কবর পাড়ে দুহাত ধরে আকুল মোনাজাত! মাকে আমার রেখো খোদা ফেরদৌসে জান্নাত!!

144

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আমি কখনোই গান পাগল মানুষ ছিলাম না। আবার গান আমার পছন্দ নয়, সেটাও না। গান আমার পছন্দ এবং পছন্দের গানের সংখ্যাও মোটামুটি কম নয়। সুর ভাল হলে গান মনে লেগে যায়। মনের মধ্যে ঘোরপাক খায়। শুনলে শুনতেই ইচ্ছে করে। কিন্তু তাই বলে নিজ থেকে গান বাজিয়ে শোনা হয় না। আলসে মানুষদের এই এক সমস্যা। নিজ থেকে কিছু করি না; করার চেষ্টাও করিনা। কেউ দয়া করে বাজালে কান পেতে শুনি। মন লাগিয়ে শুনি।
মন লাগিয়ে শোনা গানের মাঝে মাকে নিয়ে প্রায় সব গানই আমার প্রিয়। অসম্ভব প্রিয়। গানগুলো জনপ্রিয়তায় যেমনি তুংগে, গুণগত মানেও অতি উচ্চ আসনে অবস্থিত। যারা লিখেছেন বা সুর দিয়েছেন, মনের মাধুরী মিশিয়ে খুব দরদ দিয়েই করেছেন। তাই যখনই যেটা শুনি, প্রান জুড়িয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে মন দিয়ে শুনলে মাকে অনুভব করা যায়। গভীরভাবে হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়। সব কিছু ছাপিয়ে মা এসে মনের আঙিনায় নোঙর ফেলে।
এমনই নোঙর ফেলা মধুর একটি গান; অনেক অনেক ভাল গানের মাঝে সেরা গান। “মধুর আমার মায়ের হাসি, চাঁদের মুখে ঝরে; মাকে মনে পড়ে আমার, মাকে মনে পড়ে!” পরের লাইনগুলো আরো হৃদয়স্পর্শী। “সে যে জড়িয়ে আছে, ছড়িয়ে আছে সন্ধ্যা রাতের তাঁরায়! সেই যে আমার মা! বিশ^ ভুবন মাঝে তাহার নেইকো তুলনা!” গানের প্রতিটি কথায় হৃদয় এবং মন দুটোই ছুঁয়ে যায়। কেবল ছুঁয়ে যাওয়া নয়, চোখের কোনায় জল চিকচিক করে ওঠে। আমার ধারনা, কেবল আমার নয়; সব মা হারাদেরই করে।
আমার মা নিজেও মা হারা হয়েছেন। আমি তখন ক্লাশ ফোরের ছাত্র। অবস্থা খুবই ভয়াবহ। মা নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিলেন। অন্তত সপ্তাহ খানেক কেউ তাঁর মুখে জোর করেও কিছু দিতে পারেনি। খানিকক্ষণ থেমে থেমে কেবল গগনবিদারী চিৎকার করে কান্না আর কান্না। কান্না বেশী করতেন রাতের গভীরে। কিছুক্ষণ চিৎকার করে আবার কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে কান্না। কেউই থামাতে পারছে না। বলা যায় এক রকমের পাগল হয়ে গেলেন। প্রলাপ বকা শুরু করলেন। গর্ভধারীনি মাকে চিরতরে হারাবার বিষয়টি তিনিকিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না।
কিন্তু এই তিনিই যে একদিন হারিয়ে যাবেন, আমাকে মা হারা করবেন; তা বুঝতে পারিনি তখন। মা হারা হবার বিষয়টি বোঝার বয়সও হয়নি আমার। একদিন বয়স হলো, জাগতিক নিয়মে আমিও মা হারা হলাম! কিন্তু মায়ের জন্যে মায়ের মত করে পাগলামো করতে পারলাম না। এসবে যোগ্যতা লাগে। তবে পাগলামোর যোগ্যতা না থাকলেও বোঝার যোগ্যতা ছিল; আমি বুঝেছিলাম, আমার সব শেষ। আমাকে নির্ভেজালভাবে বিনাস্বার্থে ভালবাসার মানুষ বলতে আর কেউ রইলনা। যিনি ছিলেন তিনি অনন্ত অসীমের পানে চলে গেছেন। খুব একা হয়ে গেলাম। সব কিছু থেকেও যেন নেই। সবার মাঝে থেকেও খুব একা। চির জীবনের তরে একা হয় গেলাম!
