ওসমান পরিবারের ওসমানী খেলাফত!!

599

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
মদিনার মসজিদুল নববীতে ফজরের জামাত শেষে রসুল (সাঃ) এর পবিত্র রওজা মোবারক জিয়ারত করে আমার শোনিমকে নিয়ে জান্নাতুল বাকীতে ঢুকেছি। মসজিদের পাশ ঘেঁষে থাকা কবরস্থান জান্নাতুল বাকী। ভোরের আলো তখনও ফোঁটেনি ভাল করে। প্রতিদিন ৩-৪ টি নতুন কবর এখানে হয়। নতুন কবর যেমনি হচ্ছে প্রতিনিয়ত, তেমনি নবী (সাঃ) যুগের কবরও সংরক্ষিত আছে অনেক। মা ফাতেমা (রাঃ) কবর আছে; আছে হযরত ওসমান (রাঃ) কবর। ঘুরে ঘুরে ইসলামের ইতিহাস বিজড়িত এসব মহান মানুষদের কবর জিয়ারত করছিলাম। সময়টা ২০১১ সাল।
তবে থমকে দাঁড়িয়েছিলাম ওসমান (রাঃ) কবরের সামনে। প্রস্তরখন্ডের লেখা বড়ই হৃদয় বিদারক। বিভিন্ন্ স্থানে ছড়িয়ে থাকা আল্লাহ পাকের পবিত্র বানী যা জীব্রাইল (আঃ) এর মাধ্যমে মোহাম্মদ (সাঃ) এর কাছে ওহী হিসেবে এসেছিল, তা একসাথে কোরআন নামক আসমানী কিতাব আকারে লিপিবদ্ধ করার অপরাধে নামাজরত অবস্থায় খুন হন ইসলামের তৃতীয় খলিফা। তিনি খুন হন তখনকার ভিন্নমতাবলম্বী বিশিষ্ট এক সাহাবার হাতেই। তবে জীবন দিয়ে হলেও ওসমান (রাঃ) কোরআনকে আমাদের জন্য সহজ করে দিয়ে গেছেন। সেই কারনে ওসমান নামটি সামনে আসলেই মনটা কেমন যেন করে ওঠে আমার। শ্রদ্ধায় মাথা ন্যুইয়ে আসে। ওসমান নামের মধ্যে আসমান পরিমান সম্মান কাজ করে।
বাংলাদেশেও সম্মান করে মুসলিম পরিবারের নবজাতকের নাম ওসমান রাখা হয়। দেশের রাজনীতিতেও এককালে এই নামটি বেশ সুপরিচিত ছিল; শ্রদ্ধার ছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে নারায়নগঞ্জের ওসমান সাহেবের ঐতিহাসিক অবদান স্বয়ং বঙ্গবন্ধু মনে রেখেছেন, তার কন্যাও ভুলে যাননি। যখনই এই পরিবারের কেউ বিপদগ্রস্থ হয়েছে, তখনি তিনি ¯েœহের পরশে পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ নিয়ে পাবলিকের কড়া সমালোচনা সহ্য করেছেন। কিন্তু ¯েœহ থেকে ওসমান পরিবারের কাউকে বঞ্চিত করেননি কখনো।
দুঃখজনক হলো, গেল পঁচিশ বছর ধরে সেই ওসমান পরিবারের কথা উঠলেই দেশের মানুষ কেমন করে যেন তাকায়; পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। এদের কেউ আওয়ামী সমর্থক হলে মুখে কুলুপ এটে চুপ করে থাকে। মনে মনে আশা করে যেন প্রসঙ্গটি তাড়াতাড়ি চাপা পড়ে। আর বিরোধী বলয়ের হলে তো কথাই নেই। ভাবে, বিষয় একখান পেয়েছি। মনের ঝাল এক চোট ঝেড়ে দেয় ওসমান পরিবারের উপর। বাদ যায় না শেখ হাসিনা নিজেও।
