উল্টো পথে চলি মোরা, উল্টো পথে হাঁটি! কে বা জানে কোনটি ভুল আর কোনটি তবে খাঁটি!!

133

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ মনে হয় আমি আবারও বিবাহের দিকেই যাচ্ছি। উপায় ছিল না; তাই হয়ত যেতে হচ্ছে। বারবার কে এই পথে যেতে চায় বলুন! যেতে হয় না। বিষয়টি গায়ে এসে পড়ে। আমি দূর্বল চিত্তের মানুষ। অল্পতেই দূর্বল হয়ে পড়ি। বলা যায় কাঁপাকাঁপি শুরু করি। কেবল আমি নই। ঠিক এইটুকু পড়ে আমার কোন না কোন পাঠকেরও পা কাঁপছে হয়ত। কাঁপতেই পারে। বিষয়টি সামাল দিতে যেয়ে আমার শোনিমের আম্মুরও কাঁপাকাঁপি শুরু হয়; খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। আর শোনিমও কিছুটা বিব্রত হয়। আমার অস্বাভাবিক অবস্থা শোনিম এখন বুঝতে পারে। দিনে দিনে বড় হচ্ছে আর সবকিছু বুঝতে শিখছে।
বিবাহের কথাটি শুনে আমার প্রিয় পাঠককুল যে বুঝে উঠতে পারছেন না, বা উসখুস শুরু করছেন সেটা বুঝতে পারছি। ভাবছেন, সর্বনাশ! এই বয়সে আবার বিবাহ!! বুড়ো বয়সে ভীমরতি!!! একজন বিশেষ পাঠক আছে আমার, যে এই মূহুর্তে চোখ লাল করে বলছে, প্রথম থেকেই সন্দেহ হয়েছিল লোকটি ভাল না। ভাবসাব আর লেখালেখিতে ফেরেস্তাগিরী করে, আসলে আস্ত একটি ইবলিশ; বুইড়া ইবলিশ। ফোন করে একটি ঝারি না মারলে বুইড়াটা ঠিক হবে না! এমনি নানা ভাবনা অনেকের মাথায় এসে ভর করছে, তাই না! বিষয়টি আসলে ঠিক তা নয়। আপনারা যা ভাবছেন মোটেও সেটি নয়। মজা করার জন্যে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে স্রেফ রহস্য করলাম। আবার বিবাহে জড়ালাম মানে আবার “বিপদ বাড়ানো হলো” (বিবাহ)।
“বিপদ বাড়ানো হলো” কে সংক্ষেপে কোন আদি আতেল বিবাহ নামটি দিয়েছে কি না কে জানে। তবে বিবাহ করা তো আসলেই বিপদ বাড়ানো। প্রথমে স্বাধীনতা খর্ব হয়, দ্বিতীয়ত একজনের একরাশ দায়িত্বের বোঝা মাথায় এসে পড়ে। বিপদ তো বটেই। এসব জেনেও মানুষ বিয়ে করে। বিয়ের জন্যে পাগল হয়। এই পৃথিবীতে বিয়ে পাগলা মানুষের সংখ্যা অগনিত। তবে “বিয়ে ছাড়া” মানে “তালাক দেয়া” মানুষের সংখ্যা এখনো অপ্রতুল।
বলছিলাম বিপদ বাড়ানোর কথা। মাঝে মধ্যে বিপদ আপদ বাড়লেও এসব এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। এটা জীবনেরই অংশ। তবে উল্টা পাল্টা লেখালেখি করে যে বিপদ বাড়বে সেটা জানতাম না। দু’একজন পাঠক যে রিএ্যাক্ট করবে সেটা বুঝতাম না। ইদানীং অনলাইনে আমার লেখার পাঠক বাড়ছে, সাথে সমালোচকও বাড়ছে। কোন কোন সমালোচকের কাছে আমার সম্পাদকীয়কে আজাইরা পেঁচাল বা খাজুইরা আলাপের লম্বা ফিরিস্তি বলেই মনে হয়। দুনিয়াতে এত কাজকর্ম থাকতে আমি বস্তাপঁচা এত্ত এত্ত লেখা কেন লিখি, বা লেখার এত সময়ই বা কোথায় পাই সে সব নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন। এভাবে ধান ভাঙতে শিবের গীত গাওয়া অনেকেরই পছন্দ নয়।
সমালোচনা শুনে সত্যি সত্যি চিন্তায় পড়ে গেছি। গো বেচারা চিন্তায় পড়লে যেমন হয়, আমার অবস্থা হয়েছে তেমন। মূলত আমি লিখি সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে। উল্টো-স্রোতে চলা, ঘুনে ধরা সমাজকে বদলে ফেলাই আমার উদ্দেশ্য। বদলাবার কাজটি করতে গেলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শিবের গীত গাওয়াটা অপ্রাসংগিক নয় মোটেও। আমার তো ধান ভাঙ্গানোর কোন মেশিন নেই। তাই বলা যায়, শীবের গীত গাইতে গাইতে ধান ভাঙ্গানোটা আমার কৌশলেরই একটি অংশ। মানুষ গীত শুনতে শুনতে কখন যে নিজের অজান্তেই নিজেকে বদলে ফেলার সিদ্ধান্তটি নিয়ে নেবে তা সে নিজেও জানবে না।
তবে এই সমাজে আসলেই উল্টা পাল্টা আদৌ কিছু আছে, নাকি আমার নিজের মাথাই সব সময় উল্টাপাল্টা ভাবে সে সব নিয়েও পাঠকের মত আমার নিজের মধ্যেও প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আজকাল। আমার কি দোষ? আমি তো সোজা ভাবেই ভাবতে চাই;পারি না।পারবো কিভাবে? মানুষ নিজে কি সোজাভাবে ভাবে? ভাবে না। মানুষের স্বভাবের মধ্যেই তো বিপরীতমুখীতা বা উল্টাপাল্টা রোগের বসবাস। রাগ করে মানুষকে জানোয়ার বললে বেজায় কষ্ট পায় মানুষ। কেউ কেউ লঙ্কা কান্ডও বাঁধিয়ে ফেলে। ভাবে এটা বিশাল একটা গালি। অথচ সেই মানুষের দলকে টাইগার বললে খুশী হয়। জাতীয় ক্রিকেট দল খেলায় জিতলে বড় করে লেখা হয়, টাইগাররা ফাটিয়ে দিয়েছে।
বিচিত্র এই দুনিয়ার মানুষের স্বভাব; বিচিত্র এই দুনিয়ার কঠিন সত্য। সুখের দিনে না থাকলেও চলে, তবে বিপদে মানুষকে মানুষ পাশে কামনা করে; পেছনে নয়। অথচ সমস্ত দুনিয়া চলে উল্টো ভাবে। সুখের দিনে মানুষ পাশে থাকে কিংবা আগে আগে থাকে। আর দুঃখের দিনে থাকে পেছনে। বরযাত্রার সময়টা আনন্দের সময়, সুখের সময়। অথচ এই সময়টায় বরকে সবার পেছনে রাখে। আর সবাই আগে আগে যায়। আবার শবযাত্রায় মৃতদেহের কফিন সবার আগে থাকে। আর মানুষজন সবার পেছনে। পেছনে হেঁটে হেঁটে সবাই পরওয়ারদিগারের কাছে মাগফেরাত কামনা করে। ক্ষমা ভিক্ষা চায়।
ভিক্ষা চাওয়ার কৌশল নিয়েও একটি অলিখিত ব্যবস্থা আছে আমাদের সমাজে। ভিক্ষা দেবার এবং নেবার সবচেয়ে চমৎকার জায়গা হলো মসজিদ এবং মন্দির। এখানে সবাই ভিক্ষা চাইতেই আসে। তবে ধনীদের দল উপাসনালয়ের ভেতরে আর গরীর দুঃখীরা বাইরে বসে ভিক্ষা চায়। ভিক্ষা বা সাহায্য নিয়ে একজন বিদেশী রাষ্ট্রদূতের রসাত্মক একটি কমেন্ট মনে পড়ছে। বেশ অনেক বছর আগের কথা। একটি সামাজিক সংগঠনের ডিনার পার্টিতে ওনাকে দাওয়াত করেছিলাম। খুব মজার মানুষ উনি। ভাল হিউমার জানেন। কেতাদুরস্ত বক্তাও তিনি। বক্তৃতার এক পর্যায়ে হাসতে হাসতে বললেন, বাংলাদেশের সব মানুষ আমাদের কাছে কেবল চায়; সাহায্য চায়। ধনীরা চায়, গরীবরাও চায়। আমাদের কাছে গরীবরা চায় ডলার, আর ধনীরা চায় ভিসা।
আসলে স্বভাবগত ভাবে সব মানুষই চায়। সব সময়ই চায়। কেবল সঠিক পথে অধিকাংশ মানুষ যেতে চায় না। সরল পথ সবার জন্যে নয়। সবাই পছন্দও করে না। আঁকাবাঁকা পথেই যেন রাজ্যের শান্তি। লোক চক্ষুর আড়ালে থেকে রাতের অন্ধকারে আঁকাবাঁকা পথ মারিয়ে মদ বিক্রেতার ঘরে অনেকেই যায়। কিন্তু মদ বিক্রেতাকে কোথায়ও যেতে হয় না। সে ঘরে বসেই ব্যবসা করে। অথচ দুুধ বিক্রেতা সেটা পারে না। তাকে পাড়ায় পাড়ায়, লোকের দরজায় দরজায় যেতে হয়। দুধ হলো পৃথিবীর অন্যতম ভাল খাবার। সেই দুধ বিক্রেতাকে আমরা সন্দেহের চোখে দেখি। সর্বদা বলি, পানি মেশাননি তো? আর মদ? যত খারাপই হোক, নিজ হাতে মদে পানি মিশিয়ে আমরাই খাই। বিক্রেতা মদে পানি মিশিয়েছে কিনা সেটা কখনোই ভাবি না। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে চুকুর চুকুর চুমুকে খাই।
এসবে কিছু পাই বা না পাই, উল্টো পথে আমরা হেঁটেই চলেছি। এ এক অসীমের পানে যাত্রা। সঠিক পথে কিংবা ভাল কাজে বিস্তর ভাবনা, বিস্তর বাঁধা। ভাল পথে যাবার আগে হাজার বার ভাবি। উল্টো পথ, মানে খারাপ পথে বা খারাপ কাজে একবারও ভাবি না। হুট করে কারো উপর রাগ করে বসি কিংবা গালে বসিয়ে দেই দু’চার ঘা। কিংবা ঝগড়া বিবাদ বাঁধিয়ে ফেলি। তখন কোরআন, বাইবেল বা গীতার বানী কারো মনে থাকে না। আবার এসবে বিশ্বাসীদের দল এসব ধর্মগ্রন্থ নিয়েও মারামারিতে লিপ্ত হই। অথচ এসব মারামারির কথা পবিত্র ঐ বই সমূহের কোথায়ও নেই। লক্ষ্য করে থাকবেন, কোরআন, বাইবেল এবং গীতা একই লাইব্রেরীতে পাশাপাশি থাকে। এরা নিজেদের মধ্যে কখনোই মারামারি করে না।
তবে মারামারি বিষয়টি এখন আরো বিস্তৃত হয়েছে। এটি এখন আর ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে একই ধর্মের উপগোত্রের মধ্যে। শুরু হয়েছে গোত্রীয় বিবাদ। নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে চালু হয়েছে ফাটাফাটি এবং কাটাকাটি। কোনভাবেই কেউ অন্যের মতামতকে সহ্য করতে পারছে না। এই পরিক্রমা এগিয়ে চলছে দিনের পর দিন। কেবল নিজের বিশ্বাসটুকুকে সঠিক মনে করে বাদবাকী সবার বিশ্বাসটুকুকে সমূলে ফেলে দিচ্ছে খাদের কিনারে। এমনি করে উল্টো পথে চলতে চলতে নিজেরাই যে খাদের কিনারে চলে এসেছে সেদিকে নজর নেই কারো!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা