ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যালয়ে ভাংচুরে দুদকের মামলায়ও ফেঁসে যাচ্ছেন বাবুগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান স্বপন ॥ দুদকে তলব

64

►বরিশাল প্রতিনিধি ঃ
ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যালয়ে সশস্ত্র হামলা ও ভাংচুর মামলায় অভিযুক্ত (চার্জশিট) হওয়ার পর এবার দুর্নীতির অভিযোগেও ফেঁসে যাচ্ছেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আলোচিত উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সরদার খালেদ হোসেন স্বপন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আড়াই কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তাকে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের বরিশাল কার্যালয়ে তাকে ১৪টি অভিযোগের স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ স্বশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করতে বলা হয়েছে। তবে গত রোববার তিনি অতি গোপনে দুদকে হাজির হলেও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মো. নাজিম উদ্দিন আরেকটি মামলার কাজে চট্টগ্রামে অবস্থান করায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। দুদকের সহকারী পরিচালক মো. নাজিম উদ্দিন ৪ সেপ্টেম্বর বরিশালে আসার পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পরবর্তী তারিখ ধার্য্য হবে বলে অফিস সূত্রে জানা গেছে। এদিকে উপজেলা চেয়ারম্যান সরদার খালেদ হোসেন স্বপনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, দুদকের চিঠি পাওয়ার পর তিনি বেশ টেনশনে আছেন। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া তিনি কোন সভা-সমাবেশেও যোগদান করছেন না। দুর্নীতি মামলায় ফেঁসে যেতে পারেন এ আশংকায় তিনি সবকিছু থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে রেখেছেন।

নির্ভরযোগ্য ওই সূত্রটি আরো জানায়, এডিপির বিশেষ বরাদ্দের আড়াই কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহনের ক্ষেত্রে কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেননি উপজেলা চেয়ারম্যান সরদার খালেদ হোসেন স্বপন। ৩০ জুনের মধ্যে ২৯টি প্যাকেজের আওতায় প্রায় ১৯৭টি প্রকল্পের কোন কাজ না হলেও সরকারি বিধি অনুযায়ী তিনি মন্ত্রনালয়ে ওই অসমাপ্ত কাজের বরাদ্দের টাকা ফেরত পাঠাননি। উপরন্তু তিনি কাজ শতভাগ সম্পন্ন দেখিয়ে সমুদয় বিল উত্তোলন করে নিজ একাউন্টে রেখেছেন। প্রকল্প গ্রহনের ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। মন্ত্রনালয়ে তদবির করে ওই বিশেষ বরাদ্দের আড়াই কোটি টাকা আনার জন্য ঘুষ বাবদ তিনি ২০ পার্সেন্ট টাকা খরচ দেখিয়েছেন। তার দাবি অনুসারে ওই আড়াই কোটি টাকার বরাদ্দ ছাড় করতে তিনি অর্ধকোটি টাকা (২০ পার্সেন্ট) মন্ত্রনালয়ে আগাম ঘুষ দিয়েছেন। সেই হিসেবে তিনি প্রকল্পের গ্রহনের তালিকা চূড়ান্ত করার আগেই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের উপকারভোগীদের কাছ থেকে ২০ পার্সেন্ট টাকা আদায় করেছেন। কেবল যারা তাকে ওই কথিত খরচের ২০ পার্সেন্ট টাকা অগ্রিম দিয়েছেন তাদের প্রকল্পগুলোই তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আড়াই কোটি টাকা বরাদ্দ আসার পরে প্রথমে সিপিসির মাধ্যমে ৩০ পার্সেন্ট টাকার প্রকল্প এবং বাকি ৭০ পার্সেন্ট টাকার প্রকল্প টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহন করেন তিনি। সিপিসির (প্রকল্প কমিটি) মাধ্যমে গৃহীত প্রকল্পগুলো অধিকাংশই ভুয়া। এরমধ্যে বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীর বাড়িতে গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্প যার অধিকাংশের কাজই আগেই অন্য প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছে। পূর্ববর্তী এডিপি, হাইসাওয়া, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে আগেই স্থাপন করা এসব গভীর নলকূপগুলোকে পুনরায় সিপিসির মাধ্যমে বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে।

একইভাবে টেন্ডারের মাধ্যমে গৃহীত ৭০ পার্সেন্ট কাজের ক্ষেত্রেও সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের এলজিএসপি প্রকল্প এবং বিগত বছরগুলোতে সিপিসির মাধ্যমে সম্পাদন করা গভীর নলকূপ ও নির্মিত রাস্তাগুলো পুনরায় ওই টেন্ডারে অর্ন্তভুক্ত করা হয়। এছাড়াও এডিপির টাকা বন্টন নীতিমালায় ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশন, যোগাযোগ ইত্যাদি আলাদা আলাদা খাতে বিভাজনের সুস্পষ্ট বিধান থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। স্ব-স্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের প্রেরিত তালিকা অনুসারে প্রকল্প গ্রহনের বিধান থাকলেও উপজেলা চেয়ারম্যান তার একক ক্ষমতা বলে পরিষদের সভায় কোন রেজুলেশন ছাড়াই ওইসব প্রকল্প গ্রহন করে টেন্ডার আহবান করেন ও নাম সর্বস্ব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় দেহেরগতি ইউপি চেয়ারম্যান মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে ইউপি চেয়ারম্যানরা বিদ্রোহ করেন ও পরবর্তীতে একটি মামলা দায়ের করলে টেন্ডার প্রক্রিয়া স্থগিত হয়। পরে ইউপি চেয়ারম্যানদের সাথে একটি সমঝোতা বৈঠক বসলেও সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন না করে সামান্য কিছু অংশ রদবদল করেই পুনরায় উপজেলা চেয়ারম্যান টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করেন বলে অভিযোগ করেন দেহেরগতি ইউপি চেয়ারম্যান মো. মশিউর রহমান।

তিনি আরো জানান, সমঝোতা বৈঠকের নামে আইওয়াশ ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান তার লুটপাটের বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি পরবর্তীতে আলোর মুখ না দেখা একটি কথিত জাতীয় পত্রিকা ও ডিএফপি’র অনুমোদনবিহীন একটি স্থানীয় আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকায় টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। ফলে প্রকৃত ঠিকাদাররা ওই চাপা টেন্ডারের খবরই জানতে পারেননি। এছাড়াও কারসাজির ওই টেন্ডার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার পর তিনি প্রায় ১৯৭টি প্রকল্পের বিপরীতে ২৯ গ্রুপের কাজগুলো নিজের পছন্দের দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে ভাগ-বাটোয়ারা করে দেন। পরবর্তীতে ৩০ জুনের মধ্যে ওইসব প্রকল্পের কাজগুলোর শতকরা ৫ ভাগ কাজ সম্পন্ন না হলেও তিনি সমুদয় কাজ সম্পাদন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করে নিজ একাউন্টে জমা রাখেন। প্রতিটি বিলের এমবিতে (পরিমাপ বই) প্রত্যেক পাতায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক হলেও এক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। ৩০ জুনের পরে বিগত অর্থবছরের অসমাপ্ত কাজের টাকা মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানোর সরকারি বিধান থাকলেও সেটাও মানা হয়নি। বরং কাগজে-কলমে প্রকল্পগুলোর সমুদয় কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের আংশিক সত্যতা স্বীকার করে বাবুগঞ্জের ইউএনও মো. আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, আমি জুলাইতে চার্জ নিয়েছি। তাই সকল বিষয়ে অবগত নই। তবে টাকা যাতে ফেরত পাঠাতে না হয় সেজন্য আলাদা একাউন্টে জমা রাখা হয়েছে। ঠিকাদাররা কাজ সম্পন্ন করার পর ওই একাউন্ট থেকে বিল পরিশোধ করা হবে। এ ব্যাপারে অভিযুক্ত উপজেলা চেয়ারম্যান সরদার খালেদ হোসেন স্বপন জানান, কোন দুর্নীতি হয়নি, তবে মামলার কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে। সময়ের অভাবে ঠিকাদাররা ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেননি। তাই তাদের টাকা ধরে রাখার জন্য কিছু উনিশ-বিশ করতে হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে ওই আড়াই কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ আনতে ঘুষ দিতে হয়েছে বলে স্বীকার করলেও প্রতিটি প্রকল্প থেকে ২০ পার্সেন্ট টাকা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশনে জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে অভিযুক্ত উপজেলা চেয়ারম্যান সরদার খালেদ হোসেন স্বপন বলেন, দুদকের চিঠি পাওয়ার পরে তাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এডিপির আড়াই কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতি ছাড়াও ওয়ার্কার্স পার্টির আগরপুর ইউনিয়ন কার্যালয়ে সশস্ত্র হামলা ও ভাংচুরসহ নেতাকর্মীদের পিটিয়ে জখম করার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় তাকে প্রধান অভিযুক্ত করে গত ২ আগষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে বাবুগঞ্জ থানা পুলিশ