“কমরেড বিমল বিশ্বাস আজ ৭৫ পেরিয়ে ৭৬ এ পা রাখবেন “

28

১৯৪৬ সালের ১২ই জুলাই নড়াইল জেলা সদর থানার ঐতিহ্যবাহী গোবরা গ্রামে এক কৃষক পরিবারে কমরেড বিমল বিশ্বাস জন্মগ্রহণ করেন।গোবরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে গোবরা পার্ব্বতী বিদ্যাপীঠে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন।গোবরা পার্ব্বতী বিদ্যাপীঠে নবম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালীন সময় ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমানের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বিরোধী যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সেই ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৩সাল থেকে ছাত্র ইউনিয়নের একজন কর্মী হিসেবে উক্ত সংগঠনের কাজ শুরু করেন এবং ঐ সালেই এসএসসি পাস করে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। স্থানীয়ভাবে ফুটবল,হকি,ব্যাডমিন্টন,তাস,দাবা ইত্যাদি খেলায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী পাশাপাশি তিনি আবার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। স্কুলজীবনেই অন্তত ৩৫টি নাটকে অভিনয় করেছেন।ঐ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক কবি লেখকদের বই পড়ার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ ছিল তাঁর। ১৯৬৬ সালে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্কলারশিপ নিয়ে আইএসসি পাস করেন এবং ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াকালীন সময়ে ১৯৬৬-৬৭ সালে জিএস ও ১৯৬৭-৬৮ সালে ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৮সালে বিএ পাস করে খুলনা সুন্দরবন ‘ল’ কলেজে আইন শাস্ত্রে ভর্তি হন কিন্তু পাকিস্তান সরকারের মিথ্যা মামলায় কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। ফলে আইনের সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ছাত্র আন্দোলনের কারণে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ১৯৬২সাল থেকে ১৯৬৯সালের মধ্যে চারবার কারাবন্দি করে। ১৯৬৫ সালে কমরেড বিমল বিশ্বাস তখনকার অবিভক্ত পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৭ সালের কমরেড বিমল বিশ্বাস পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন(মেনন গ্রুপ) সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।১৯৬৯ সালে নড়াইলে গণ-আন্দোলনে, গণ-অভ্যুথানে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসাবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। ১৯৭০সালে মিথ্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে পার্টির নির্দেশে আত্মগোপনে যান।১৯৭০ সালের আগষ্ট মাসে তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)-র যশোর জেলা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বৃহত্তর যশোর জেলায় ইপিসিপি (এম এল) এর নেতা-কর্মী শুভানুধ্যায়ীদের বিরোচিত লড়াইয়ের পূর্ব ভাগে ছিলেন। ১৯৭০ সালের মিথ্যা মামলা ১৯৭২সালে জজ কোর্টের রায়ে বেকসুর খালাস হয়, একই বছর কেন্দ্রীয় কমিটির বিকল্প সদস্য নির্বাচিত হন এবং বৃহত্তর যশোর জেলার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪সালের ১৩ই মে তিনি গ্রেপ্তার হন।৫বছর ৬মাস কারাভোগের পর ১৯৭৯সালের ২০নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ে বেকসুরভাবে মুক্তি পান।
