এবার পানি বাড়ছে পদ্মায়

85

যুগবার্তা ডেস্কঃ যমুনায় কমতে শুরু করলেও পদ্মায় পানি বাড়ছে। বুধবার থেকে যমুনায় পানি কমছে, তবে পানি এখনো বিপদসীমার ওপরে থাকায় এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে দেখা যায়নি। মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। পদ্মায় পানি বাড়তে থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। কোথায় কোথায় তীব্র ভাঙনও দেখা দিয়েছে। সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা ও দিনাজুপরে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে আট জন। এদিকে ঢাকার আশেপাশের নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, উত্তরাঞ্চলের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বুধবার থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। আরিচা পয়েন্টে যমুনার পানি স্থিতিশীল আছে। আজ বিকাল নাগাদ আরিচা পয়েন্টে পানি কমা শুরু হতে পারে। অন্যদিকে গঙ্গায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও এখন তার মাত্রাটা কমে এসেছে। নতুন করে বৃষ্টি না হলে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মানিকগঞ্জে বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার যমুনার পানি বিপদসীমার ৭২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এছাড়া যমুনার শাখা নদী পুরাতন ধলেশ্বরী, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, ইছামতি, কান্তাবতীতে সমানতালে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলার ৭২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ রয়েছে। ধসে যাওয়ার আশঙ্কায় আরিচা থেকে অন্বয়পুর হয়ে পাটুরিয়া রোডের সরাসরি যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

পদ্মা-যমুনার তীরবর্তী ৪টি উপজেলার অভ্যন্তরে খাল-নদী-নালা বেয়ে দ্রুত পানি প্রবেশ করছে। বন্যার পানির চাপে আরিচা-পাটুরিয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের এলাচিপুর এলাকায় ফাটল দেখা দিয়েছে। অন্বয়পুর এলাকায় বাঁধ উপচে ভেতরে পানি প্রবেশ করছে। এলাকাবাসী বালির বস্তা ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছে। পদ্মা-যমুনা তীরবর্তী দৌলতপুর, ঘিওর, শিবালয় ও হরিরামপুর— এই চারটি উপজেলার চরাঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, যমুনার পানি আরিচা পয়েন্টে ১২ ঘণ্টায় ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে বিপদসীমার ৭২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কয়েকটি উপজেলায় পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ইতোমধ্যে উপজেলার জাফরগঞ্জ বেড়ী বাঁধ, হাট-বাজার, আরিচা ফেরি-লঞ্চ টারমিনাল, পিসিপোল কারখানা, পাটুরিয়া ৪ নং ফেরি ঘাট এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পদ্মায় প্রবল স্রোত ঢেউয়ের কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, আরিচা-কাজিরহাট নৌ-রুটে ফেরি-লঞ্চ, কার্গো-নৌকা ইত্যাদি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় টাঙ্গাইলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলার ভূঞাপুর, গোপালপুর, কালিহাতী, নাগরপুর ও টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বিশেষ করে চরাঞ্চলগুলোতে কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, পদ্মা নদীর অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে ঢাকার দোহার উপজেলার নয়াবাড়ি, মাহমুদপুর, বিলাশপুর, মুকসুদপুর, নারিশা, কুসুমহাটি, রাইপাড়া, সুতারপাড়া ইউনিয়নের প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার একমাত্র রাস্তা তারাকান্দি-ভূয়াপুর সড়কটি ভেঙে প্রায় ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গত বুধবার দিবাগত গভীর রাতে যমুনার পানির প্রবল স্রোতে সড়কটি ভেঙে যায়।

শেরপুর প্রতিনিধি জানান, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। নতুন করে তিনটি ইউনিয়নে বন্যার পানি প্রবেশ করায় এখন বন্যা কবলিত ইউনিয়নের সংখ্যা ছয়। ইউনিয়নগুলো হচ্ছে— কামারের চর, চর মুচারিয়া, চর পক্ষীমারী, বলাইর চর, লছমনপুর ও বেতমারী-ঘুঘড়াকান্দি।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রাম জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনও ঘরে ফিরতে পারেনি দুর্গতরা। ফলে কমেনি জনদুর্ভোগ। ত্রাণ অপ্রত্যুল হওয়ায় দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছেনি খাদ্য সহায়তা।

