার্বনডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমান ১৫০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৮০ সালে কার্বনডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমান ছিল ১৯৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা ২০১১ সালে হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩২২৭৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ইতিহাসের যেকোনো সময়ের মধ্যে এটিই সার্বাধিক। [২]

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ‘ক্লাইমেট একশন প্ল্যান ২০২১-২০২৫’-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের হার কলকারখায় ২৯%, কৃষি জমিতে ১৮%, গৃহস্থালিতে ১৮%, যোগাযোগব্যবস্থায় ১৬%, বর্জ্য নিষ্কাশনে ৪% এবং অন্যান্য খাতে ১৫%। [৩]

২০১৮ সালের ইউনিয়ন অব কনসার্ন্ড সাইন্টিস্টের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বাধিক কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন দেশগুলোর তালিকায় চীন শীর্ষে অবস্থান করছে। যারা কার্বন নির্গমন করছে ১০০৬০ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অন্যদিকে, পূর্বের শীর্ষক দেশ যুক্তরাষ্ট্র ৫৪১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন নির্গমন করে দ্বিতীয়। এরপর ক্রমান্বয়ে ভারত ২৬৫০ মিলিয়ন মেট্রিক টন, রাশিয়া ১৭১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন, জাপান ১১৬০ মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন নির্গমন করছে। এছাড়াও অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে জার্মানি, ইরান, কোরিয়ার মত অন্যতম পরাশক্তির দেশগুলো। অপরদিকে, সর্বোচ্চ ১৮.৪৮ টন মাথাপিছু কার্বন নির্গমন করে সৌদি আরব শীর্ষে। এরপরই যথাক্রমে ১৭.৬০ টন, ১৬.৯২ টন, ১৬.৫৬ টন, ১৫.৩২ টন মাথাপিছু কার্বন নির্গমনে রেকর্ড দেশগুলো হল তাজাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। [৪]

জলবায়ু গবেষক ওয়ালেস ব্রোয়েকারের মতে, ওজন স্তরের ক্রমাগত ক্ষয় এবং বিশালাকায় হিমবাহ প্রবাহের ফলে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন সূচিত হয়েছে বা হতে পারে। [৫] কারণ, এই হিমবাহের বরফের নিচে কার্বন ডাইঅক্সাইডের চেয়ে ২৪ গুণ বেশি গ্রীনহাউজ গ্যাস মিথেন স্তূপীকৃত রয়েছে। যা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে বায়ুমন্ডলই কাচের ঘরের ভূমিকা নিবে এবং সূর্যের আলো, তাপ, ও অতিবেগুনী রশ্মি প্রতিফলিত হতে পারবে না। এর ফলে তাপমাত্রা ক্রমশই বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এখন পর্যন্ত বাৎসরিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড, ১৯৯৫ সালের ৫৯.৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। [৬] ১৯৯০ সালের আইপিসিসি’র পূর্বাভাস মতে ২০৩০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শতাব্দীর শেষদিকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে পৃথিবীর বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এই গড় তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৬ ফুট বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজ্ঞানী জেমস হ্যানসেনের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে এবং পৃথিবীর বুক থেকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ প্রজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কার রয়েছে। [৭] শতাব্দীর শুরুর দিকে বেশ কয়েকটি পরিসংখ্যানের নজর দিলে দেখা যায়, বিশ্বে প্রতি ২০ মিনিটে একটি করে এবং দিনে গড়ে ১৪০টি প্রাণী প্রজাতি পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি ঘণ্টায় ৬৮৫ হেক্টর পরিমাণ ভূমি মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে এবং ৬০ জন লোক ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। একইসাথে প্রতি মিনিটে গড়ে ২১ হেক্টর পরিমাণ বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে। এ ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি হিসেবে ৩৫ হাজার লিটার পেট্রোলিয়াম পুড়ছে বলে জানা যায়।[৮]

অন্যদিকে, ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৯.৬ বিলিয়ন পৌঁছাবে এবং জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ সরবরাহকরণে পৃথিবীর সমতুল্য প্রায় তিনটি গ্রহের প্রয়োজন হতে পারে।[৯]

তথ্যসূত্রঃ

১. জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্ব এখন কোন পথে; নূর মোহাম্মদ; সংহতি প্রকাশন

২. The History of Carbon Dioxide Emissions; World Resources Institute https://www.wri.org/insights/history-carbon-dioxide-emissions

৩. Climate Change Action Plan 2021–25; WORLD BANK GROUP

৪. Each Country’s Share of CO2 Emissions; Union of Concerned Scientists https://www.ucsusa.org/resources/each-countrys-share-co2-emissions

৫. পরিবেশ বিজ্ঞান; সুব্রত কুমার সাহা; বাংলা একাডেমি

৬. 95 Is Hottest Year on Record As the Global Trend Resumes; New York Times
https://www.nytimes.com/1996/01/04/world/95-is-hottest-year-on-record-as-the-global-trend-resumes.html#:~:text=The%20other%2C%20maintained%20by%20the,record-keeping%20began%20in%201866.

৭. জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্ব এখন কোন পথে; নূর মোহাম্মদ; সংহতি প্রকাশন

৮.পরিবেশ বিজ্ঞান; সুব্রত কুমার সাহা; বাংলা একাডেমি

৯. Facts and Figures ; UN;
https://www.un.org/en/actnow/facts-and-figures

-লেখক:শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।