জেল থেকে বেরিয়ে বিভক্ত (খন্ড-বিখন্ড)কমিউনিস্টদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৮২সালের ২৪ এপ্রিল বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এম এল) এবং কমিউনিস্ট লীগ (এম এল) ঐক্যবদ্ধ হলে ঐ পার্টির নাম হয় বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ। কমরেড বিমল বিশ্বাস সহ ঐ পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ছিলেন ৫জন। ১৯৮৩ সালে এপ্রিল মাসে কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় কমরেড বিমল বিশ্বাসের অনুপস্থিতিতেই সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন।১৯৮০সালে পাঁচটি কৃষক সংগঠন মিলে যে জাতীয় কৃষক সমিতি গঠিত হয়, দুই বার তার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কমরেড বিমল বিশ্বাস।পরবর্তীতে কমরেড হাজী বশির ও কমরেড শাহ আলম মানিক ও কমরেড ফজলে হোসেন বাদশার দল(সাম্যবাদী দলের একটি অংশ) বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সঙ্গে মিলে যায়।১৯৮৬সালের অক্টোবর মাসে ওই সংগঠিত দলটির নাম রাখা হয় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগ এবং তিনি তখন সর্বসম্মতভাবে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন(পলিটব্যুরোর ছিল ৭ সদস্যর)। ১৯৮৮ সালে কমরেড অমল সেন ও কমরেড নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে ওয়ার্কার্স পার্টি এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগ মিলে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ গঠিত হলে কমরেড অমল সেন এবং ৯ সদস্যর অন্যতম ছিলেন কমরেড বিমল বিশ্বাস। ১৯৯০সালে কমরেড বিমল বিশ্বাস ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯২সালে ৪ঠা মে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (রনো-মেনন) এবং খন্দকার আলী আব্বাসের সাম্যবাদী দল(এম এল) ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টি পূনর্গঠিত হয়। কমরেড বিমল বিশ্বাস ঐ পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ছিলেন সংগঠন বিভাগের দায়িত্বে।
পরবর্তীতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির দীর্ঘ ১০ বছর সাধারণ সম্পাদক এবং ১৮ বছর পলিটব্যুরো সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৮২ সাল থেকে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে কমরেড টিপু বিশ্বাসের সাথে ৭দল গঠনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয় সেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, পরবর্তীতে ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯১৯সালের অক্টোবর পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।২০০০ সাল থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশ শান্তি আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।১৯৯৪সালে বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সাতটি দল মিলে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠন করা হয় এবং সেই ফ্রন্টের সমন্বয়ক হিসেবে পার্টির পক্ষ থেকে তিনি ৭বার দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টি ১৯৯৮ সালে ১১ দল গঠনের উদ্যোগ নেয় এবং সেখানেও পার্টির পক্ষ থেকে তিনি মোট ৯ বার সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। ইস্যুভিত্তিক ১৪ দল গঠনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সর্বজনবিদিত।

বিদেশ ভ্রমন:
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে ১৯৮৩, ১৯৮৭, ১৯৯২, ১৯৯৭, ২০০২, ২০০৭ সালের বিভিন্ন সময়ে চীন ভ্রমণে ঐ দেশের সমাজতন্ত্র বিনির্মাণ ও উন্নয়নের জন্য যেসকল নীতি গ্রহণ করেছে তার বাস্তব প্রয়োগ স্বচক্ষে দেখার ও বোঝার চেষ্টা করেছেন। চীনে যাওয়া-আসার পথে দুবার হংকংয়ে অবস্থান করেছেন।
থাইল্যান্ডের ব্যাংকক সহ বিভিন্ন প্রদেশে ১৪ বার ভ্রমণ করেছেন।নেপাল ইউ এম এল এর কমরেড মনমোহন অধিকারী সভাপতি ও কমরেড মাধব যখন সাধারণ সম্পাদক তখন তাঁদের কৃষক সংগঠনের আমন্ত্রণে কমরেড সাইফুল হক ও কমরেড বিমল বিশ্বাস গিয়েছিলেন। বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী কমরেড আবুল কাশেমের নেতৃত্বে নেপালের শান্তি পরিষদের সম্মেলন গিয়েছিলেন। ফিলিপাইন কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক সংগঠন কে,এম,পি এর সম্মেলনে গিয়েছিলেন। ফিলিপাইন এর রাজধানী ম্যানিলায় একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দিয়েছিলেন।
সিপিআই’র হায়দ্রাবাদ পার্টি কংগ্রেস ও হায়দ্রাবাদে কমরেড রাজেশ্বর রাওয়ের জন্মশতবার্ষিকীতে যোগদান করেছিলেন। সিপিআই’র নেতৃবৃন্দের মধ্যে কমরেড এ বি বর্ধন, কমরেড সুধাকর রেড্ডি, কমরেড ডি রাজা,কমরেড পল্লব সেনগুপ্ত, কমরেড নন্দলাল ভট্টাচার্য সহ আরো অনেকের সাথেই তাঁর সুসম্পর্ক ছিল তোমধ্যে কমরেড পল্লব সেনগুপ্ত ও কমরেড নন্দলাল ভট্টাচার্যর সাথে অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা হত বলে জানি। ৭১’র ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা সৈয়দ হাসান ইমামের নেতৃত্বে ত্রিপুরায় সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সমাবেশে যোগদান এবং সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক কমরেড বৈদ্যনাথ মজুমদার ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী ও সিপিএমের পলিটব্যুরোর অন্যতম সদস্য মানিক সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেন। ত্রিপুরায় ফেব্রুয়ারির বইমেলায় কমরেড অজয় রায়ের সঙ্গে যোগদান করেন।ভারতে সিপিএমের পার্টি কংগ্রেসে হায়দ্রাবাদ ও তামিলনাড়ুর কায়েমবাটুরে যোগদান করেছিলেন।
বিভিন্ন সময়ে কলকাতার সিপিআইএম নেতৃবৃন্দের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক কমরেড হরকিষান সিং শুরজিৎ, কমরেড সিতারাম ইয়েচুরি পলিটব্যুর সদস্য কমরেড জ্যোতি বসু, কমরেড শৈলেন দাস গুপ্ত, কমরেড অনীল বিশ্বাস, কমরেড বিমান বসু, কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, কমরেড কনক মুখার্জী, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বিনয় কোঙার, কমরেড মৃদুল দে।এসকল নেতৃবৃন্দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও সম্পর্ক বেশি ছিল কমরেড শৈলেন দাস গুপ্ত, কমরেড অনীল বিশ্বাস, কমরেড বিনয় কোঙার,ও কমরেড মৃদুল দে’র সাথে।
সমাজতান্ত্রিক উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কমরেড কিম উল সুং সহ উত্তর কোরিয়ার ওয়ার্কাস পার্টির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ১৯৯৪ সালে পিয়ংইয়ংয়ে সাক্ষাৎ এবং উত্তর কোরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করেন। বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সম্মেলনে যখন গিয়েছিলেন তখন নেদারল্যান্ড, হেগ ও লন্ডনে গিয়েছিলেন। জার্মানিতে এমএলপিডির পার্টি কংগ্রেসের আমন্ত্রণে গিয়েছিলেন।কংগ্রেস শেষ করে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা হয়ে দেশে ফেরেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ওয়ার্কাস পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ২০১৬ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর তারিখে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদান করেছিলেন। ওই প্রতিনিধিদলে অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন ঐ সময়কার সরকারের দুজন মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এবং ডাঃ দীপু মনি এছাড়াও শরীফ নুরুল আম্বিয়া, ইসমাইল হোসেন ও সমীর রায় যাদের সাথে ঐসময় কমরেড বিমল বিশ্বাসের ছিল অত্যন্ত সুসম্পর্ক।
বর্তমানে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নন। কিন্তু কমিউনিস্ট আদর্শে এখনও সচেতন থাকার কারনে অতিতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের তত্ত্ব ও তথ্যের ভিত্তিতে “যা দেখেছি যা করেছি” তাঁর আত্মজীবনী প্রথম খন্ড তিন মাস আগেই শেষ করেছেন।এখন দ্বীতিয় খন্ড লেখার প্রচেষ্টায় রয়েছেনআজীবন সংগ্রামী মানুষ কমরেড বিমল বিশ্বাসের জন্মদিনে সংগ্রামী শুভেচ্ছা। আমাদের প্রত্যাশা তিনি আরো অনেকদিন বেঁচে থাকবেন। তাঁর অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শিক্ষণীয় হতে পারে। তাছাড়া ভবিষ্যতে ইতিহাসবিদদের কমরেড বিমল বিশ্বাসের লেখা প্রভুত সাহায্য করবে বলে বিশ্বাস করি।
-লেখক:পলাশ কুণ্ডু, গোবরাঞ্চল, নড়াইল।

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।