কবি রাজলক্ষ্মী মৌসুমী ও তাঁর তিনটি কবিতা

জাকির হোসেন আজাদী: একজন অনন্য অসাধারণ বাস্তববাদী কবি, নাট‍্য নির্মাতা ও শিক্ষক রাজলক্ষ্মী মৌসুমী। তাঁর প্রকৃত নাম কস্তুরী দত্ত মজুমদার। পেশায় সাবেক প্রধান শিক্ষক সরকারী বিজ্ঞান কলেজ সংযুক্ত হাইস্কুল তেজগাঁও, ঢাকা।

তিনি দীর্ঘদিন যাবত সরকারি বিজ্ঞান হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। সেই সময়ে অতিব যত্নে মায়ের মমতা দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতেন। যার কারণে অবসর গ্রহণের পরেও তিনি স্কুলটিতে আজও অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। শিক্ষার্থীদের মাঝে এখনো তাঁর স্মৃতিচারণ করতে দেখা যায়। শিক্ষার্থী অভিভাবক সহকর্মী ও অত্র এলাকাবাসী তাঁর শুণ‍্যতা আজও অনুভব করেন।

কবি রাজলক্ষ্মী মৌসুমীর পিতা অধীর রঞ্জন দত্ত মজুমদার। মাতা শেফালী দত্ত মজুমদার। জন্ম ২৫ ডিসেম্বর, মাতুলালয়, বাঘাযতীন, যাদবপুর, কলকাতা। পৈত্রিক নিবাস। রায়পুর, বারহাট্টা, নেত্রকোনা। সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে সংস্কৃতিচর্চার আবহে নেত্রকোনা শহরের উকিলপাড়ায় তাঁর ছেলেবেলা ও শিক্ষাজীবন অতিবাহিত হয়। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। স্বামী উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব ও
বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য।
একমাত্র কন‍্যা মডেল অভিনেত্রী শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নী।দুই ছেলে রাহুল দত্ত ও অর্নব দত্ত সবাই বতর্মানে কানাডা প্রবাসী।

তিনি পশ্চিম বঙ্গের সৃজনভূমি কর্তৃক আয়োজিত
‘সৃজন সাহিত্য সম্মাননা ২০২০’ এ ভূষিত হয়েছিলেন।

তিনি অনেক গুলো নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখক ও নাট‍্য নির্মাতা। তাছাড়া তিনি অসাধারণ কবিতাও লিখে থাকেন। দুই বাংলার বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর কবিতা গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়। “ভালোবাসার অর্ঘ‍্য ” ও ” দুই বাংলার সেতুকাব‍্য” শিরোনামে দুটি কাব‍্য গ্রন্থও বের হয়েছে তাঁর। আজ এখানে তাঁর তিনটি কবিতা তুলে ধরা হলো-

কবি রাজলক্ষ্মী মৌসুমীর তিনটি কবিতা –

১. মন বলে যাবো যাবো

আমি আসছি,
মেঘবালিকা আমি সহসাই যাবো তোমার কাছে।
মেঘবালিকা আমায় বলেছিলো সময় যখন দুয়ারে কড়া নাড়বে?
আমি ঠিক তখন আমার পাখায় ভর করে তোমায় নিয়ে আসবো আমার মেঘের উড়াল ভেলায়।
জানি আমি খুব সহসাই আমি যাবো চলে।
ছোট ছোট মেঘগুলো যখন আমায় স্বপ্ন দেখায় আমি খুব কষ্ট পাই।
কতবার ফাঁকি দিয়ে মেঘমালা মাথার উপর দিয়ে উড়ে উড়ে
মিলিয়ে গেলো।।
মেঘবালিকা, আমি কেবলি তোমার আশায় বুকের মাঝে স্বপ্ন বাঁধি।
বনানীর সবুজ ছায়ায় নিজেকে বিসর্জন দিয়েছি সেই কবে?
প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হয় না তো?
তুমি আসবে বলে প্রজাপতিকে বলেছি—–
তুমিও কি যাবে আমার সাথে? কিন্তু না মেঘের ভেলায় যাবে না সে কিছুতেই। উড়াল ডানা নাড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে যাবে মেঘরাশিতে।
প্রজাপতি আমায় প্রতিদিন গোধূলিতে ভালোবাসার পরাগ মাখায় আমার সারা গায়। বর্ষার বারি ধারায় সঞ্চিত আহার থেকে এক ফোঁটা মধু আমার মুখে তুলে দেয় প্রতি ভোরে।
আমি যখন যাবেো মেঘমালায় আর খোঁজনা কিন্তু বন্ধু আমার।
সহসাই যাবো আমি মেঘরাশির ভীড়ে।।

২. নীড়ে ফিরে যাওয়া

খুঁজতে খুঁজতে আমি ক্লান্ত।
মন থেকে গচ্ছিত রত্নখনি খসে গেলো আচমকা।
মনের কোণে ভীতির বাসা বাঁধে।
প্রতিদিনের চেনা পথ অচেনা কেনো মনে হলো জানিনা।
আমি উড়ন্ত পাখী।
অবসাদের আড়ষ্টতায় ডানা মেলে উড়তেই পারছি না।
আমি চেয়ে চেয়ে শুধু দেখলাম
সঙ্গীরা সব গোধূলির আকাশে।।
চারদিকে অন্ধকার, আমি কি করি ভেবে আকুল।
গাছের ঝোপের ফাঁকে হঠাৎ তোমাকে আবিষ্কার কোরলাম।
আমি আনন্দে আত্মহারা তোমায় পেয়ে।
ভয়, ডর কেটে গেলো দুঃখকে ঝেড়ে ফেললাম।
তুমি আমায় সাহস জোগালে। বুকটা ভরে উঠলো।
একসময় দু’জনেই ঘুমে অচেতন।
তারপর রাতের শেষে ভোরের আগমন।
প্রতিদিন আমি সূর্য উঠার আগেই ভোরের গান গাই।
আমার সুরেলা কন্ঠে কিচিরমিচির ডাকে সবার ঘুম ভাঙ্গে। কিন্তু আজ আমি ক্লান্ত অসার।
সারারাত কত যত্ন করে আমার ডানায় তুমি শক্তির প্রাণ জাগালে। একটু একটু করে বোধ হলো আমি সুস্থ।
উড়াল পাখীরা আকাশে বিচরণ করে কতনা সুখানন্দে ডানা মেলে উড়ে উড়ে ঘুরে যেথায় সেথায়।
ওরা আমায় দেখেও দেখলো না। কি হলো তাতে?
আমার তুমি আছো।
আমি ও তুমি এক সাথে উড়তে উড়তে আমাদের নীড়ে পৌঁছে যাবো।
আবার ঘুমিয়ে গেলাম তার কোলে।
চোখের কোণে স্বপ্ন এলো, আমার
হারিয়ে যাওয়া রত্নটা খুঁজে পেলাম। আমি যেনো লাফ দিয়ে উঠলাম।
এবার আমি অন্ধকার থেকে আলোয় আসলাম।।
ডানা মেলে আকাশের বুকে উড়ে গেলাম দু’জনে।
একেবারে শান্তির নীড়ে।।

“শেকড় “
নিজের ভিটেমাটির গন্ধটাই যেনো একটু অন্যরকম।
শেকড়ের টানে ছায়াপথে ঘুরতে ঘুরতে শেষ নিবেদন টুকু রাখতে নিজ মাটির বুকে ঠাঁই নিতে চায় প্রতিটি মানুষ।
অভিমানী মানুষ কত লাঞ্ছনা গঞ্জনা, নির্মম অত্যাচারে প্রিয় ভিটে মাটির মায়া ছেড়ে যেতে হয় একসময় মনের বিরুদ্ধে।
কোন সময় ভয়ে, কোন সময় অসহায়ত্বতার কারণে মানুষ অপারগতার স্বীকার হয়, তারপরেই নরপশুরা গ্রাস করে নেয় সব কিছু।
সুদূর প্রসারী ভাবনা গুলো যখন আবার মাথায় নাড়া দেয়, তখনি আশার জাল বুনে মানুষ। বার বার
মাটির টানে মনটা আনচান করে।
ছেলে বেলার সুখের স্মৃতিগুলোর পাতায় মাকে বাবাকে মনে পড়ে খুব। ক্লান্তি যখন শরীরে ভর করতো বাবা কি মধুর কন্ঠে বলতেন আয়না মামনি আমার মাথায় তোর নরম হাত বুলিয়ে দে , তোর হাতের স্পর্শ পেলেই আমার ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে।
বাড়ী ঘর সব ঠিকঠাক আছে, নেই শুধু আমার প্রিয় মানুষগুলো।
আমি কেবলি একা। বাড়ীর শেকড়ের সাক্ষী আমি। কেনো আমার এই পিছুটান?
আমার তো সব আছে।
বর্তমান আমায় দিয়েছে অনেক।
তবে কেনো অতীত আমায় ঈশারায় ডাকে?
অতীতও আমায় দিয়েছে অনেক, যেখানে ছিলো প্রগাঢ় ভালোবাসা, অকৃত্রিম স্নেহ বুকভরা ছিল শান্তি।
আর কি পাবো কখনও তেমন স্নেহ ভালোবাসা?
এসেছি তাই ভিটে মাটিতে কত লুটোপুটি করেছি।
সেই স্মৃতির নিংড়ানো স্নেহ ভালোবাসা কুড়িয়ে নিতে এসেছি শেকড়ের কাছে।
মাটির গন্ধটা যেনো সেই আগের মতো।
লতানো মাধবীলতা গাছটি আর নেই। গাছের গুড়িটা ঠায় মাটিতে ঘুপটি মেরে বসে আছে। আমাকে দেখেই গাছের মাটি কিছুটা আমার পায়ে পড়লো।
মনে হলো জড়িয়ে ধরলো আমি অনুভব কোরলাম।
বকুল ফুল এখনও ফোটে। আমাকে দেখেই ঝরো ঝরো বকুল ফুল মাথায় পরতে লাগলো।
আমার মনে হলো আমায় বরণ করে নিলো আমার প্রিয় বকুল ফুল।
হাতে কিছু মাটি নিয়ে আদর করে বললাম সবাইকে ছেড়ে তোমরা কেমন আছো? পাশে দেখি হঠাৎ ভিটের মাটি ভেঙ্গে পড়লো।
বুঝলাম ওরাও ভালো নেই আমারই মতো।
ওরা বোবা ভাষায় বললো এ ভিটেতে এখন শকুন ডাকে, ঘুঘু চড়ে।
আহারে আমার প্রিয় আদরের বাড়ী ঘর।
বাতাসে বটগাছের শন শন আওয়াজটাও যেনো ক্রন্দন ধ্বনিটুকু আমার কানে পোঁছলো।