কমরেড অজয় রায় আর নেই

যুগবার্তা ডেস্কঃ সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি, সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চের সমন্বয়ক, প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কমরেড অজয় রায় আর নেই।কমরেড অজয় রায় সকলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে আজ ১৭ অক্টোবর সোমবার ভোর ৫টায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যু কালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
তার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, জাসদ, বাসদ, গনফোরাম, গনতন্ত্রী পার্টি, সাম্যবাদী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গভীর মোক প্রকাশ করেছেন।
অজয় রায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ
কমরেড অজয় রায় ১৯২৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ঈম্বরগঞ্জে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রামে। বাবা প্রমথনাথ রায় বারানসী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক ছিলেন। মা কল্যাণী রায়।
অজয় রায় ১৯৩৭ সালে বারানসীতে চতুর্থ শ্রেণিতে স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৪৩ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪৫ সালে বারানসী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করে সেখানেই ফার্মেসি বিভাগে প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে বাবা ও মা মারা যাওয়ার কারণে তিনি বারানসী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার ছেদ ঘটিয়ে কিশোরগঞ্জে ফিরে আসেন। পরে ১৯৪৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে মুন্সীগঞ্জ থেকে বিকম পাস করেন।
কমরেড অজয় রায় স্কুলের ছাত্র থাকাবস্থায়ই ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। বারানসী স্কুলেই তিনি ছাত্র ফেডারেশনের সংস্পর্শে আসেন এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টি ভারতবর্ষে নিষিদ্ধ ছিলো। অজয় রায়ের কাকা ও মামাও সশস্ত্র দল যুগান্তর এর সদস্য ছিলেন এবং প্রায় পাঁচ বছর জেল খাটেন। ১৯৪২ সালে কংগ্রেসের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের এক পর্যায়ে স্কুল ছাত্র ধর্মঘট ডাকা হলে অজয় রায় উদ্যোগী হয়ে তা সংগঠিত করেন। ১৯৪৩ সালে বাংলায় ভয়াবহ মন্বন্তর দেখা দিলে দুর্ভিক্ষ ও মহামারী প্রতিরোধে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কমিউনিস্ট পার্টি। বারানসীতে কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে ত্রাণ সংগ্রহ কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন কমরেড অজয় রায়।
১৯৪৬ সালের নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং ময়মনসিংহের ফুলপুর, ঈশ^রগঞ্জ ও নান্দাইল থানা নিয়ে গঠিত আসনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে অজয় রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনের আগে-পরে কিশোরগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ফেডারেশনের সংগঠন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলা ছাত্র সাব কমিটির সদস্য মনোনীত হন।
১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ ও পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি সশস্ত্র সংগ্রামের সিদ্ধান্ত নিলে সেই স্লোগানের ভিত্তিতে ওই বছরের ডিসেম্বরে ছাত্র সম্মেলন করতে গিয়ে অজয় রায় গ্রেফতার হন। জেলে থাকাকালে রাজবন্দীদের বিশেষ মর্যাদা কেটে দিয়ে সাধারণ হাজতির পর্যায়ে নামিয়ে দেবার প্রতিবাদে অন্য রাজবন্দীদের সাথে তিনি ৭ দিন, ২০ দিন ও ৪০ দিন করে তিনবার অনশন করেন। চতুর্থবার অনশান চলাকালে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। মুক্তি পেয়ে মুন্সীগঞ্জের চাঁপাতলী স্কুলে প্রধান শিক্ষকের কাজে যোগ দেন। ১৯৫০ সালে তিনি মুন্সীগঞ্জের রামপাল হাইস্কুলে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। ঐ বছরের সেপ্টেম্বরে আবার তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৫৪ সালের জানুয়ারিতে মুক্তি দিয়ে তাঁকে ময়মনসিংহ মিউনিসিপ্যাল এলাকায় অন্তরীণ রাখা হয়। সেখানে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সাথে যুক্ত হন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে ময়মনসিংহে কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য অফিস খোলা হলে তার দায়িত্ব নেন। নির্বাচনের আগে তিনি আবারও গ্রেফতার হন এবং যুক্তফ্রন্টের অভূতপূর্ব বিজয়ের পর তিনি ছাড়া পান। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ৯২-ক ধারা জারি হলে তিনি আত্মগোপনে যান। আত্মগোপন অবস্থায়ই কমিউনিস্ট পার্টির ময়মনসিংহ জেলা সম্পাদকম-লীর সদস্য নির্বাচিত হন। হুলিয়া প্রত্যাহার হলে তিনি প্রকাশ্যে এলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে আবার গ্রেফতার হন। বছরখানেক আটক থাকার পর ১৯৫৬ সালে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ-কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠিত হলে তিনি মুক্তি পান। ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলে তিনি ন্যাপে যোগ দেন এবং ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সহ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলে তিনি আবারও আত্মগোপনে যান। কিন্তু ১৯৬০ সালে টাংগাইল থেকে গ্রেফতার হন। মুক্তি পান ১৯৬৫ সালের জুলাই মাসে। ওই বছর পাক-ভারত যুদ্ধ লাগলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা শুরু হলে অজয় রায় দেশরক্ষা আইনে আবারও গ্রেফতার হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি মুক্তি পান। কিন্তু সে বছর ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসন জারি হলে নভেম্বর মাসে অজয় রায় আবারও গ্রেফতার হন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর ২৮ মার্চ ময়মনসিংহে ইপিআর ছাউনি ঘেরাও করে জনগণ ছয়জন পাঞ্জাবি সৈনিককে জেলে ঢুকিয়ে অজয় রায়কে মুক্ত করে আনেন। মুক্তি পেয়েই ঐ অঞ্চলে তিনি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ময়মনসিংহ শহরের মহাখালী স্কুলে, পরে কিশোরগঞ্জকে ভিত্তি করে এবং জুলাই মাসের শেষভাগে প্রথমে আগরতলা ও পরে কলকাতা হয়ে মেঘালয়ের বারেংগাপাড়ায় স্থানীয় ক্যাম্পকে ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কমরেড অজয় রায় ময়মনসিংহে ফিরে আসেন এবং পুনরায় কমিউনিস্ট পার্টির কাজে যুক্ত হন। সে সময় তিনি ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের জেলা সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে তিনি কেন্দ্রীয় সম্পাদকম-লীর সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। কিছুদিন তিনি সাপ্তাহিক একতা পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বেরিয়ে এসে কমরেড অজয় রায় ‘কমিউনিস্ট কেন্দ্র’ গঠন করেন। ১১ দলীয় জোট গঠনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সর্বশেষ তিনি সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি এবং সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
কমরেড অজয় রায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সর্বমোট ১৮ বছর জেল খেটেছেন এবং স্বাধীনতার আগে-পরে ৫ বছরের বেশি সময় আত্মগোপনে কাটিয়েছেন। তিনি ‘বাঙলা ও বাঙালী’, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির অতীত ও বর্তমান’, ‘বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থার সংকট ও সমাধান’, ‘বাংলার কৃষক বিদ্রোহ’, ‘শিক্ষানবিশীর হাতে খড়ি’, ‘রাজনীতির অ আ ক খ’, ‘পুঁজিবাদী অর্থনীতি’, ‘গণআন্দোলনের এক দশক’, ‘আমাদের জাতীয় বিকাশের ধারা’, ‘বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলন’সহ অনেকগুলো গ্রন্থ’ রচনা করেছেন। তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখেছেন।
৮৮ বছর বয়সী কমরেড অজয় রায় মৃত্যুকালে তাঁর স্ত্রী জয়ন্তী রায়, দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, গুণগ্রাহী এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের রেখে গেছেন। তাঁর বড় মেয়ে সুইজারল্যান্ডে এবং ছেলে ও ছোট মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।