এক জীবন যোদ্ধার কাহিনী

17

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ সংবাদটা শুনেই চমকে উঠি। এযেন অশনি সংকেত। ঈশানকোণে মেঘ। ভয়- শংকা দানা বাঁধে। নাজমুল হাসান মিলন- এক জীবন যোদ্ধা। চার দশক আগে গুলেনবারি সিন্ড্রোম- এ আক্রান্ত হয়ে অদ্যাবধি সে চলৎশক্তিহীন এবং শয্যাগত।

মিলনের কোভিড রিপোর্ট পজিটিভ। জীবনের সাথে যুদ্ধ তার দীর্ঘ দিনের। ইতোমধ্যে শরীরে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মধুমেহ এসে বাসা বেঁধেছে। মাংস পেশীগুলো শিথিল হয়ে গেছে। খাবার নিজে তুলে খেতে পারেনা। মা ভাইবোনের অক্লান্ত চেষ্টা এবং ওষুধের উপর কোন মতো সে বেঁচে আছে।

ইতোমধ্যে কোভিড ঝড়ে উপড়ে গেছে কত মহীরুহ- ঝরে গেছে কত প্রাণ। দুনিয়া ব্যাপী বইছে ঘূর্ণিবায়ু। এসময় বেঁচে থাকাটাই দায়। সময় বড়ই দুঃসময়। এই ঝড় থামবে কবে? কেউ তা বলতে পারে না।

ছোট বেলায় দেখা খাঁখাঁ দুপুর। গ্রামের বাড়ি থেকে উত্তরপূর্ব কোণে ‘বংলীর’ হাট। দুপুরে ওদিকে তাকালেই ঘূর্ণিবায়ু চোখে পড়ত। স্থানীয় ভাষায় ‘বাইকুঁড়ানী’। দূর থেকে দেখতে ঠিক হাতীর শুঁড়ের মতো আকাশ বেয়ে উঠছে। প্রায়শই ‘বাইকুঁড়ানী’ এসে মোল্লাবাড়ির প্রকাণ্ড তেতুল গাছে আছড়ে পড়ত। তাই সন্ধ্যা হলে কেউ তেতুলতলা মাড়ায় না। রাতের বেলা নাঁকিসুরে কে যেন গান গায়। নানান সব ভূতুড়ে কাহিনী। তেতুলতলা দিয়ে যেতে গা ছমছম করে। কতদিন চোখ বন্ধ করে দৌড়ে তেতুলতলা পার হয়েছি তার কোন ইয়ত্তা নেই।

সেদিন দুপুরে হঠাৎ করে মিলনের অক্সিজেন লেভেলটা ৮০ ঘরে নেমে আসে। দুই ভ্রুর মাঝখানে কুঁচকে যায়। শেষ রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে খোঁজ নিলাম, সেখানে কোন বেড নেই- অক্সিজেন নেই। খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেড নেই। বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই অবস্থা। ঢাকা নিয়ে যাওয়াটা হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু নিরুপায় হয়ে এ্যমবুলেন্স ডাকা হলো। স্ট্রেচারে লম্বালম্বি ভাবে শুয়ে আছে একটি নিথর দেহ। একজন মানুষ, অসুস্থ মানুষ। গন্তব্য কোথায় কেউ তা বলতে পারে না।

সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। কত অনুনয়বিনয় করা হলো। অন্তত ঘন্টা দু’তিনেক এখানে অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে রাখা যায় কিনা? কোথায়ও সিট খালি হলে সেদিকে মুভ করানো হবে। বৃথাই চেষ্টা। এক ঘন্টা গরমের মধ্যে হাসপাতালের বারান্দায় পড়ে রইল। কারোরই নাকি কিছু করার নেই।

এদিকে এ্যম্বুলেন্স একবার এনায়েতপুরের পথে, একবার বগুড়ার পথে- ঢাকার পথে ঘুরপাক খেতে থাকে। প্রতীক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত তখন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। গাড়িতে তার মা নির্বিকার বসে আছেন। অথচ ৪০টি বছর কী নিদারুণ মমতায় তিনি বুকের মধ্যে আগলে রেখেছেন। সে বুকে পাথর চাপা নীল বেদনা। মুখের ভাষা হয়ে গেছে মূক।

প্রকৌশলী জিয়াউল হাসান নাদিম, মিলনের ছোট ভাই ঢাকা থেকে জানায়, “এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজে একটি বেড খালি হচ্ছে। সেখানে যান। আমি ঢাকা থেকে রওনা দিচ্ছি।” হুইসিল বাজিয়ে এক নিমিষেই এ্যম্বুলেন্সখানা চোখের আড়াল হয়ে গেল। তখন তপ্ত দুপুর খাঁখাঁ রোদ্দুর।

অনন্য প্রতিভার অধিকারী এক তরুণ। ভালো রেজাল্ট করে সে রাজশাহী গভঃ কলেজে ভর্তি হয়। ‘দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে –‘ আচমকা এক দমকা হাওয়া এসে সব ওলট- পালট করে দেয়।

তবুও থেমে থাকেনি জীবন। হারনামানা এক জীবন কাহিনী। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে বই লিখে চলেছে। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা চারখানি। অনেকগুলো পান্ডুলিপি তৈরী আছে যা প্রকাশের অপেক্ষায়। তার সবগুলি বই সাহিত্যমান সমৃদ্ধ।

শরীরের সব অংশ তার নিস্তেজ হয়ে এসেছে। কিন্তু মাথাটা এখনো দারুণ সতেজ। বিশ্বকোষ- এনসাইক্লোপিডিয়া। এক বিশাল তথ্য ভান্ডার। কী নেই তাতে? ভেবে অবাক হই। এতো খবর সে রাখে কী করে? আমি মাঝে মধ্যে তার দারস্থ হই। ফোন করলেই সে বলবে “চাচা আপনাকে আগে একটা খবর দেই।” ‘সব খবর সবার আগে মিলনের কাছে।’

জীবনযোদ্ধা! এবার লড়ছে সে এক অদৃশ্য অনুজীবের বিরুদ্ধে। অম্লজান লেভেল বারবার নেমে আসে। জীবন প্রায় ওষ্ঠাগত। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তবু সে লড়ে যায়। কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান।

হঠাৎ মুঠোফোন বেজে ওঠে, “চাচা, ভাইয়ার করোনা রিপোর্ট এখন নেগেটিভ।” অসম্ভব প্রাণ শক্তি। মিলন দারুণ এক লড়াকু মানুষের নাম। আবারও প্রমাণিত হলো, সাহস মানুষকে এগিয়ে রাখে–


২২ জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
থানা রোড, সিরাজগঞ্জ সদর
সিরাজগঞ্জ- ৬৭০০