গাইবান্ধার প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় বৃহস্পতিবার ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও ঘাঘট নদীর পানি সামান্য কমলেও করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বুধবার মধ্য রাতে সাদুল্লাপুরের পুরাণ লক্ষ্মীপুর দ্বীপ এলাকায় ঘাঘট নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে নতুন করে আরো ১০টি গ্রাম ও হাজার হাজার বিঘে ফসলি জমি প্লাবিত হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে বৃহস্পতিবার দুই শিশু মারা গেছে। পানিতে ডুবে মারা যাওয়া ওই দুই শিশু হলো— সাদুল্লাপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের আরাজী তরফকামাল গ্রামের হেলাল মিয়ার দুই বছর বয়সী শিশু সাঈদ মিয়া ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামের জান্নাত আলীর ছেলে সিপাত মিয়া (৩)। জেলায় আগামী ১৯ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।

জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, জেলায় ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জয়পুরহাটের উপর দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদীর পানি স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করলেও তুলশীগঙ্গা নদীর পানি এখনও বিপদসীমার ৩১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বগুড়া অফিস জানায়, বগুড়ায় যমুনা নদীর বাঁধের ১৮টি পয়েন্টে ফাটল দেখা দিয়েছে। সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলা অংশের এসব ফাটলরোধে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তাদের এই কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে স্থানীয় জনতা।

ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানান, হু হু করে বাড়ছে পদ্মা নদীর পানি। কুষ্টিয়ায় এই নদীর পানি একেবারে বিপদসীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর পানি ভেড়ামারার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে ২৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী ৩৬ ঘন্টার মধ্যে তা বিপদসীমা অতিক্রম করবে।

বাগমারা (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, রাজশাহীর বাগমারায় বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। আত্রাই নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এর শাখা নদী বারনই ও ফকিরনীতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে পশ্চিম বাগমারার ৫টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গত ২৪ ঘন্টায় যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি না পেলেও কমেনি। গতকাল বৃহস্পতিবার যমুনার পানি বিপদসীমার ১৫২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। কাজিপুর, বেলকুচি, চৌহালি, শাহজাদপুর ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ৪৮টি ইউনিয়নের তিন শতাধিক গ্রাম বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে।

সিরাজগঞ্জের বেলকুচি ও উল্লাপাড়া উপজেলায় বন্যার পানি ও পুকুরে ডুবে ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে বেলকুচিতে দুই শিশু ও বুধবার সন্ধ্যায় উল্লাপাড়া এক শিশুর মৃত্যু হয়। এরা হলো— বেলকুচি উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের নাগগাতী গ্রামের আব্দুল আওয়ালের ছেলে নিরব (৬) একই উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের বওড়া গ্রামের জহুরুল ইসলামের ছেলে হযরত আলী (৮) ও উল্লাপাড়া উপজেলার বাকুয়া গ্রামের আলামিন হোসেনের ছেলে ফাহিম হোসেন (২)।

সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের সদরপুর অঞ্চলের পদ্মা-আড়িয়াল খাঁয় বন্যার পানি গতকাল বুধবার বিপদসীমার ৫৫ সে.মি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। চরাঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক এলাকা জুড়ে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে।

শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, পদ্মায় দ্বিতীয় দফায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে নদী ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা জানান, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় পদ্মা নদীর পানি গোয়ালন্দ পয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। পানির চাপে উপজেলার কাটাখালী-তেনাপচা সড়কের ২০ মিটার ভেঙে পানি প্রবেশ করে ১৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া বন্যার্ত মানুষ দেবগ্রামের অন্তারমোড় বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।

দিনাজপুর অফিস জানায়, দিনাজপুরে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কমতে শুরু করেছে নদ-নদীর পানি। জেলার একটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও অন্যান্য নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে বিপদসীমার নিচে। বন্যার পানিতে ডুবে গত বুধবার দিনাজপুর জেলায় মারা গেছে আরো ৩ জন। এরা হলেন, দিনাজপুরের পার্বতীপুরের আটরাই গ্রামের দুলাল হোসেন (৩৫), বিরলের কাজিপাড়া গ্রামের মিনি আকতার (৪) ও শহরের ষষ্টিতলার আশিক রহমান (৯)।

লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, সেখানে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ও সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল টিমের কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

সিলেট অফিস জানায়, সিলেটে সুরমা-কুশিয়ারার পানি কমতে থাকায় স্থানীয় অধিবাসীরা কিছুটা স্বস্থিবোধ করছেন। তবে বন্যার পানি কমলেও কমছে না মানুষের দুর্ভোগ। এছাড়া প্রধান দুই নদীর সবকটি পয়েন্টে পানি এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি কমায় অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে।-ইত্তেফাক