একটি গাছ ও একটি পাখি

জিয়াউল হক মুক্তা:

শুক্রবারের রোম। বিকেল পাঁচটার পর থেকে শত শত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধি বের হতে লাগলেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সদর দফতর থেকে। দুই সপ্তাহ ধরে তারা দেশে দেশে সকল নাগরিকের নিরাপদ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য প্রাপ্তির অধিকারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এদের মধ্য থেকে আটজন সবার মতো বাঁ দিকে মেট্রো স্টেশন সিরকো মাসিমোর দিকে না গিয়ে জড়ো হলেন ডান দিকের বিশাল গাছগুলোর নিচে। এরা সবাই একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের বিভিন্ন জাতীয়, মহাদেশীয় ও সদর দফতরের প্রতিনিধি। দলনেতা ছাড়া তাদের কারোর বয়স চল্লিশ পেরোয়নি। তাদের সদর দফতর অক্সফোর্ডে হলেও দলনেতা হলেন ব্রাজিলের সামাজিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতাঋদ্ধ ষাটের কাছাকাছি একজন সংগ্রামী নারী— কাতিয়া মাইয়া।

কাতিয়া সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “কমরেডস, দুই সপ্তাহ আপনারা অনেক পরিশ্রম করেছেন। এখন আর কোন কাজের কথা নয়। এখন শুরু হচ্ছে আমাদের বার-হপিং অধিবেশন। আর এতে আমদের নেতৃত্ব দেবেন আমদের ইটালির সহকর্মী লুকা কিনোত্তি দ্য গ্রেট। এনজয় য়্যুর টাইম। চিয়ার্স কমরেডস!”

বার হপিং! শুনেই নেচে ওঠলো শুভ্রর মন! গত বছর এমন সময় লন্ডনের বার-হপিংয়ের দারুণ অভিজ্ঞতা তিনি এখনও ভুলতে পারেননি। সাধারণভাবে লন্ডনের আবহাওয়া নিয়ে কোনো অনুমান চলেনা। বছরের যেকোনো দিনের যেকোনো বিকেলে সেখানে একই সাথে থাকতে পারে ঝলমলে রোদ, তীব্র সুঁচালো বাতাস আর ঝিরঝির বৃষ্টি। সেদিন সন্ধ্যার পর তিনি বন্ধু পিয়াস ও মজিদের সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে কভেন্ট গার্ডেন ও আশপাশের এলাকা জুড়ে বিভিন্ন বার আর পাব আর নাইটক্লাবে ঘুরে ঘুরে জিন আর ব্র্যান্ডি পান করছিলেন পেগের পর পেগ। বাতাস আর বৃষ্টির ঠাণ্ডার সাথে জিন আর ব্র্যান্ডির উষ্ণতার এক ছেলেমানুষি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আধার হয়ে ওঠেছিল তাদের শরীর। অবশ্য এজন্য তাকে বিরক্তিকর এক ঠান্ডায় ভুগতে হয়েছিল বেশ কয়েকদিন। তবে এক রাতের বৃষ্টিস্নাত টিপসি ক্রলিংয়ের মনোরম অভিজ্ঞতার বিনিময়ে ঠান্ডায় প্রলম্বিত ভোগান্তিতে তিনি অনুতপ্ত নন মোটে।

সদলবলে তারা রওনা হলেন ভিয়েলে গুইডো ব্যাকসেলে ধরে, হাতের ডানে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সদর দফতর রেখে, রোমের সবচেয়ে সবুজ এলাকাগুলোর একটির মাঝ দিয়ে। এরপর ভিয়া ডি শান্তা কর্নেলিয়া হয়ে আরো অনেকটা হেঁটে তারা চলে গেলেন শহরের জমজমাট এলাকায়। ইউরোপের বাসাবাড়ির জানালায় ছোট ছোট টবে সাজানো রঙবেরঙের ফুলের সমাহার যেকোনো পথিকের জন্যই ক্লান্তিহরা। সেজন্য অনেকটা পথ হেঁটেও শুভ্র কিংবা তার সহকর্মীগণ কোন ধরনের ক্লান্তি অনুভব করছেন না।

প্রথমে তারা বসলেন একটি পাবের বাইরের দিকে, পথের ধারে, লোকচলাচল বেশ ভালে দেখা যায় এমন জায়গায়। তখনও সূর্যাস্ত হয়নি। শুভ্রর এক পাশে বসেছেন জাপানের সহকর্মী অচিন্ত্যনীয় বিস্ময়কর সুন্দরী ইউয়া, অন্য পাশে কাতিয়া। লুকার নেতৃত্বে মেনু থেকে তারা নির্বাচন করলেন ইতালির বিশেষ স্পার্কলিং হোয়াইট ওয়াইন— গ্লেরা। কয়েক বছর আগেও এর নাম ছিল প্রোজেকো; বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে পরে প্রোজেকোর অনেক ধরন বের হওয়ায় আদি প্রোজেকো নিজের নাম পাল্টে নিয়ে হয়েছে গ্লেরা।

চিয়ার্স রোম— বলে সবাই গ্লাসে গ্লাস ঠুকে বুদ্বুদময় গ্লেরায় চুমুক দিলেন। ছোট ছোট দলে তারা মেতে উঠলেন গল্পগুজবে। কাতিয়া শুভ্রকে বললেন—

— চলো খেলি।
— কী খেলবে?
— আমি একটি শব্দ বলবো, তুমি সেটার বিপরীতে প্রাসঙ্গিক একটি শব্দ বলবে। এরপর যার যার শব্দের পথ ধরে পালাক্রমে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে সাজিয়ে এগুতে হবে। এর শেষটি খুব মজার।
— আচ্ছা! দারুণ তো!
— শুরু করি?
— করো।
— গাছ।
— পাখি।
— মাটি। গাছ মাটিতে থাকে।
— আকাশ। পাখি আকাশে ওড়ে।
— বন্ধন। গাছ মাটিতে আবদ্ধ।
— মুক্তি। আকাশে পাখি বন্ধনহীন।
— সবুজ। আমাদের গাছের রং নরম।
— নীল। আমাদের পাখি ওড়ে কোমল আকাশে।

ছেলের বয়সী শুভ্রর সাথে কাতিয়া মেতে উঠলেন শব্দের ও অর্থের এক গভীর-নিবিড় খেলায়। সকলের হট্টগোলের মধ্যে তারা উভয়ে জলতলদেশের মাছের মতো সাঁতরাতে লাগলেন। একসময় তাদেরকে আর নিজ নিজ শব্দের প্রাসঙ্গিকতা উল্লেখের বা ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন হলোনা। একটি শব্দের উচ্চারণই যথেষ্ট; প্রতিপক্ষ নিজেই সে শব্দের অর্থকরণে সক্ষম।

— স্থিতি।
— গতি।
— মিতি।
— অতি।
— আরাম।
— আনন্দ।
— নিরাপত্তা।
— স্বাধীনতা।
— সঙ্গী।
— বন্ধু।
— ঘর।
— পথ।
— পথ থেকে ফেরা।
— ফেরা থেকে ওড়া।

তারা হেসে ফেললেন একসাথে। কারণ শব্দ তার অন্তর্গত ক্ষমতায় তাদেরকে উপসংহারে পৌঁছে দিয়েছে। তারা একমত হলেন, ঘর থেকেই যাত্রার শুরু। তারা একমত হলেন, যাত্রাপথে যেতে যেতে ক্লান্তি নিরসনে তাদের ঘরে ফিরতে হয়। গাছ আর পাখি যেমন ওতপ্রোত সম্পর্কিত, বন্ধন আর মুক্তিও তেমন। এদের আলাদা করা যায়না।

আবার তারা সবার সাথে হইহল্লায় মেতে ওঠলেন। চতুর্থ রাউন্ড শেষে লুকা ঘোষণা করলেন এখানকার পর্ব শেষ; এবার অন্য কোথাও। প্রত্যেকে যার যার বিল ও টিপসের একটি রাউন্ড ফিগার টেবিলে রেখে বেরিয়ে পড়লেন।

বার-হপিংয়ের দ্বিতীয় পর্বে তারা ঢুকলেন একটি বারে। তবে কেউ লিকার নিলেন না; ওয়াইন চললো, হোয়াইট। অবশ্যই ইটালিয়ান হোয়াইট ওয়াইন; এরা প্রত্যেকে স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান করেন। স্মোকি অ্যান্ড স্পাইসি নোটের ফিয়ানো তাদের হৃদয় জয় করে নিলো।

তৃতীয় পর্বে ঢুকলেন একটি জমজমাট লাইভ মিউজিক বারে। একদিকে কিবোর্ড ও ড্রাম বাদকের মাঝে গিটার হাতে গাইছেন একজন অষ্টাদশী মায়াবিনী। এক কোনে বড় মনিটরে চলছে ইউরোপিয় ফুটবল। আর এক কোনে বিলিয়ার্ড টেবিল। কিন্তু তারা বসলেন বারটেন্ডারের সামনের ডেস্কের উঁচু টুলগুলোর উপর। শুভ্র বললেন, কমরেডস, য়্যু নিড টু রেসপেক্ট দ্য ইয়াংগেস্ট ওয়ান। সমস্বরে তার সহকর্মীগণ বললেন, ইয়েস, ইনডিড। শুভ্র প্রশ্রয় পেয়ে বললেন, মে উই গো ফর দ্য ইয়াংগেস্ট লিকার অব আওয়ার টাইম দ্য গ্রেট সামবুকা? লুকা বললেন, ইয়েস, এ গ্রেট চয়েজ দো ইটস মাচ বেটার অ্যাজ ডেসার্ট।

মৌরিগন্ধা তীব্র মিষ্টি লিকার সামবুকা জনপ্রতি তারা দুটোর বেশি নিলেন না। বারের গান ও খেলার হট্টগোলকে রসালো করে তুললো সামবুকার স্বাদ, গন্ধ আর বয়স নিয়ে তাদের পরোক্ষ রসিকতা।

খানিক পর সেখান থেকে বেরিয়ে ভিয়ালে জিয়ত্তো ধরে তারা অনেকটা হেঁটে চললেন ডিনার করতে। দ্য গডফাদার রেস্টুরেন্টের সুপরিসর গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে তারা নেমে গেলেন আন্ডারগ্রাউন্ডে। এখানকার সাজসজ্জা দেখে সবার চক্ষু চড়কগাছ। সব কক্ষের সব দেয়াল মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত রকমারি ওয়াইন আর লিকারের বোতলে সাজানো; খালি বোতলের ডেকোরেশন নয়, বিভিন্ন সময় তৈরি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ওয়াইন-লিকারের পূর্ণ বোতল তাকে তাকে সারি সারি বিন্যস্ত। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তারা বসলেন। সবাই কমবেশি টিপসি।

ইতালিয় পানিয়ের ধারাবাহিকতায় তারা অর্ডার করলেন ট্র‍্যাডিশনাল ইতালিয় ডিনার। ভেজিটারিয়ান ও নন-ভেজিটারিটারিয়ান উভয় গ্রুপ তৃপ্ত হবে এভাবে তারা নন-ভেজিটারিয়ান কোর্স ঠিক করলেন। অনেকটা লো ক্যালরিও বটে। অ্যাপিরিতিভো হিসেবে নিলেন ফ্রুটি অ্যান্ড ফ্লোরাল নোটসের সাথে মিনারেল ক্যারেকটারের হোয়াইট ওয়াইন ফালানজিনা। আন্তিপাস্তি হিসেবে চিজ আর রুটির সাথে সালামি, টেবিলে তো ব্ল্যাক পিপার আর অলিভ অয়েল রয়েছেই। প্রিমি ও সিকুন্দি হিসেবে যথাক্রমে ঞিয়ক্কি ও মিক্সড সিফুড, সিকুন্দির সাথে কুন্তর্নি হিসেবে সবুজ সব্জি। ইনসালাতা ড্রপ করে তারা পছন্দ করলেন চিজ অ্যান্ড সিজনাল ফ্রুটসের ফর্মাজি-ই-ফ্রুটা। ডোলচে ও ডিজেসটিভো বাদ দিয়ে সবশেষের জন্য অর্ডার করলেন ব্ল্যাক কফি।

ফালানজিনোয় চুমুক দিতে দিতে তারা আগের গল্পের রেশ টানছিলেন। শুভ্র কাতিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, শোন, তোমার গাছে একটি পাখি আছে। পাখি অবশ্য একা থাকে না, কিন্তু সে পাখিটি একা, প্রকৃতির ব্যতিক্রমের মতো। একদিন এক তীব্র ঝড়ে গাছটি উপড়ে গেল। তোমার পাখিটির তখন কী হলো? কাতিয়া হেসে ফেললেন, কেন গাছ কি একটি? পাখিটি অন্য গাছে বাসা বাঁধবে!

ইডিয়ট— সহসা সহাস্য সংলাপ শুনে চমকে পেছনে তাকালেন শুভ্র। পরিপাটি ভদ্রলোকের মুখাবয়ব দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট; দেখা যাচ্ছে ভদ্রমহিলার পৃষ্ঠদেশ। সে পড়েছে ইতালিয় লোকনৃত্য তারানতেল্লার পোশাক। উপরের অংশ সাদা; উভয় বাহুমূল দৃশ্য হলেও ক্লিভেজ ঢাকা; সুপরিসর শুভ্র কাঁধের অনেক নিচে রঙিন ঝালর। ফ্রকের মতো নিচের অংশ কালো, তাতে লাল-সাদা-সবুজ-হলুদ নকশার প্রশ্বস্ত পাড়। জুতো বা পা দেখা যাচ্ছে না। পিঠে সমবাহু ত্রিভূজের তিন কোনার মতো তিনটি তিল। দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন শুভ্র।

শুভ্র তার ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন চুপচাপ। গল্পগুজবে মন নেই। মাঝেমাঝে ক্রিপসি রুটিতে গভীর মনযোগের সাথে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল ঢেলে আলতো কামড় দিচ্ছেন। প্রিয় চিজের দিকে মনযোগ নেই। মনে মনে বলছেন, তোমাকে আমি চিনবো না? আমার ভালোবাসা এই তোমাকে কতোশতবার নিরাভরন করেছি ক্যাম্পাসে আমার রুমে। নিরাভরণ তোমাকে দেখেছি চুপচাপ কতোশত ঘণ্টা! যখন ছুঁয়েছি নিবিড়, যখন আদর করেছি গভীর, স্পর্শকাতর সাপের মতো তুমি মুচড়েছো নিজেকে। তোমার শরীরের কোন বিন্দু আমার অচেনা? তোমার পিঠের সমবাহু ত্রিভুজের তিল-ত্রয়ীর মতো তোমার ডান স্তনের ওপরের দিকে কাঁধের নিচে একই রকম আরও তিনটি তিল আছে। এগুলোতে আমি কতো লক্ষ চুমো দিয়েছি তার হিসেব আছে? এদের আমি ভুলি কী করে! তোমার কিন্নর কন্ঠ আমি ভুলি কী করে! তোমার মৌরিগন্ধ? তোমার ত্বক আর জিহ্বার স্বাদ? তুমি আমার মনিকা। তুমি আমার।

মি সারাবে ডি গ্রান্দে আইউতো সে তু প্রেনদেসি ই ফিওরি— শুনে মনযোগ বিঘ্ন হলো শুভ্রর। তিনি ইতালির ভাষা জানেন না। কিন্তু বুঝলেন যে ছেলেটি বলছে তোমরা যদি ফুলগুলো নাও তবে আমার খুব উপকার হবে। রোমের ব্যস্ত সড়কের ফুটপাতে সর্বক্ষণ পুলিশের ধাওয়া খাওয়া বাংলাদেশের হকারদের মতো রেস্টুরেন্টগুলোতে গোলাপের তোড়া বিক্রি করতে আসা ছেলেগুলো ততোটা অমানবিকতার শিকার হন না। লুকা কেবল বললেন, গ্রাসিয়ে। ধন্যবাদ। শুভ্র ইঙ্গিতে ছেলেটিকে দাঁড়াতে বললেন, ওয়ালেট থেকে দশ ইউরোর একটি নোট বের করে তাকে দিলেন, তারপর পেছনের টেবিল দেখিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বললেন, ওখানে দিয়ে এসো।

সহকর্মীদের এক্সকিউজ মি বলে ছেলেটির সাথে সাথে তিনি পেছনের টেবিলে গেলেন। বললেন, ক্ষমা করবেন আমি আপনাদের পছেনের টেবিলে আছি সহকর্মীদের সাথে। পনের দিন বাংলা শুনিনি। বলিনি। আপনাদের মুখে বাংলা শুনলাম একটু আগে। এজন্য দয়া করে যদি ফুলগুলো গ্রহণ করেন, খুব খুশি হবো।

ভদ্রলোক উৎসুক হয়ে শুনছিলেন। ভদ্রমহিলার চোখ বিস্ফোরিত। হ্যাঁ, তিনি মনিকা। ভদ্রলোক বললেন, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। ভদ্রমহিলাকে বললেন, নাও মনিকা। শুভ্র ছেলেটিকে ইঙ্গিত করলেন। ভদ্রলোক বাধা দিলেন, না, না, আপনিই দিন। আমি?— শুভ্র ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন। ভদ্রলোক জবাব দিলেন, হ্যাঁ আপনি। শুভ্র গোলাপের তোড়াটা এগিয়ে ধরলেন মনিকার দিকে। বিস্ফোরিত চোখেই মনিকা তা গ্রহণ করলেন; ধন্যবাদ না দিয়ে বসে পড়লেন। তাদের তিনজনকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলেন ফুল বিক্রেতা যুবক।

ধন্যবাদ— বলে ভদ্রলোক জানালেন তিনি আসাদ। রোমে একটি ইতালিয় বায়িং হাউজের বাংলাদেশ চ্যাপ্টার দেখাশোনা করেন। মনিকা তার স্ত্রী। এদেশে তার কাজ করার অনুমতি এখনও মেলেনি। কমিউনিটি ওয়ার্ক করেন ছিটেফোটা।

শুভ্র তার নিজের পরিচয় ও রোমে আসার কারণ সামান্য বলে নিজের টেবিলে চলে এলেন। মনিকা একটি কথাও বলেননি তার সাথে।

আনমনে নামকাওয়াস্তে খাচ্ছেন শুভ্র। মাঝে মাঝে সহকর্মীদের সাথে হু-হ্যাঁ করছেন। কাতিয়া জিজ্ঞেস করলেন, শুভ্র, সব ঠিক তো? নিশ্চয়ই— বলে বিব্রত ভঙ্গিতে হাসলেন শুভ্র।

অনেকক্ষণ পর কফি পর্বের সময় তাদের টেবিলে এলেন আসাদ ও মনিকা। তারা চলে যাচ্ছেন। কাতিয়ার দিকে তাকিয়ে আসাদ ইংরেজিতে বললেন, আমরা কি তোমাদের সহকর্মী শুভ্রর সাথে আমাদের মাতৃভাষায় একটু কথা বলেতে পারি? কাতিয়া বললেন, অবশ্যই পারো। আসাদ জিজ্ঞেস করলেন—

— কবে যাচ্ছেন দেশে?
— আগামীকাল।
— তার মানে আজই শেষ রাত।
— হ্যাঁ।
— উইকেন্ডে আপনাকে আসতে বলতে চাচ্ছিলাম।
— অনেক ধন্যবাদ। আবার যদি কখনও আসি, নক করবো।
— জ্বি, করবেন। ভালো থাকবেন।
— আপনারাও।

পার্কিং পর্যন্ত আমি দশ মিনিট হাঁটতে চাচ্ছি না। তুমি কি গাড়িটি নিয়ে আসবে? আমি ফ্রেশরুম হয়ে উপরে গেইটে এসে দাঁড়াচ্ছি।— শুভ্রর সামনে এই প্রথম কথা বললেন মনিকা। তিনি ফ্রেশরুমের দিকে পা বাড়ালেন। আচ্ছা আসো— বলে গাড়ি আনতে গেলেন আসাদ। মনিকা ফিরলেন এক মিনিটেরও কম সময়ে। শুভ্রদের টেবিলের পেছনে দাঁড়িয়ে রইলেন চুপচাপ। শুভ্র বুঝলেন, তার কাছে গেলেন। মনিকা তার চোখে চাইলেন কাতর হয়ে, বললেন—

— তুমি তাহলে চাকরি-বাকরি করছো।
— হ্যাঁ।
— একসময় তোমাকে কতো অনুরোধ করেছিলাম সামান্য হলেও একটা চাকরি নাও।
— হ্যাঁ।
— তুমি নাওনি।
— হ্যাঁ।
— তুমি বিপ্লব করতে গিয়েছিলে।
— মনিকা, আমি …
— একটি সামান্য চাকরি নিলে তোমার বিপ্লবের মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত না।
— তা যেত না। অমি …
— আমি কতো কেঁদেছিলাম। তোমার পায়ে ধরেছিলাম।
— আমি তোমার সাথে অন্যায় আচরণ করেছি।
— তুমি স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলে, আমি শপথ করেছিলাম যে তোমার স্বাধীনতার বাধা আমি হবো না।
— হ্যাঁ।
— শুধুমাত্র কোনক্রমে রাত্রিযাপনের মতো একটি জায়গার জন্য তোমাকে চাকরি নিতে অনুরোধ করেছিলাম। বলেছিলাম আমার রেজাল্ট হলে আমিই একটি চাকরি জোগাড় করে নেব।
— হ্যাঁ, তুমি বলেছিলে।
— তোমার শিশুতোষ বিপ্লবীপনা তোমাকে সে সামান্য আপোষটুকু করতে দেয়নি।
— দ্যাট ওয়জ মাই ইনোসেন্স।
— পরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়ার সময় সে ইনোসেন্স কোথায় ছিল?
— এছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না।
— হ্যাঁ, কিন্তু কেবল আমার জন্য তোমার কিছু করার ছিল না। আমাকে বিয়ে দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হলো।
— আমি পরে জেনেছি।
— সব এক সপ্তাহের মধ্যে হলো। আমি তোমাকে খুঁজে পাইনি; যোগাযোগ করতে পারিনি।
— সরি।
— সরি বললে সব দায় শোধ হয় না লক্ষ্মিটি।
— না, হয় না।
— বাদ দাও। বউ-বাচ্চার কথা বলো।
— ওসব হয়ে ওঠেনি যে!
— বলো কী! কেন হয়ে ওঠেনি?
— ইচ্ছে করেনি।
— তোমার ইচ্ছের স্বৈরতন্ত্র বরাবরই খুব বাজে।
— হ্যাঁ মনিকা, খুব বাজে।

প্রায় মিনিট খানেক তারা দু’জন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর শুরু করলেন শুভ্র—

— মনিকা!
— বলো।
— মনিকা, তোমার সাথে সাথে হারিয়ে গেছে আমার স্বাধীনতা, আমার বিপ্লব।
— আমার শুভ্রসোনা, তোমাকে আমি কী বলবো এখন?
— তুমি কী বলবে? তোমার তো কোনো দোষ নেই!
— এখানে দোষের কোনো ব্যাপার নেই। এ হয়তো আমাদের নিয়তি।
— আমাকে ক্ষমা কোরো তুমি। আমি একটি ইডিয়ট।

মনিকা চুপ করে রইলেন। বললেন—

— এখন যাই?
— যাও।
— আবার এলে আগে জানিও।
— আসবো শিগগির। জানাবো।
— একটি চুমো দেবে? একসময় যেভাবে দিতে?
— প্লিজ মনিকা! এমন কোরোনা।
— কেন করবোনা?
— আমার কলিগরা আছেন।
— এসব দেশে এটা কোনো ব্যাপার না।
— তবুও।
— আমি তোমাকে হাগ করতে পারি?
— পারো।

মনিকা আলতো করে শুভ্রকে জড়িয়ে ধরলেন, গন্ধ নিলেন প্রাণভরে। শুভ্র তার পিঠে হালকা চাপড় দিয়ে বললেন, যাও সোনা। ভালো থেকো।

মনিকা আর্দ্র চোখে হেঁটে গেলেন সিঁড়ির দিকে। শুভ্র এসে বসলেন নিজের চেয়ারে। কফি এখনও গরম আছে; হালকা চুমুক দেয়ার পর খেয়াল করলেন সকহর্মীদের কেউ কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছেন উৎসুক চোখে। কাতিয়া জিজ্ঞেস করলেন— মেয়েটি কে? অবশ্য জবাব নাও দিতে পারো। অ্যাপোলোজিস।

শুভ্র খুব নরম করে বললেন, ও ছিল একটি গাছ। গাছটি ছিল একটি নিঃসঙ্গ বোকা পাখির আশ্রয়। গাছটি উপড়ে গেছে ঝড়ে। তারপর পাখিটি মরে গেছে।

২৩ নভেম্বর ২০২২; খোলাদ্বার কারাগার; ঢাকা।