এবারের মে দিবস নিয়ে কিছুকথা

90

সৈয়দ আমিরুজ্জামানঃ
পহেলা মে শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস। মহান মে দিবস শহর ও শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক, গ্রামীণ শ্রমজীবী-ভূমিহীন-ক্ষেতমজুর,বর্গাচাষী, গরীব কৃষক, মাঝারী কৃষক এবং শহর ও গ্রামের অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ, অর্ধবেকার ,সর্বহারাসহ শ্রমিক শ্রেণীর জীবনে আসে শ্রেণীগতভাবে সংগঠিত হয়ে শোষক আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবার শিক্ষা নিয়ে। এ লড়াইয়ে যে শ্রমিক শ্রেণী নিশ্চিত বিজয় অর্জন করবে তা ইতিহাসেরই শিক্ষা। ১লা মে সারা দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণীকে শিখিয়েছে যে শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিই তার শৃঙ্খল মোচনের সবচেয়ে তীক্ষèও একমাত্র হাতিয়ার। শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তিই শোষণভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের উপাদান ও নেতা। রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণী এবং তার রাজনৈতিক নেতৃত্বই কেবল স্বীয় শ্রেণী ও সমগ্র মানব জাতিকে শোষণ-বঞ্চনা-অনুন্নয়ন, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন-যুদ্ধান্মাদনা-গণহত্যা- ধ্বংসযজ্ঞ, অজ্ঞতা-অন্ধকার, অশিক্ষা-কুসংস্কার-কূপমন্ডুকতা থেকে মুক্তি দিয়ে আনন্দোজ্বল সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে পারে।
১৮৮৬ সালের রক্তাক্ত ১লা মে শ্রমিক শ্রেণীর সামনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে শ্রমিক শ্রেণী তার বুকের তাজা রক্তে এ দিনটিকে রাঙ্গিয়ে একান্ত আপনার করে তুলেছে বিজয়ের দিন হিসাবে, আনন্দের দিন হিসাবে, সর্বোপরি শিক্ষা গ্রহণের দিন হিসাবে। ১৩০ বছর আগে আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণীর রক্ত ঝরানো দিনটি সারা দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণীকে তাদের শ্রেণীগত চেতনা ও সংগ্রামের বিকাশ ঘটাতে বিগত একশ’ বাইশ বছর ধরে একটি চালিকা শক্তি হিসাবে কাজ করে আসছে।
১৮৮৯ সালে ফ্রেডারিক এঙ্গেল্স-এর নেতৃত্বে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সিদ্ধান্ত অনুসারে সমগ্র দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণী একটি সৈন্যবাহিনী হিসাবে একই পতাকা তলে সমবেত হয়ে ১৮৯০ সাল হতে মে দিবসকে শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। সে সময় হতে মে দিবস দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণীকে কেবলমাত্র তাদের ৮ ঘন্টা কাজের দাবির মধ্যেই নয়, শ্রমিক শ্রেণীকে শোষণ-পীড়ন হতে মুক্তির অভিন্ন লক্ষ্যে এগিয়ে যাবার জন্য উন্নততর চেতনায় সমৃদ্ধ করেছে, যতই দিন অতিক্রান্ত হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণী তত বেশী হারে নিজস্ব শ্রেণীগত অবস্থানকে সংহত করছে এবং সময় সময় সাময়িক নৈরাশ্য ও পাহাড়সম বাধাঁ সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠলেও শুধুমাত্র মজুরী বৃদ্ধির অর্থনীতিবাদী আন্দোলনেই নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ করে নয়, শ্রেণী হিসাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে স্বীয় শ্রেণীকে শাসক শ্রেণীতে উন্নীত করার লক্ষ্যে লড়াই তীক্ষতর করছে।
সাময়িক কোন বিপর্যয়ই তাদের অগ্রগামিতাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনা। মে দিবসের ঘটনার মাত্র ৩৮বছর আগে ১৮৪৮সালে শ্রমিক শ্রেণী তাদের রাজনৈতিক শ্লোগান “দুনিয়ার মজদুর এক হও” নির্ধারন করে। আর মে দিবসের ঘটনার মাত্র ৩১ বছর পর ১৯১৭ সালে মহামতি কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণী মহান অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে শ্রেণী হিসেবে রাজনৈতিক অভ্যূদ্বয়ের অনিবার্যতা প্রমাণ করে রেখেছে। রুশ বিপ্লবের পর একাদিক দেশে বিপ্লব সম্পন্ন করে শ্রমিক শ্রেণী তাদের আদর্শকে অর্থাৎ সমাজতন্ত্রকে বিশ্ব ব্যবস্থার অন্যতম ব্যবস্থা হিসাবে পথ নির্দেশ করেছে। খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতন কোন ক্রমেই জনগণের গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা হিসাবে সমাজতন্ত্রকে নাকচ করে দেয় না। বরং বিপ্লব আজ সামাজিকভাবে অবশ্যম্ভাবী রূপে দেখা দিয়েছে। ক্ষুধা-পীড়িত, অত্যাচারিত, শোষণ জর্জরিত মানুষ আজ বেঁচে থাকার তাগিদে মুক্তির আকাংখায় নিজ ভাগ্য পরিবর্তনের প্রেরণায় নিজ নিজ কায়দায় সংগ্রামে নামছে, যা শ্রেণীগত ও পেশাগত রাজনীতির বিকাশের দিক। সংগ্রামের এ নতুন ধারার মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হবে এবং করতে হবে জনগণের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি। বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তে শ্রমজীবি জনগণের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের হাতে এই বিকল্প সংস্থার দ্বারাই জনগণের স্বার্থে বিপ্লবের কর্মসুচীকে কার্যকরী করা সম্ভব। তাই আরো জঙ্গীত্ব নিয়ে নিখাদ শ্রেণী চেতনা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিরুদ্ধে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শ্রমিক শ্রেণীর লড়াই জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাকেই ঐতিহাসিক কর্তব্য হিসাবে সামনে তুলে ধরে। পুঁজিবাদী দুনিয়া যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সারা দুনিয়ায় আজ মে দিবস পালিত হচ্ছে। বলা বাহুল্য, ভিন্ন ভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ হতে মে দিবসকে উপস্থাপিত করা হয়ে থাকে। সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্নতার কারণে এবং শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক বিকাশের স্তরভেদে এ বিভিন্নতা নির্ণীত হয়। আজকের বিশ্বপরিস্থিতেও শোষক শ্রেণী মে দিবসকে সরাসরি নাকচ করে দেবার সাহস রাখে না। তবে দুনিয়ার দেশে দেশে বুর্জোয়া-ধনীক রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো শ্রেণী সংগ্রাম-ঐক্য-আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির মে দিবসটিকে নির্জীব করে রাখার জন্যও চেষ্টার ত্রুটি করছে না। বাংলাদেশেও এর কোন ব্যতিক্রম নেই। এখানকার বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী এ দিবসে শ্রমিকদেরকে আনন্দ উল্লাসে বেঁধে রেখে বোঝাবার চেষ্টা করবে মে দিবসে সরকারী ছুটি ঘোষিত হওয়ায় তোমাদের বিজয় অর্জিত হয়ে গেছে। শোসক বুর্জোয়া শ্রেণীর পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্রে প্রবন্ধ- নিবন্ধ লিখে মে দিবসের প্রশস্তি বয়ান করবে। অথচ এ সব পত্রিকা প্রতিদিন সকালে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। ওরা ওদের কলমের প্রতি বিন্দু কালি শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে ব্যয় করছে।
বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সংগ্রামের স্তর যে অনেক পিছনে পড়ে রয়েছে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের দেশের শ্রমিক শ্রেণী এখনো পর্যন্ত মজুরি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর বৃহত্তম অংশ এখন পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, বর্ণচোরা পেটি বুর্জোয়াদের, টাউট ও দালাল ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের নেতৃত্বের প্রভাব বলয়ের আওতায় পড়ে আছে। পথভ্রষ্ট শ্রমিকদেরকে অসৎ ও বুর্জোয়া শ্রেণীর রাজনৈতিক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বের খপ্পর থেকে বের করে আনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে শ্রমিক শ্রেণীর ভাবাদর্শের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে।
আমাদের দেশের শ্রমিকরা বুর্জোয়া ভাবাদর্শ, ব্যক্তিমোহ, ভাববাদ ইত্যাদি পশ্চাৎপদ চিন্তা চেতনায় আক্রান্ত ও আচ্ছন্ন হলেও স্বাধীনতার পূর্বাপর সময়ে তারা যে বিভিন্ন সময়ে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করেছে এবং আজও করছে তাতে শ্রেণীগত রাজনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হবার অনন্ত সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে বিকশিত করে তুলতে হবে এবং সেজন্য শ্রমিক শ্রেণীকে তাদের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন ও আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি স্বীয় শ্রেণীর রাজনৈতিক আদর্শের পার্টিতে সংগঠিত হবার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীকে তার রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ কৃষক এবং নবোত্থিত মিত্র গ্রামীণ শ্রমজীবি-ক্ষেতমজুরদের সাথে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে কলকারখানা ও খেতে-মাঠে মুক্তির লড়াই জোরদার করতে হবে। শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুরসহ সকল শ্রেণীর মেহনতী শোষিত, নিপীড়িত মানুষকে তার মুক্তির হাতিয়ার শ্রেণী সংগ্রামকে বর্তমান বাস্তবতায় তীব্রভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। আর তীক্ষ্ম করতে হবে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক সংগ্রামকে। প্যালেষ্টাইনে জায়নবাদী আগ্রাসন, বিশ্বব্যাপী ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন-গণহত্যা-ধ্বংসযজ্ঞ ও পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এবার মে দিবস এ প্রেরণা নিয়েই এসেছে। শ্রমিক শ্রেণীসহ শোষিত মেহনতী মানুষের মুক্তি অনিবার্য। মহান মে দিবস জিন্দাবাদ। বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক। -লেখকঃ সম্পাদক, আরপি নিউজ বিডি. কম