কৈশোরেও বছর তিনেক মাকে ছাড়া একা ছিলাম। অনিবার্য কারনেই থাকতে হয়েছিল। অষ্টম শ্রেনীর মাঝামাঝিতে পড়াকালীন আব্বার সাথে গাজীপুর থেকে রওনা দিয়েছি। আব্বা আমায় রেখে আসবেন ত্রিশালের ধলায়; ওখানের স্কুলে। খুব ভোরের ট্রেন। আমাকে বিদায় দিতে মা’ও বেরিয়েছেন। আব্বা যতই বলছেন মাকে আর না এগুতে, মা ততই এগুচ্ছেন। বেসামালভাবে হাঁটছেন, আঁচলে চোখ মুছছেন। আর বারবার জড়িয়ে ধরছেন আমায়। সদর রাস্তায় এসে পড়াতে আর এগুলেন না; চোখেমুখে এত্ত এত্ত চুমু দিয়ে পকেটে হাত গুজে দশ টাকার ভাঁজ করা একটি নোট গুজে দিলেন আমায়। সেই আমলের দশ টাকা! নিশ্চিত বাজারের টাকা থেকে কষ্ট করে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এবার আমি কাঁদছি, মা’ও কাঁদছেন। যতদূর পেছনে চোখ যায়, বারে বারে ফিরছি আর মাকে দেখেছি। গর্ভধারিণী মা আমার দাঁড়িয়ে ছিলেন! জানিনা কতক্ষণ ছিলেন!!
তখনকার দিনে ডাকঘর ছিল চিঠি আদান প্রদানের একমাত্র সম্বল। মাকে চিঠি লিখতাম নিয়মিত। মা’ও লিখতেন। লেখার ধরনই ছিল মনকাড়া। মায়ের উত্তর পেতে মাস পেরিয়ে যেত। আমি মাসভর আশায় আশায় অপেক্ষায় থাকতাম। ডাক পিয়নের সামনে পড়লেই গায়ে কাঁটা দিত। এইবুঝি মায়ের চিঠি পাবো! সেই ব্রিটিশ আমলে ক্লাশ সেভেন পড়ুয়া মা আমার কাটা কাটা অক্ষরে লিখতেন, “আমার লক্ষী সোনা কুটটি বাবা আমার! তুমি চলিয়া যাইবার দিন হইতে আমার আর কিছুই ভাল লাগে না। কোন কিছুই খাইতে পারিনা। আমার কোলের মানিক পক্ষী! তুমি নাই, সারা রাত আমার কোল খালি থাকে; ঘুম আসে না। আমার কলিজায় কিছু নাই। আমি আর সহ্য করিতে পারিনা। রোজ বিকালের ট্রেনটা যাইবার সময় আমি পথের দিকে তাকাইয়া থাকি। তুমি আসবা এই ভাবিয়াই তাকাইয়া থাকি। তোমার কথা মনে আসিলেই চোখ ঝাপসা হইয়া উঠে। কেন উঠে জানি না! আমার জান, আমার মানিক! তুমি কবে আসিবা?”
পড়াশুনায় ক্ষতি হবে বলে মায়ের কাছে স্কুল ছুটিতে খুব একটা আসতাম না। কেবল দুই ঈদে আসতেই হতো। বছরভর মা আমার পথ পানে চেয়ে থাকতেন। আমি আসতাম ঈদের আগে আগে। ঈদের সাত দিন আগ থেকেই মা কিছু না কিছু আমার জন্যে রান্না করে রাখতেন। কিন্তু নিজে একটুও মুখে নিতেন না। সব রেখে দিতেন; কাউকে দিতেন না। আমি এলে সব বের করতেন। উঠতে বসতে আমার মুখে নিজ হাতে পুরে দিতেন! আজকাল মাঝে মধ্যে আমার শোনিমের মুখে খাবার তুলে দেবার সময় মায়ের কথা খুব মনে হয়। সব বাবামায়েরাই সন্তানের মুখে এভাবে খাবার পুরে দেন। কিন্তু সব সন্তানেরা দেয় না; দিতে পারে না!