এতদিন এসবের জন্যে এই পরিবারে ছোটজনার ভূমিকাই আলোচিত ছিল। এবার যোগ হয়েছে ২য় জনার নাম। ক’সপ্তাহ ধরে টক অব দ্যা কান্ট্রি সেলিম ওসমান। এই পরিবারটি বছরে ৩-৪ বার টক অব দি কান্ট্রি হলেও আমি এড়িয়ে যেতাম। আজকে এড়াতে পারলাম না সেলিম ওসমানের বিশেষ একটি দাবীর কারনে। তিনি নিজেকে আল্লাহর ওলী বলে পরোক্ষভাবে দাবী করেছেন। ব্যক্তিগত সাক্ষাতকারে তার নেতা এরশাদ সাহেব তাকে বলেছেন, সেলিম, তুমি তো ওলী হয়ে গেছো। খুব গর্বের সাথে বলছিলেন কথাটি। মনে হচ্ছে এরশাদের সার্টিফিকেটে ওসমান পরিবার এবার পুরো নারায়ন গঞ্জে ওসমানী খেলাফত প্রতিষ্ঠায় নামবে।
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার দাবীদার এরশাদ সাহেব পেপার পত্রিকা পড়েন। তবে তিনি সেলিম ওসমানের এই দাবীর প্রতিবাদ করেননি। হারাম দু’চারখানা বিষয়ের ভক্ষক হিসেবে তিনি আলোচিত হলেও বক্তৃতা এবং বিবৃতিতে তিনি ইসলামের রক্ষক। আজকাল ফতোয়া দেয়াও শুরু করেছেন। যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন যাকে তাকে তার মন্ত্রী বানাতেন। এখন ক্ষমতায় নেই; কিন্তু যাকে তাকে ওলী বানাচ্ছেন। কাউকে বলি দেবার আগে ওলী বানানোর রেকর্ড তাঁর আগেও ছিল।
খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বঘোষিত এই ওলী সাহেবের জিকির আসকারের ধরনটা জানতাম না, যদি না এক সাংবাদিকের সাথে তার ফোনালাপ ফাঁস হতো। ১৮ মিনিটের আলাপে কম করে হলেও ৩৬ বার জঘন্য একটি শব্দ তিনি বিনা প্রয়োজনে নিজ মুখে উচ্চারন করেছেন। কোন কোন জায়গায় একটি বাক্যে তিনবারও উচ্চারন করেছেন। শব্দটিকে সংক্ষেপে পুমা (পু…মা…) বললেই সবার বোঝার কথা। এটি বাঙালী নিম্ন শ্রেনীতে মাঝেমাঝে উচ্চারিত হয়। তিনি তার চেয়ে বেশী উচ্চারন করেছেন। তিনি কি সমাজের নিম্ন শ্রেনীরও অধম? না হলে শব্দটি তার মুখ থেকে এতবার বের হয় কিভাবে?
যে মুখে তিনি নিজেকে ওলী বলার চেষ্টা করেন, সেই মুখে এত বিশ্রী শব্দ আসেই বা কি করে! সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জোর গলায় বলেছেন, আল্লাহকে অবমাননাকারীর কাছে ক্ষমা চাইবার প্রশ্নই আসে না। সকল ধর্মপরায়ন মানুষের মনের কথাটিই তিনি বলেছিলেন। একজন প্রকৃত মুসলামান কোনদিনইি এটা ক্ষমা করবে না। তিনি যদি সেই মুসলমানই হন তাহলে একদিন পরেই ধর্ম অবমাননাকারী প্রধান শিক্ষকের সাথে গোপন ফোনে এত পিড়ীতের কথা কেমন করে বলেন!
কানধরে ওঠবস করানোর দু’দিন পরে ফোনালাপ ফাঁস না হলে আমরা জানতাম না তার ভন্ডামীর আসল রূপ। সেখানে সুমধুর সুরে ধর্ম অবমাননাকারী প্রধান শিক্ষককে তিনি জানের নিরাপত্তা দিচ্ছেন, চাকুরীর নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। যে ৭টি নতুন স্কুল বানাচ্ছেন তার একটিতে প্রধান শিক্ষক করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এই হলো আল্লাহর অবমাননাকারীকে শাস্তি দেবার নমুনা! ক্ষিপ্ত জনগনকে ঠান্ডা করার জন্যে প্রকাশ্যে বলছেন, দরকার হলে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলবো, কিন্তু ধর্মের অবমাননাকারীর সাথে কোন সমঝোতা নয়। ইসলামের জন্যে প্রয়োজনে জীবন দেয়ার কথা বলে রাতে ফোনে ফিসফিস করে বলছেন, দাদা, চিন্তা কইরেন না। মাথা ঠান্ডা করেন। আমি দেখতাছি। সব ঠিক কইরা দিমু। আপনি ভগবানকে ডাকেন।
এদিকে দাদা শ্যামল বাবুও কম যান না। শিক্ষক সুলভ সামান্য ব্যক্তিত্বেরও লেশমাত্র তার চরিত্রে নেই। সেলিম সাহেবের কথাটা মাটিতে ফেলতে দেননি। মওকা পেয়ে চামচামির মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, আমার আর কোন ভগবান নেই। আপনিই আমার ভগবান। আমাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে একই স্কুলে রাখবেন। আমার এই একটাই দাবী। যার সম্মানের জন্যে সারা দেশের সচেতন মানুষ প্রতিবাদে মুখর, তার চরিত্রের নমুনা দেখেন। যাকে কানধরে উঠবস করানোর প্রতিবাদে দেশের সর্বস্তরের মানুষ দলবেঁধে কানধরে প্রতীকী প্রতিবাদ করেছে, সে সব মানুষের মুখে চুনকালী দিয়ে তিনি গোপন আপোষে নামলেন। ভগবান মানলেন সেলিম ওসমানকে।
এই ফোনালাপ শুনে এবং ঢাকা মেডিকেলে মন্ত্রী নাসিম সাহেবকে পেয়ে যেভাবে হুমরি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে তাঁর পায়ে মাথা ঠেকে প্রনাম করেছেন, সেই ছবি দেখে সমগ্র শিক্ষক সমাজ লজ্জা পেয়েছে। লজ্জা পেয়েছে পুরো হিন্দু সমাজও। হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা কোন অসুস্থ মানুষের মন্ত্রী তো ভাল, প্রধানমন্ত্রীর পায়ে মাথা ঠেকাবার আদৌ দরকার নেই। টিভিতে হাজারো ছাত্রজনতার সামনে তাকে কানধরে উঠবস করতে দেখে আমাদের যেমন কঠিন কষ্ট লেগেছে, ঠিক তেমনি বিনা কারনে মন্ত্রীর পায়ে ঝাপটে পড়ে প্রনাম করতে দেখেও খুব লজ্জা লেগেছে। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত একজন শিক্ষক নিরপরাধ হলে এতটা ভীতু হয়ে পুতুর পুতুর করার কথা না।
প্রধান শিক্ষকের এই পুতুর পুতুর স্বভাব প্রমান করে সমস্যা তার ভিতরেও আছে। ঘটনার গভীরে গেলে সেই গলদ বেরিয়ে আসবে হয়ত। আমার মনে হয় না এমনি মানুষটিকে সেলিম সাহেবের জোর করে কানধরে ওঠবস করানোর আদৌ প্রয়োজন হয়েছিল। সেদিন তিনি স্বেচ্ছায় সে সব করেছেন বলে কেউ কেউ মনে করতে পারেন। ব্যক্তিত্বহীনেরা সব পারে; যতটা নীচে নামার নামতে পারে। এদের চরিত্রে বলিষ্ঠতা বলতে কিছু থাকে না।
লোকটির চরিত্রের সংগে তার নামেরও অনেক মিল আছে। শ্যামল কান্তি ভক্ত। তিনি আসলেই ভক্ত; শক্তের ভক্ত, নরমের জম। শক্তিমান ওলী ওসমানকে ভগবান মানেন, পাওয়ারফুল মন্ত্রীর পায়ে মাথা ঠুকে প্রনাম করে চামচামী করেন। আবার ক্লাশরুমের নরম ছাত্রকে জায়গা মত পেয়ে জোস সামাল দিতে পারেন না; কথা দিয়ে আঘাত করেন। কে জানে হয়ত এমনি জোসের ঠেলায় তেমনটা না ভেবেই মহান রাব্বুল আল আমিনকে সেদিন আঘাত করে ফেলেছেন। নিজের জোসের ঠেলা সামাল দিতে পারেন নাই যিনি, তিনি কেমন করে এত বড় বিপদ এখন সামাল দেবেন তা আর কেউ নয়, কেবল মহান আল্লাহপাকই জানেন!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা