একজন মানবিক ডিসির অমানবিক বিড়ম্বনা!

লুৎফর রহমান হিমেলঃ গত কয়েকদিন ধরে ফেসবুকের নিউজফিডে একটি নিউজ ঘুরছিল। প্রথম কয়েকদিন মনযোগ দেইনি। পরে দেখি, অনেকের স্ট্যাটাস থেকে নিউজটি ছোট ছোট কয়েকটি নিউজপোর্টালেও নিউজ আকারে প্রকাশিত হল। এরপর আস্তে আস্তে দেখি নিউজটি মূলধারার পোর্টালেও চলে এল। এমনকি এখন জনপ্রিয় দৈনিকগুলোতেও ছাপা আকারে প্রকাশ হওয়া শুরু হয়েছে। জাতীয় দৈনিকের কয়েকটিতে এ নিয়ে সম্পাদকীয়ও প্রকাশিত হয়েছে। সবগুলোই আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়লাম।

ঘটনাটি ময়মনসিংহের সদ্যবিদায়ী জেলা প্রশাসক মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকীকে নিয়ে। তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না, জানি না। তাকে নাকি রাজকীয় সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। ওই জেলা প্রশাসকের গায়েও একটি রাজার পোশাক দেখা গেছে, এই পোশাকই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যা কিনা একটি যাত্রাপালার দল তাকে সাময়িকভাবে পরিয়ে দিয়েছিল। এই পোশাকটির দিকে আঙুল তুলে অনেকে বলছেন, ওই জেলা প্রশাসক রাজসিক সংবর্ধনা নিয়েছেন। খোঁজ করে যতটুকু জানতে পারলাম। পোশাকটি দুই বা আড়াইশ টাকায় ভাড়া এনেছিল স্থানীয় সংস্কৃতিমনা তরুন-যুবারা।

এর বাইরে জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার এক ব্যক্তি ডিসিকে একটি সোনার কোটপিন উপহার দিয়েছেন। ওই উপজেলায় এককালে এই ডিসি ইউএনওর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ ছাড়া সংবর্ধনাগুলোতে শুধু ফুল, কেউবা কলম বা পাঞ্জাবি উপহার হিসেবে দিয়েছেন।

সুতরাং এ পর্যন্ত মোটা দাগে তিনটি বিষয় পেলাম।

ক. ৩৫টি সংবর্ধনা, ফুল, কলম, পাঞ্জাবি,
খ. একটি সোনার পিন, যার মূল্য ১৪-১৫ হাজার টাকা। এবং
গ. রাজার পোশাক।

এ পর্যন্ত পড়ার পর ওই ডিসি সম্পর্কে খবরাখবর নেওয়ার আগ্রহটা আরও বেড়ে গেল। বুঝতে পারলাম, বিষয়টা নিয়ে বড় একটা ভুল বুঝাবুঝি হয়ে গেছে। যেখানে মানবিক কাজের আলোচিত এই ডিসি প্রশংসা পাবার কথা, সেখানে পাচ্ছেন সমালোচনার তিক্ততা। এরপরই ময়মনসিংহের স্থানীয় সাংবাদিক ও সুধীজনের কাছে খোঁজ নিলাম।

স্থানীয়রা যা জানালেন তাতে আমার ধারণা মিলে গেল। স্থানীয় কিছু অসাধু সাংবাদিক এই রাজপোশাক বিড়ম্বনার জন্য দায়ী। তারাই ভুল বার্তাটি ছড়িয়ে দিয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী সাড়ে ৩ বছর ময়মনসিংহে ছিলেন। তিনি ছিলেন একেবারে সংস্কৃতিমনা একজন মানুষ। কবি সাহিত্যিকদেরই তিনি সবার আগে কাছে টেনে নিতেন। যে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি সপরিবারে হাজির থাকবেন, এটা ছিল অলিখিত নিয়ম। জঙ্গিবাদ, মাদক, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি সামাজিক সচেতনতা বিষয়ে তিনি একের পর এক স্কুল কলেজে ছেলেমেয়েদের নিয়ে অবিরাম সভা করেছেন। সাড়ে ৩ বছরে কেউ তার বিরুদ্ধে কোনো দূর্নীতির অভিযোগ করেননি। ব্রহ্মপুত্রপাড়ের সংস্কৃতিতে যে কোনো নবাগত কর্মকর্তাকে ও বিদায়ী কর্মকর্তাকে আন্তরিকতার সাথে বিদায় বা বরণ করে নেয়ার রেওয়াজ আছে। এ জন্যই মুস্তাকীম ফারুকীও বিদায়কালে বেশ কিছু বিদায় অনুষ্ঠানের বিড়ম্বনায় পড়েছেন। তবে ৩০-৩৫ টি না হয়ে এটি শতাধিক হতে পারতো। তার জনপ্রিয়তা তেমনই ইঙ্গিত দেয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পুরো জেলা প্রশাসন কাঠামোর বিচারে ৩০/৩৫টি বিদায় সংবর্ধনা কোনো সংখ্যাই নয়। ময়মনসিংহে উপজেলার সংখ্যাই ১৩টি। এছাড়া জেলা প্রশাসক জেলা ক্রীড়া সংস্থা, মুসলিম ইনস্টিটউট, প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠনের পদাধিকার বলে সভাপতিও। এসব সংগঠন সকল ডিসিকে বরণ করে এবং বিদায়ও দেয়।

‘রাজার বেশে বিদায়’ বলে যে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে, সেটি পুরোপুরি ভুল। ওই অনুষ্ঠানটি কোনো বিদায় অনুষ্ঠানও ছিল না। ময়মনসিংহের তরুণদের নাট্য সংগঠনের অনুষ্ঠান ছিল ওটি। জেলা প্রশাসক অনসাম্বল নামের ওই নাট্য সংগঠনের সদস্য হয়েছিলেন। তরুণ নাট্যকর্মীরা তাকে বরণ করে নিয়ে শখ করে ও অতি আবেগে জেলা প্রশাসককে রাজার পোষাক পরিয়েছিল। মূলত ওই ছবিটিই কাল হয়েছে তার জন্য। অথচ তিনি জনগণের সাথে মিশে ছিলেন সাধারণের মতো। প্রতিটি ঈদে প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে ঈদের দিন কাটাতেন। শিশুরা তার বাসায় চলে আসতো সময়-অসময়ে। তিনি তাদের খাওয়াতেন। নিজের হাতে উপহার তুলে দিতেন।

ওয়াসিম খান নামের একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ময়মনসিংহবাসীকে ভালবাসাটাই ডিসি সাহেবের কাল হল। একজন বিদায়ী ডিসির কাছে স্বার্থ হাসিলের তো কিছু থাকে না। তাহলে মিডিয়া কেন এমন লিখছে? এরপর যে ডিসি আসবেন, তাকে কি এভাবে জনবিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে না? নতুন ডিসি তো জনগণের সাথে মেশার এই ‘ভুলটি’ আর করবেন না।

আমরা নিকট অতীতে দেখেছি, কোনো জনবন্ধু ইউএনও বা পুলিশ সুপারের বদলি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ লোকজন মানববন্ধন এমনকি বিক্ষোভও করেছেন। বরগুনার এক পুলিশ সুপারের জন্য জেলার ‘সর্বস্তরের জনসাধারণের ব্যানারে’ বিশাল এক মানববন্ধন হয়েছিল। স্থানীয় প্রায় ৫০টি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা একত্র হয়ে শহরে এসপির বদলির আদেশ বাতিলের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিপির কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিল।

আমাদের আমলারা এমনিতেই নিজেদের জনসাধারণ থেকে দুরে রাখেন। ক্ষমতার খোলসে ঢুকিয়ে দেন। নিজেদের ভাবেন ‘প্রশাসক’। ফারুকীদের মতো দু’একজন কর্মকর্তা যখন জনগণের কাছাকাছি চলে আসেন, তাদের আমরা ভালো চোখে দেখতে পারি না।

অথচ এই খবরগুলোকে হাইলাইট করা যেত। অনেক নেতিবাচক খবরের ভীড়ে এই খবরগুলো হতে পারত সবাইকে উজ্জীবিত করার মন্ত্র।

একজন ডিসি ফারুকী রাজার পোশাক পরেছেন। সেটিও কি তার অপরাধ? নাটকের দলকে উৎসাহ দিতে তিনি যে নিজেই রাজা সেজেছেন, এখানে তো তাকে সাধুবাদ দেবার কথা। নাকি আমরা ভিলেনদের দেখতে দেখতে প্রকৃত রাজাকে দেখার চোখ হারিয়ে ফেলেছি! যে লোক হৃদয়ে নিজ সংস্কৃতিকে লালন করে, সে তো প্রকৃত অর্থেই রাজা। পোশাকে কিইবা আসে যায়!-লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট। বার্তা সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।