একটুখানি বাড়লে পানি, মালে হবে শেষ! হায়রে আমার স্বপ্নঘেরা মনমাতানো দেশ!!

311

ইঞ্জি: সরদার মোঃ শাহীনঃ আকাশে প্রচুর মেঘ। বিমানের ডানায় মেঘের ঝাপটায় মাঝারি সাইজের বিমানখানি বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে। আর সাথে কাঁপছে আমাদের দূর্বল চিত্ত। আকাশ ভর্তি শুধু মেঘ আর মেঘ। নীচে বার বার তাকাচ্ছি! ভূমির দেখা নেই; কেবল জল আর জল। ভারত মহাসাগরের অথৈ জলরাশি। ভয় না লেগে উপায় আছে! মাঝে মাঝে পেন্টি হঠাৎ ধপাস করে খানিকটা নীচে নেমে পড়ে। শংকায় আমার আর শোনিমের মায়ের চোখ বড় হয়। একেকটি ধপাসে আমার হাতের মুঠি সে শক্ত করে ধরে, আর আল্লাহকে ডাকে। একবার তো মহা ধপাস! ভাবলাম এই বুঝি সব শেষ। এসবে অবশ্য আমাদের শোনিমের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। জানালায় চোখ মেলে খুবই নিশ্চিন্ত মনে, আনন্দ চিত্তে এবং মহা সুখে পেন্ট আর মেঘের ধপাস ধপাস খেলা দেখছে শোনিম শাহীন।
অবশেষে নীচে খুব কাছাকাছি মাটির দেখা পেলাম। স্বস্তি ফিরে এলো মনে। আমরা মালদ্বীপের রাজধানী মালে দ¦ীপের পাশের দ্বীপে ল্যান্ড করলাম। গোধুলীর আলো তখনো ফুরিয়ে যায়নি। দ্বীপটি কেবল এয়ারপোর্টের জন্যে। খুব ছোট দ্বীপ, ছোট এয়ারপোর্ট। তবে মনটা জুড়িয়ে গেল এয়ারপোর্টে নেমেই। ঝকঝকে তকতকে পরিপাটি সাজানো এয়ারপোর্ট এক কথায় মনোমুগ্ধকর। ইমিগ্রেশন অফিসার দারুন স্মার্ট এবং খুবই তরিৎকর্মা। একেকটি পাসপোর্ট ভিসা স্ট্যাম্পিং করছেন মিনিটেরও কম সময়ে। দেশটি যে উন্নত তা বোঝার জন্যে এই ইমিগ্রেশনই যথেষ্ট। ট্রলি পেতে ঝামেলা নেই; লাগেজ পেতে বিড়ম্বনা নেই। আমাদের পৌঁছার আগেই লাগেজ এসে কনভেয়ার বেল্টে পৌঁছেছে। এই দৃশ্য ঢাকায় ভাবা যায় না।
ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ২৫০টি খুব ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ; পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশ। দেশের মোট আয়তন মাত্র ২৯৮ বর্গকিঃমিঃ। জনসংখ্যা মোটে চার লাখ। মাত্র ৫.৮ বর্গকিঃমিঃ আয়তনের রাজধানী শহর মালে। পায়ে হেঁটে মাত্র আধা ঘন্টায় শহরটিকে একবার চক্কর দেয়া যায়। শীপে চড়ে সমুদ্র থেকে দেখলে মনে হয় পূরো শহরটি একটি ভাসমান জাহাজ। তবে রাতের বেলায় বেশী সুন্দর লাগে। আলো ঝলমল রাজধানী শহরের বাতির আলো সমুদ্রের জলে চিকচিক করে রিফ্লেক্ট হয়। মনে হয় পানিতেও অসংখ্য তারার মেলা। রাতের লক্ষকোটি তারার আকাশ আর সমুদ্রের পানির সাথে তেমন কোন পার্থক্য বোঝা যায় না।
বড়ই অপরূপ দেখতে মালদ্বীপের রাতের সমুদ্র। এই সমুদ্রের মাছ ছাড়া এদের কোন প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। যে দেশে উল্লেখ করার মত ভূমিই নেই সে দেশে সম্পদ আর থাকবেই বা কি! পানির দেশ মালদ্বীপ। তবে মিঠা পানি নয়; সব পানিই লবনাক্ত। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে আধুনিক প্রযুক্তিতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত সুস্বাদু পানি প্রস্তুত করা হয়। প্রতিটি দ্বীপে আলাদা করে যেমনি পানি শোধনাগার আছে, তেমনি বিদ্যুৎ কেন্দ্রও আছে। নাই কেবল বিদ্যুতের লোডশেডিং। কৃষিজ বলতে একমাত্র ঝালমরিচ আর পেঁপে ছাড়া কিছুই নেই। চাল, ডাল, তেল, নুন, চিনি আসে বিদেশ থেকে। বলতে গেলে ১০০% পণ্যই আমদানী করতে হয়। তবে সরকার ভর্তূকি দিয়ে জনগনকে খুবই কমদামে চাল, তেল, চিনি সরবরাহ করে। সব দোকানেই কমদামে এসব পাওয়া যায়। যে দেশে ধানের একটি গাছও নেই, সেই দেশের মানুষ চাল কেনে খুবই সস্তায়; মাত্র ২৫ টাকা কেজি দরে। সরকার চাইলে কি না পারে!
আমাদের দেশের সরকার যেন কেমন! কোনদিনই কোনকিছু ঠিকমত চায়ওনি, পায়ওনি। আবার অনেক কিছুই ঠিক মত পারেও না, করেও না। ঠিক করতে করতে কোথায় যেন ভুল করে ফেলে; আবার ভুল করতে করতে কিভাবে যেন ঠিক করে ফেলে। টেকসই বলিষ্ঠ নেতৃত্বের বড় অভাব। মালদ্বীপের তুলনায় অনেক বড় দেশ আমাদের। চাইলে আমাদেরকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে একটি নিশ্চিন্ত জাতি, নিশ্চিন্ত দেশ গড়তে পারতো। সঠিক নেতৃত্ব দিলে আমরা যে পারি তার প্রমান তো গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ।
মালদ্বীপ একটি অনিশ্চিত দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা মাত্র এক মিটার। গ্রীণ হাউজ প্রতিক্রিয়ায় সারা পৃথিবীর সমুদ্রের পানি এক মিটার বেড়ে গেলেই পূরো মালদ্বীপ তলিয়ে যাবে; পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে দেশটি। পূরো মলোদিভীয়ান জাতি হবে উদ্বাস্তু।এই যে এত সমস্যা, দেশের অস্তিত্ব নিয়ে এত সংকট, এরপরও দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সমস্যা নিয়ে কারো কোন মাথাব্যাথা নেই, টেনশন নেই। দেশ গড়ায় সবাই ব্যস্ত; দেশপ্রেমে সবাই বিভোর।
দেশপ্রেমের মূল কারন এদেশের মানুষজন শিক্ষিত এবং মার্জিত। সবাই ভাল ইংরেজী জানে। জনসংখ্যার প্রায় পূরোটাই সুন্নী মুসলিম। কেবল ধর্মভীরু নয়, ধর্ম পরায়নও। কার্পেটে মোড়ানো চমৎকার সব মসজিদ; দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। তবে ইমাম সাহেবকে সাধারন মুসুল্লী থেকে আলাদা করা কঠিন। দাঁড়ি-টুপি ছাড়া টি-শার্ট গায়ের ইমামই বেশী। জামাতের নামাজে একামত দেন ইমাম নিজেই। জুম্মায় দেশীয় ভাষায় কোন বয়ান হয় না। মুসুল্লীগন সবাই মসজিদে এসে বসে বসে নিঃশব্দে কোরআন পড়ে। আযানের পর খুতবা হয় আরবী ভাষায় ইসলামিক মিশনের পাঠানো সাবজেক্ট অনুযায়ী। শুক্রবার সকালে এক পৃষ্ঠার টেক্সট পাঠানো হয়। ওদের পাঠানো নির্দেশনার বাইরে এক চুলও বলে না। সারা বছরের খুতবা কেন্দ্রীয় ইসলামী মিশন কর্তৃক নির্ধারিত থাকে।
দেশে ফিরে আসার আগের সন্ধ্যায় শীপে করে মালের খুব কাছের ভিলিগিলি দ্বীপে গিয়েছিলাম। খুবই ছোট ছিমছাম নিরিবিলি দ্বীপ; যেন এপাশ থেকে ওপাশ দেখা যায়। নিরাপত্তার ঘাটতি নেই মোটেও। পৌঁছার পরপরই চমৎকার মনোরম সাজে সজ্জিত মসজিদে মাগরিব পড়ে নিলাম। অন্ধকার নেমেছে কেবল। মসজিদের পাশেই নীরব, নির্জনা সী-বিচ। মোটে দুচারজনের দল পানিতে নেমে গলা ভিজিয়ে মহাসমুদ্র দেখছে। মহাসমুদ্রই তাদের সকল সুখ আহরনের একমাত্র কেন্দ্র। মাঝ সমুদ্র থেকে একেকটা গর্জন আসছে তীর পানে। আর অসহায়ের মত মিলিয়ে যাচ্ছে সী-বিচের মোটা দানা বালুর মাঝে।
ভিলিগিলি দ্বীপের কেন্দ্রে আছে মালদ্বীপের প্রধান টেলিকমিউনিকেশন টাওয়ার। ওটাকে পাশ কাটিয়ে ব্যাটারীচালিত গাড়ীতে করে দ্বীপের উল্টোদিকে গেলাম। এখানেও বিচ। বিচ তো সবখানেই। বিচের ধারে বড় বড় পয়েন্টে আগুন জ্বালিয়ে তরুন তরুনীর দল বারবিকিউ করছে। বড় বড় আগুনে পোড়া হচ্ছে মাছ আর মুরগী। এসবকে বলে মালয়ী পিকনিক; রাতের সী-বিচে দলবেঁধে সবাই পিকনিক করছে। ঘুরে ঘুরে সেসব দেখছিলাম। এক সময় এশার আযানের মধুর সুর ভেসে আসলো। এখানেও চমৎকার আলো ঝলমলে আরো একটি মসজিদ। যথেষ্ট সংখ্যক বাংলাদেশী মুসুল্লীও দেখলাম। শোনিমকে নিয়ে নিস্তব্দ মসজিদে জামাতের অপেক্ষায় বসে আছি। চারিদিকে মহাসাগরের ঝপাস ঝপাস পানির গর্জন। কিছুটা ভয়ও কাজ করছে মনের মধ্যে। সমুদ্রের এই গর্জনে মনের আধ্যাত্মিকতার অর্জন বাড়ে কি না জানিনা! তবে এটুকু বুঝেছি, নিরিবিলি এমনি পরিবেশে নামাজ পড়ার তৃপ্তিই আলাদা!
হাজার পঞ্চাশেক বাংলাদেশী কাজ করে এই দেশে। বেতন মন্দ পায় না; কম করেও মাসে বিশ হাজারের মত পড়ে। একজন ট্যাক্সিচালক দিনশেষে ১০০ ডলার আয় করে। অভাব শব্দটি এদেশে নেই। ঘরে রান্না করে না বললেই চলে। সব সময় রেস্টুরেন্টে খাবার খায়। একটি মটর সাইকেল আর ভাল একখানা মোবাইল হলে মালদ্বীপবাসীর আর কিচ্ছু লাগে না। রাস্তাঘাট পরিস্কার ঝকঝকে। বাংলাদেশীদের এখনো প্রচুর চাকুরীর সুযোগ আছে। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে দেশটি উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ।
বিশ্বব্যাংক কর্তৃক আমাদের দেশটিও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃত। এটা আমাদের সাম্প্রতিক অর্জন। তবে আমরা তো আরো বেশী অনেক আগেই অর্জন করতে পারতাম। স্বাধীনতার বয়স তো আর কম হলো না। আমাদের কী নেই! সব আছে; ছিল না শুধু সঠিক পরিকল্পনা মাফিক উন্নয়ন। এখনো যে ঠিকভাবে আছে সেটাও বলবোনা। এখনো সব জায়গায় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। যেটুকু ব্যবস্থাপনা আছে, সেটুকুও কেবল অব্যবস্থাপনায় ভরা। আমাদের দেশে জমি আছে বলে চাল আছে, ডাল আছে; তবে সাথে অভাবও আছে। ওদের জমি নেই বলে চাল নেই, ডাল নেই; আবার অভাবও নেই। কী অদ্ভুত ব্যাপার!
আমাদের আন্দোলন হয়, ধর্মঘট হয়; টেনশন তো সারাক্ষণই হয়। ওদের কোন কিছু নিয়ে কখনো টেনশন হয় না। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। আমরা বর্তমান প্রজন্ম শেষ হয়ে যাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তায়। চিন্তা আমাদের সকল কিছুকে ঘিরেই। স্বপ্নঘেরা মনমাতানো দেশ নিয়ে আমাদের কেবল চিন্তা আর চিন্তা! -লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা