এ কোন দেশে বাস করছি আমরা!

89

যুগবার্তা ডেস্কঃ সারা দেশে সম্প্রতি বেড়ে গেছে ধর্ষণকাণ্ড। একের পর এক এমন ঘটনায় বিবেকবান মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ। ন্যক্কারজনক এহেন বর্বরতা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না শিশুও। ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে যে দেশ, সেই দেশে এমন মধ্যযুগীয় অসভ্যতার কারণে প্রশ্ন জেগেছে- এমন দেশই কি চেয়েছিলেন প্রাণের বিনিময়ে দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন যারা? এই কি আমাদের সেই স্বপ্নের দেশ? এ কেমন বর্বরতা?
সম্প্রতি রাজধানীসহ সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, গৃহবধূ এমনকি অবুঝ শিশুও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ঘরে-বাইরে পরিচিত-অপরিচিতজনসহ পরিবারের আপনজনদের হাতে ধর্ষিত হচ্ছে এসব নারী-শিশু। শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষ্যান্ত হচ্ছে না, ধর্ষিতাকে মেরেও ফেলা হচ্ছে। আবার ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে ধর্ষিতা ও তার পরিবারকে নানা অপমান-অপদস্ত ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এতে কেউ কেউ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে।
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনাসভায় সারা দেশের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় সারা দেশের নারী ও শিশু ধর্ষণ পরিস্থিত তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩ মাসে ৭ জেলায় সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ মামলা রেকর্ড হয়েছে। জেলাগুলো হলো ময়মনসিংহ, বরগুনা, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, গাজীপুর, রংপুর ও নীলফামারী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। এর জন্য সামাজিক অবক্ষয়, অপসংস্কৃতি, সামাজিক অস্থিরতা, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, অশ্লীলতা, মাদকের বিস্তার, ঠিকমতো বিচার না হওয়া এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবারের যেসব সন্তান সঠিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেনি, তারা এবং নিম্নশ্রেণির মানুষের মধ্যে ধর্ষণের প্রবণতা বেশি। সমাজবিজ্ঞানের একটা সংজ্ঞা আছে, যার যার বেড়ে ওঠার ওপর তার আচার-আচরণ প্রতিফলিত হবে।
তিনি বলেন, সমাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতি আছে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে অপরাধীদের। যারা ধর্ষণ করছে তারা হয়তো ভাবেন, আমার তো ওয়ার্ড কাউন্সিলর আছে, ওমুক আছে, তমুক আছে; তারা আমাকে বাঁচাবে। আইনের প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল নয় বলে সমাজে যত ধরনের অন্যায়, অসামাজিক কাজ ঘটছে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে এটা হতো না।
নেহাল করিম আরও বলেন, পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোয় এসব হয়। কিন্তু সেখানে একটা সিস্টেম কাজ করে। মাত্রাগত পার্থক্য আছে। কিন্তু আমাদের দেশে বাড়ছে, কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতা আছে। আবার অর্থনৈতিকভাবে যারা সমাজের নিম্নস্তরে বাস করে, তারা টিভিও দেখে না পত্রিকা পড়ে না। ফলে তাদের মধ্যে সচেতনতাই গড়ে ওঠে না। এ ধরনের অপরাধের জন্য কী শাস্তি হতে পারে তাও জানে না। পুলিশও বস্তিতে যেতে চান না। কারণ সেখানে বেশি টাকা পাওয়া যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারযান বলেন, সমাজব্যবস্থা এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন অস্থিরতায় বিভিন্ন ধরনের সংকট দেখা দেয়। ট্রাডিশনাল সমাজব্যবস্থা থেকে তথাকথিত আধুনিক সমাজব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি আমরা। তখন সমাজে কিছু পরিবর্তন আসে। মানুষের যৌন চাহিদাসহ সবকিছুতেই এক ধরনের পরিবর্তন আসে। এসব কারণে অনেক সময় ধর্ষণের সংখ্যা বাড়ে।
তিনি বলেন, আমাদের বিদ্যমান বিচারব্যবস্থায় ধর্ষণের শাস্তি ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট। তার পরও কেন বাড়ছে? এর একটা বড় কারণ হচ্ছে, কয়টি মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ হয়। একটা মামলা যখন বছরের পর বছর ধরে চলে, তখন বাদীর মামলা পরিচালনার উৎসাহ থাকে না। ধর্ষণের কারণে এমনিতেই সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন তারা। বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ধর্ষণের ক্ষেত্রে একটা বড় ইমপেক্ট বলে আমি মনে করি।
৩০ জুলাই পুলিশ সদর দপ্তরে ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সারা দেশের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে নারী-শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা আলোচনায় আসে। সভায় সারা দেশের নারী ও শিশু ধর্ষণ পরিস্থিত তুলে ধরা হয়। এতে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩ মাসে ময়মনসিংহ, বরগুনা, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, গাজীপুর, রংপুর ও নীলফামারী জেলায় সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ মামলা রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহে ৩৩টি, বরগুনায় ৩০টি, সিরাজগঞ্জে ২৬টি, গাইবান্ধায় ২৬টি, গাজীপুরে ২৫টি, রংপুরে ২১টি এবং নীলফামারীতে ২১টি ধর্ষণের মামলা রেকর্ড হয়।
অন্যদিকে এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৭ জেলায় ধর্ষণের মামলা সবচেয়ে বেশি রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে বরগুনায় ৫৬টি, টাঙ্গাইলে ৪৫টি, কুমিল্লায় ৪৫টি, গাজীপুরে ৪১টি, হবিগঞ্জে ৩২টি, সিরাজগঞ্জে ৩১টি এবং ময়মনসিংহে ৩০টি ধর্ষণের মামলা রেকর্ড করা হয়। জানুয়ারি থেকে মার্চ ৩ মাসের চেয়ে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ৩ মাসে ধর্ষণের মামলা বেশি রেকর্ড হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, এসব জেলায় ধর্ষণের মামলা বেশি হচ্ছে মানে ধর্ষণের ঘটনাও বেশি, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সংখ্যাও বেশি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এপ্রিল থেকে জুন ৩ মাসের ধর্ষণ মামলা পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, আলোচ্য সময়ে বিচারাধীন মুলতবি ধর্ষণ মামলার সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৬৬টি, তদন্তাধীন মুলতবি মামলার সংখ্যা ১ হাজার ২৬৫টি।
আলোচ্য সময়ে ধর্ষণ মামলার বিচারের ফলাফলে দেখা গেছে, ৩১৮ মামলায় ৪৯১ আসামি খালাস হয়েছে। অন্যদিকে ৫১টি মামলায় ৭০ আসামির বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে ৭৫৪ মামলায় ১ হাজার ১২৩ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। ১৯৮টি মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। অর্থাৎ ১৯৮ মামলায় অভিযোগ প্রমাণ হয়নি।
পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, পূর্বে তদন্তাধীন মুলতবি মামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৭টি। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ৩ মাসে আরও ১ হাজার ১২০টি নতুন মামলা রুজু হয়। সব মিলিয়ে তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ২ হাজার ২১৭টি।
জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩ মাসে গাইবান্ধা জেলায় ২৬টি ধর্ষণ মামলা রেকর্ড হওয়ায় ওই জেলা পুলিশ সদর দপ্তরের শীর্ষ ৭ জেলার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু এপ্রিল থেকে জুন এই ৩ মাসের শীর্ষ ৭ জেলার তালিকায় গাইবান্ধা জেলা নেই।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলার পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, আমি গাইবান্ধা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দেওয়ার পর দেখলাম, জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস ওই ৩ মাসে গাইবান্ধা ধর্ষণে শীর্ষ ৭ জেলার তালিকায় এসেছে। এরপর আমি ধর্ষণ বৃদ্ধির কারণগুলো অনুসন্ধান করি। ওই ২৬টি মামলা পর্যালোচনা করে দেখতে পাই, মামলা রেকর্ডের বেশিরভাগ ঘটনাতে প্রেমঘটিত বিষয় রয়েছে। অর্থাৎ একটি মেয়ে ও একটি ছেলে প্রেম করার পর শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরবর্তীতে ওই ছেলে আর মেয়েটিকে বিয়ে করতে চায় না। তখনি মামলার উদ্ভব হয়। মেয়েটির সামাজিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পুলিশ মামলা নিয়েছে। একপর্যায়ে ধর্ষক ও ধর্ষিতার পরিবারের মধ্যে কোনো কোনো মামলার ক্ষেত্রে সমঝোতার মাধ্যমে ছেলেমেয়ের বিয়ে হচ্ছে। আবার এখানে যখন স্কুল, কলেজ বন্ধ থাকে তখন প্রেম ও ধর্ষণের ঘটনা বাড়ে। তাই স্কুল, কলেজে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। বিশেষ করে কমিউনিটি পুলিশের মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের সচেতন করছি। এসব পদক্ষেপের কারণে ধর্ষণের ঘটনা কমে এসেছে। যে কারণে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ৩ মাসে ধর্ষণ মামলা রেকর্ডের শীর্ষে থাকা ৭ জেলার মধ্যে গাইবান্ধা নেই। পাশাপাশি অভিভাবকদের উদাসীনতার কারণেও প্রেম ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এ জন্য অভিভাবকদেরও আমরা সচেতন করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু মামলার হিসাবই ধর্ষণের সঠিক চিত্র নয়। ধর্ষণের প্রকৃত চিত্র এর চেয়েও ভয়াবহ। অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষিতা নারী লোকলজ্জার ভয়ে আইনি বা সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না। ফলে পার পেয়ে যায় ধর্ষক। আর এ ঘটনা পুলিশের মামলার হিসাবেও আসে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ ধর্ষণের মামলা রেকর্ড না করে ধর্ষিতাকে ফেরত পাঠায়। ফলে বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে একপর্যায়ে ধর্ষিত নারী নিজেকে গুটিয়ে নেন। এতে শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় ধর্ষক আবার ধর্ষণে ধাবিত হয়।
সম্প্রতি দেশে ধর্ষণের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো বগুড়ায় শহর শ্রমিক লীগ আহ্বায়ক তুফান ও তার সহযোগীদের কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা। তুফান ওই কিশোরীকে ভালো কলেজে ভর্তির প্রলোভন দেখিয়ে ১৭ জুলাই ও পরে কয়েকবার ধর্ষণ করেন। এ কাজে তাকে সহায়তা করে তার কয়েকজন সহযোগী। এর বিচার চাওয়ায় তুফানের স্ত্রী আশা ও তার বড় বোন বগুড়া পৌরসভার সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকিসহ ‘একদল সন্ত্রাসী’ শুক্রবার দুপুরে ওই কিশোরী এবং তার মাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাদের মারধর করে নাপিত ডেকে এনে মা ও মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দেয়। এ ছাড়া খাবারের লোভ দেখিয়ে রাজধানীর বাড্ডায় সাড়ে ৩ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ছিল বেশ আলোচিত।-আমাদেরসময়