একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ফেরারিঃ ১৩

8

সাইফুল ইসলাম শিশিরঃ সাঁঝের বেলা। এখনি আঁধার ঘনিয়ে আসবে। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। সবগুলো হাঁস বাড়ি ফিরেছে কিনা তা গুণে গুণে দেখছে জহুরা বেগম। এককুড়ি এক, এককুড়ি দুই, এককুড়ি তিন–। মিলে গেলে ভালো। না হলে আবার ঘাট পাড়ে ছুটে যাবে। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ডাকতে থাকবে, আয় তৈ তৈ- আয় তৈ তৈ। এটা জহুরার প্রতিদিনের রুটিন বাঁধা কাজ।

জহুরার বয়স এখনো দুইকুড়ি পুরেনি। এর মধ্যেই দুবার বিয়ের পীড়িতে বসেছে। প্রথম বিয়ে টিকেনি। তার অমতে দ্বিতীয় বিয়ে। স্বামীর বয়স বেশি ছিল। উপরন্ত সে ছিল থাইসিস’র রোগী। দু’বছর না ঘুরতেই সে দায়মুক্তি নিয়ে পরপারে চলে গেছে। বংশের বাতি জ্বালাতে পারেনি অথচ ক্ষয় রোগের ভাগিদার করে গেছে জহুরাকে।

ঘর না টিকলেও জয়ান ঘরামি, সে ছিল জহুরার বিয়ের স্বামী। তার ঔরসজাত একমাত্র মেয়ে মইফুল। মেয়ের কথা ভেবে জয়ান ঘরামিকে সে আজও ভুলতে পারেনা। নাকফুল এখনো খোলেনি। ঘ্যাগের উপর যেন ‘তারাবাতি’ এখনো ঝিলিক দেয়।

জহুরা জানায় তার তিনকুড়ি হাঁস ছিল। এখন দুইকুড়ি আঠারোটা আছে। ইতোমধ্যে দুটো শিয়ালের পেটে গেছে। সাধারণত ঘাট পাড় থেকে হাঁসগুলো লাইন ধরে থপথপ করে পা ফেলে, হেলেদুলে এগিয়ে চলে, প্যাঁকপ্যাঁক আওয়াজ তুলে। খোপে তোলার আগে মাটির সানকিতে পানি- খুদকুঁড়া খাওয়ায়। কুড়ির বেশি গুণতে জানেনা ঠিকই কিন্তু হাসের উপর তার অনেক অবজারভেশন আছেঃ
১. হাঁস কাঁদা- পানিতে থাকে কিন্তু হাঁসের গায়ে কোন কাদা লাগে না। ২. সানকিতে দুধ পানি মিশিয়ে দিলে হাঁস পানি থেকে শুধু দুধ টুকু আলাদা করে শুষে খায়।
৩. হাঁস সারাদিন পানিতে থাকে অথচ হাঁস খাল- বিল, নদীর পানি খায়না। শুধু সকাল বেলা পুকুরে নামার সময় পানি দিয়ে কুল-কুচা করে।

একটু আগেই আবু মিয়া লণ্ঠন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। আলো আঁধারিতে দেখা যাচ্ছে বারান্দায় কে যেন বসে আছে। ডাক দিতেই দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায় মিন্টু। একি!আজ মিন্টুকে চেনাই যাচ্ছে না। থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরা। গায়ে জলপাই রং এর শার্ট। শার্টটা একটু কেমন কুঁচকে গেছে। ঠিক যেন গুর্খা সোলজার। গলায় দুতিনটা মেডল ঝুলছে। হাতে ধরা কিছু কাগজ। এ এক অন্য মিন্টু। এই বেশে মিন্টুকে দেখে আমি বিস্মিত হচ্ছি। ব্যাপার কী? যা শুনলাম তাতে শুধু অবাক হবার পালা। অপার বিস্ময়!

আজ ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবস। মিন্টু আজ সদরে গিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মেহেরপুর জেলা ইউনিট কমান্ড, সুভেনির হিসেবে ১টা গেঞ্জি দিয়েছে। জেলাপ্রশাসন একখানা শীত বস্ত্র ও এক প্যাকেট তৈরী খাবার দিয়েছে। আজ সে ভীষণ খুশি, আপ্লুত, গর্বিত। বছরে দুটি দিনের জন্য সে মুখিয়ে থাকে। ২৬ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বর।

‘৭১ সাল। অগ্নিগর্ভ- উত্তাল সেদিনের পূর্ব পাকিস্তান, আজকের বাংলাদেশ। ১৪/১৫ বছরের রাখাল বালক মিন্টু। আম বাগানের ধারে স্থানীয় যুবকরা ডামি বন্দুক নিয়ে ট্রেনিং নিচ্ছে। এটা দেখে সে ভীষণ ভাবে আকৃষ্ট হয়। এভাবে একদিন সেও ট্রেনিং-এ অংশ গ্রহণ করে। হালের গরু মাঠে ফেলে রেখে দলের সঙ্গে নিখোঁজ হয়ে যায়। মুক্তি যুদ্ধের ন’মাস কেউ তাকে দেখেনি। সবাই ধরেই নেয় পাকবাহিনীর ‘ছিটাগুলি’তে সে নিহত হয়েছে। প্রথম প্রথম দুএকদিন এ নিয়ে কথা হলেও পরে আর কেউ এনিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। খোঁজ নিবেই বা কে? তার তো আর আপন জন বলতে কেউ নেই।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয় যখন দ্বার প্রান্তে। মুক্তি বাহিনী তখন মেহেরপুর ঢুকে পড়ে। এখবর চারিদিকে দ্রুত ছড়িয়ে যায়। মানুষ হুমড়ি খেয়ে মুক্তিবাহিনী/ মুক্তিযোদ্ধাদের দেখার জন্য ভীড় করে। খই ফোটার মতো আকাশে গুলি ছুড়তে ছুড়তে মুক্তিবাহিনী এগিয়ে আসে। সর্বাগ্রে বাংলাদেশের পতাকা বহন করে এক যুবক। চাঁদপুরের রাখাল বালক মিন্টু। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের দেখে মানুষ ফুল ছিটাচ্ছে, হাতে তালি দিচ্ছে। জয়বাংলা ধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তুলেছে। যেদিন মিন্টু রণাঙ্গন থেকে প্রথম চাঁদপুর গ্রামে আসে সেদিন এ গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা তাকে দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ছেলেরা ফুলের মালা দিয়ে তাকে সম্বর্ধনা দেয়। যা এখন শুধুই স্মৃতি।

মিন্টুর মুক্তিযুদ্ধে অসীম বীরত্ব ও সাহসের জন্য ভারতীয় সেনাকর্মকর্তা তাঁকে বিশেষ প্রসংশা পত্র দেয়। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বিস্ময়কর অবদানের কথা জেনে আমি তাঁকে আবেগে জড়িয়ে ধরলাম। মনে মনে স্যালুট জানালাম। আমার চোখ তখন ঝাপসা হয়ে আসে। সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখি হাতে ধরে থাকা সার্টিফিকেট নিয়ে মিন্টু ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

এতদিনে মিন্টু জেনে গেছে, এই সার্টিফিকেট দিয়ে সে বোয়ালিয়া বাজার থেকে এক সের চালও কিনতে পারবেনা।

উল্লেখ্য যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা প্রদান তখনও চালু হয়নি।

চলবে —


১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ সাল
থানা রোড সিরাজগঞ্জ- ৬৭০০