এসেছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, বসছে ধোলাইপাড়েই

ডেস্ক রিপোর্ট: রাজধানীর ধোলাইপাড় সড়কদ্বীপে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে এক বছর আগে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করে তুলেছিলেন ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের নেতারা। তবে প্রকল্পের পরিচালক জানিয়েছেন, ভাস্কর্যটি সেখানেই বসানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে ভাস্কর্যটি চীন থেকে এসে পৌঁছেছে।
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের শুরুর প্রান্তে ধোলাইপাড় সড়কদ্বীপে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণকাজটি বন্ধ রয়েছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। মাঝে হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতার মুখে ভাস্কর্য স্থাপনের কাজে ছেদ পড়ে।

সে সময় ভাস্কর্যটি অন্য কোথাও স্থাপনের কথাও ভেবেছিল সরকার। কিন্তু এখন আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী ধোলাইপাড় সড়কদ্বীপে নির্ধারিত স্থানেই স্থাপন করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটি। ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয়েছে চীনে। এটি চীন থেকে অনেক আগেই আনা হয়েছে। সেটি রাখা হয়েছে সড়ক ভবনে।

প্রকল্পটির পরিচালক সবুজ উদ্দিন খান বলেন, ‘মাঝে কিছু সংকটের কারণে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে কিছুটা জটিলতা থাকলেও এখন আর তেমন কিছু নেই। আমরা ধোলাইপাড়ে নির্ধারিত স্থানেই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন করব। তবে এতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।’

কতটা সময় লাগবে ও কেন সময় লাগছে- এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আরেকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ধোলাইপাড় মোড়ে আগের জায়গাতেই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তার আগে সেখানকার একটি মসজিদ স্থানান্তর করা হবে। মসজিদের জন্য নতুন জায়গা ইতোমধ্যেই দেখা হয়ে গেছে।

মসজিদ স্থানান্তরের কারণ জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, মসজিদটি সরকারি রাস্তার ওপর নির্মাণ করা হয়েছিল, তাই এটির বৈধতা ছিল না। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজের সময় মসজিদের বেশ কিছু অংশ ভেঙে ফেলতে হয়।

সরেজমিন ধোলাইপাড় মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, টিন দিয়ে আগের মতোই ঘিরে রাখা হয়েছে ভাস্কর্যের জন্য নির্ধারিত স্থানটি। ভাস্কর্যের বেদি পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ। এর ওপরে শুধু ভাস্কর্য স্থাপন বাকি।

মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার থেকে নেমে সোজা এগোলে ধোলাইপাড় মোড়ে ভাস্কর্যের বেদিটি টিন দিয়ে ঘিরে রাখা। পূর্ব পাশে রাস্তা ঘেঁষে বাইতুশ শারফ জামে মসজিদ। মসজিদটি আগে রাস্তার ওপরই ছিল। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকাজের সময় রাস্তা সম্প্রসারণের সময় এর বেশির ভাগ অংশই ভাঙা পড়ে।

মসজিদ কমিটির সভাপতি হাজি মো. আজাদ খান বলেন, ‘রাস্তা নির্মাণের সময় আমাদের এই মসজিদটি ভাঙা পড়েছিল। পরে হেফাজতের আন্দোলনের সময় এটি পুনর্নির্মাণের দাবি উঠেছিল। তখন এটি আবার ব্যবহারোপযোগী করে দেয় সেনাবাহিনী। কিন্তু ছয়-সাত মাস আগে এমপি সাহেব আমাদের ডেকে বললেন, আমাদের মসজিদটা আরও বড় করে বানিয়ে দেবে সরকার। এ জন্য পাশেই একটা জায়গা দেখা হয়েছে। আমরাও এই বিষয়ে কোনো আপত্তি করিনি, কারণ যদি আরও বড় মসজিদ হয়, তাহলে বেশি মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু হোসেন বাবলা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রাস্তা বড় করার জন্য মসজিদ ভাঙা হয়েছিল। তাই এখন নতুন মসজিদ করে দেয়া হচ্ছে।’

যা ঘটেছিল ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনে

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সারা দেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরই অংশ হিসেবে পদ্মা সেতু দিয়ে ঢাকার প্রবেশমুখ রাজধানীর ধোলাইপাড় মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

২০২০ সালের নভেম্বরে ধোলাইপাড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করে দেশে নানা ঘটনা ঘটে। কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ধর্মভিত্তিক দলগুলো ভাস্কর্যকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে এটি প্রতিরোধে মাঠে নামে। এই দলগুলোর বক্তব্য ছিল আক্রমণাত্মক। প্রথমে মাঠে নামে চরমোনাইয়ের পিরের দল ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির ফয়জুল করীম। পরে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক হুমকি দেন, ভাস্কর্য নির্মাণ হলে তিনি আরেকটি শাপলা চত্বর পরিস্থিতি তৈরি করবেন। সর্বশেষে হেফাজতের আমির জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, ভাস্কর্য নির্মাণ হলে তারা টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেবেন।

এরই মধ্যে ৪ নভেম্বর প্রথম প্রহরে কুষ্টিয়া শহরে বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন একটি ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। এরপর স্থানীয় একটি মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়।

শুরুতে চুপ থাকলেও পরে সরকার সমর্থকরা মাঠে নামে। মৌলবাদী গোষ্ঠীকে প্রতিহতের ঘোষণা দেয়া হয়। রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মকর্তারাও সারা দেশে একযোগে সমাবেশ করে ভাস্কর্যবিরোধীদের সতর্ক করে দেন। জাতির পিতার সম্মান অক্ষুণ্ন রাখার শপথও নেয়া হয় সেখানে।-নিউজবাংলা