আমিও দিতে পারিনি। ডাক্তার বারণ করাতেই দিতে পারিনি। মাকে আমি মিষ্টি খেতে দিতাম না; আম খেতে বারন করতাম। কী করবো! খেলেই প্রেসার বেড়ে যায়। যা কিছু ডাক্তার মানা করতো, মা সেসবই বেশী খেতে চাইতেন। পাগলের মত খেতে চাইতেন। লুকিয়ে রেখেও সামাল দেয়া যেত না। গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে মা একা একা বের করে খেতেন। শেষমেষ বাসায় এসব নিষিদ্ধ করলাম। তারপরেও বাঁচাতে পারলাম না মাকে। একদিন দুপুরে খাবার টেবিলে হঠাৎ করে ব্রেইনস্ট্রোক হয়ে মা নিথর হয়ে পড়েন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। তারপর ৩২ মাস চেষ্টা করেছি, কিন্তু তাঁকে ধরে রাখতে পারিনি। বাঁচাতে পারিনি তাঁকে। অবশেষে ১৯শে জুলাই, ২০১১ তে সবাইকে ছেড়ে দূরে, বহুদূরে চলে যান মা আমার!
আমাদের গ্রামের বাড়ীতে ঢুকতেই বহু পুরানো মসজিদ। এর ঠিক পশ্চিম পাশেই ছোট্ট একটি পুকুর। তারপরই পারিবারিক কবরস্থান। কবরস্থানের গেটের শুরুতেই দাদা-দাদুর পায়ের কাছে মা-বাবার পাশাপাশি কবর। মসজিদে মাগরিবের জামাত শেষে আবছা অন্ধকারে কবর ধারে দাঁড়িয়েছি কেবল। সালাম দিতেই মনে হলো তাঁরা দুজনায় আমাকে দেখে নড়েচড়ে বসেছেন। যেন খুশীতে দুজন-দুজনার মুখের দিকে চাওয়া চাওয়ি করছেন। তাঁদের ঠোঁটের কোনায় অবিকল সেই হাসি! চাঁদের চেয়েও সুন্দর হাসি!!
আমি দোয়া পড়ছি। যতটুকু পারি, সব পড়ছি। চোখ ভিঁজে উপচে পড়ছে জল। সব বার এমনটা হয়না। এবার অনেক বেশী আবেগী আমি। ঢুকরে কাঁদছি। আর বার বার “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি ছগিরা” বলে পানাহ চাইছি। মন আমার বড় অশান্ত। কবরের প্রাচীর আর মাটি আলতো করে একটু ধরলেই এ মন অশান্ত হয়! বড়ই শিশুর মত মন। এ মন বাবা-মাকে ছুঁতে চায়, ধরতে চায়! একটু ছুঁতে, একটু ধরতে না পারলে মন যে ঠান্ডা হয় না!!
এক সময় ফিরে আসা! বারবার পেছন ফেরে ফেরে ফিরে আসা। দু’কদম এগিয়ে দাঁড়িয়ে পরা; আবার সামনে হাঁটা। মনে হচ্ছিল তাঁরা দু’জনা মন খুব খারাপ করে বসে বসে আমার ফিরে যাওয়া দেখছেন। কবর থেকে মাথা বের করে দেখছেন! অথচ কী পাষাণ আমি! তাঁদেরকে ফেলে অবলীলায় চলে যাচ্ছি। কিন্তু তাঁরা কি পারতেন? যদি বেঁচে থাকতেন, আমাকে এভাবে একলা কবরে ফেলে বাড়ী ফিরতে পারতেন? মনে হয় পারতেন না! পৃথিবীতে কোন বাবা-মা’ই পারেন না! সন্তানের মৃত্যু শোক কোন বাবা-মা’ই সইতে পারেন না!!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা