উদ্বিগ্ন সম্পাদকরা রাস্তায় তবু অনড় সরকার

আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ৯টি ধারা সংশোধনের দাবিতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে ঢাকার রাস্তায় মানববন্ধন করেছে মুদ্রিত সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ। মানববন্ধন থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওই ৯টি ধারাকে ‘স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের পরিপন্থী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

ওই কর্মসূচি পালনের কয়েক ঘণ্টা ব্যবধানেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইনটি সংশোধন না করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন সিনিয়র মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনান, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিকদের সমালোচনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রধানমন্ত্রী ওই ইঙ্গিত দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ আইন তো জাতীয় সংসদে পাস হয়ে গেছে। এখনই এ বিষয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনার কী আছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ৯টি ধারা সংশোধনের দাবিতে গতকাল সোমবার সকাল ১১টা ২০ মিনিটে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ব্যানার হাতে মানববন্ধনে অংশ নেন ১৬টি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক। সম্পাদক পরিষদের ব্যানারে প্রায় ১২ মিনিটের এই কর্মসূচিতে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। সম্পাদকরা সংসদের আগামী অধিবেশনেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের দাবি জানান।

তাঁরা বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩ ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই তাঁরা এসব ধারা সংশোধনের দাবিতে অনড় আছেন।

মানববন্ধন কর্মসূচিতে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম সাত দফা দাবি তুলে ধরেন।
মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমরা আশা করব, আমাদের এই দাবি সরকার গ্রহণ করবে এবং এই সংসদের যে শেষ অধিবেশন আছে সেই অধিবেশনেই যথাযথ সংশোধনী এনে এই আইনটি সবার জন্য গ্রহণযোগ্য করবে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘বিভিন্ন মন্ত্রী বলছেন, আলোচনার দরজা বন্ধ হয়নি, আমরাও মনে করি না আলোচনার দরজা বন্ধ। তবে আলোচনার নামে প্রহসন যেন না হয়। আমরা আলোচনায় গেছি, আমরা অত্যন্ত বিশ্বাস নিয়ে গেছি। কিন্তু সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন এখনো ঘটেনি। আমরা আলোচনা করতে চাই। তবে একটি গ্রহণযোগ্য আলোচনা, যেটা সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে সেটা চাই। ’

আইন পরিবর্তন না করার ইঙ্গিত : গতকাল মন্ত্রিসভা বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরিবর্তন না করার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেন, সেখানে (যুক্তরাজ্যে) এ আইন আরো কড়া।

সূত্র মতে, বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারার বিষয়ে সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিক নেতাদের আপত্তির বিষয়টি উল্লেখ করেন। তথ্যমন্ত্রী আলোচনা শুরু করলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতিক্রিয়া জানান। একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী বৈঠকে বলেন, ‘আমরা জাতীয় সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি পাস করেছি। কিন্তু এ আইনের কিছু ধারায় পরিবর্তন চেয়ে সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিক নেতারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। এরই অংশ হিসেবে আজকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে সম্পাদক পরিষদ। ’ তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসব সম্পাদক তো বিভিন্ন সময় ভুল নিউজ ছেপে সেটি তাদের নয়, একটি সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার নিউজ বলে দুঃখ প্রকাশ করে। ’ প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে এত উদ্বেগ কেন? ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থচিন্তা থেকে বিবেচনা করলে হবে না। সমগ্র রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কোনো বাধা হবে না। ’

মন্ত্রিসভার বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, গতকালের বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কড়া অবস্থানে থাকবে। যারা সত্য অনুসন্ধানী তাদের তো কোনো সমস্যা না। যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে সরকার, দেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তাদের জন্য এই আইন। ’ ওই সময় তথ্যমন্ত্রী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সম্পাদক পরিষদের মানববন্ধনের বিষয়টি তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একজন সম্পাদক তো সব সময় আমার বিরুদ্ধে লেখার জন্য প্রস্তুত থাকেন। পদ্মা সেতুর অর্থায়ন যাতে না হয় সে জন্য ড. ইউনূসের সঙ্গেও তিনি বিশ্বব্যাংকে গিয়ে কথা বলেছিলেন। ’

এর আগে সম্পাদক পরিষদকে তিনজন মন্ত্রী বলেছিলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সংশোধনের বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হবে। গতকাল পর্যন্ত মন্ত্রিসভার পর পর তিনটি বৈঠক হয়েছে। এই আইন সংশোধনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি। গত রবিবার তথ্য মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু দেশের ‘ডিজিটাল আইন নিয়ে আলোচনার আশা আছে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীকে এ নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি অবহিত করা হয়েছে। গতকাল মন্ত্রিসভা বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের বিষয়টি তোলা হয়নি।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে আইনটি পাস করা হয়। সম্পাদক পরিষদ এখন দাবি করছে, সংসদের আগামী অধিবেশনেই যাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করা হয়। সম্পাদক পরিষদ এ আইনের ৯টি ধারাকে ‘বাক্স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনতার পরিপন্থী’ বলে মনে করছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর সম্পাদক পরিষদ মানববন্ধন করার ঘোষণা দিয়েছিল। সরকারের অনুরোধে পরে ওই কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। একপর্যায়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে বৈঠক হয় সম্পাদক পরিষদের। তখন বলা হয়েছিল, আইনের ধারা সংশোধন নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনার সুযোগ আছে। ওই আশ্বাসের কোনো প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন না সম্পাদকরা।

পরিষদের সাত দফা দাবি

সম্পাদক পরিষদের সাত দফা দাবির মধ্যে আছে—ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৯টি ধারা যথাযথভাবে সংশোধন করা; বর্তমান সংসদের শেষ অধিবেশনেই এসব সংশোধনী আনা; পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে কোনো সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানোর ক্ষেত্রে তাদের শুধু নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু আটকে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে, কিন্তু কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থা বন্ধ করার অনুমতি দেওয়া যাবে না; আর কেবল তখনই প্রকাশের বিষয়বস্তু আটকানো যাবে, যখন ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়বস্তু আটকে দেওয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারবে; কোনো সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থা আটকে দেওয়া বা জব্দ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই আদালতের অনুমতি নিতে হবে; সংবাদমাধ্যমের পেশাজীবীদের সাংবাদিকতার দায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তাদের বিরুদ্ধে সমন জারি করতে হবে; সংবাদমাধ্যমের পেশাজীবীদের কোনো অবস্থাতেই পরোয়ানা ছাড়া ও যথাযথ আইনিপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা ছাড়া আটক বা গ্রেপ্তার করা যাবে না; গণমাধ্যমের পেশাজীবীর বিরুদ্ধে মামলার গ্রহণযোগ্যতা আছে কি না, তার প্রাথমিক তদন্ত প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে করাতে হবে; সে জন্য প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করতে হবে এবং তথ্য অধিকার আইনকে ‘দ্ব্যর্থহীনভাবে’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওপর প্রাধান্য দিতে হবে।

মানববন্ধনে ১৬ সম্পাদক

গতকাল সকালে মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নেন মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, ইনডিপেনডেন্ট সম্পাদক এম শামসুর রহমান, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান, করতোয়া সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক, সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনিরুজ্জামান, যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম ও সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকরা গতকালই এ কর্মসূচিকে নজিরবিহীন বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তথ্যমন্ত্রী বললেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন গণমাধ্যমের জন্য করা হয়নি

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন গণমাধ্যমের জন্য করা হয়নি। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনাসভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এর আগে সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তখন বলেছিলাম মন্ত্রিপরিষদে উত্থাপন করব। আজ মন্ত্রিপরিষদে এই আইন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী খোলামেলা আলোচনা করেছেন। এরপরও যদি এই আইন নিয়ে কোনো আলোচনা থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয় আলোচনা করে দেখবে। ’

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই আইন করা হয়েছে শিশুদের নিরাপত্তার জন্য, সাইবার অপরাধীদের জন্য, হ্যাকারদের জন্য, ডিজিটাল সমাজের নিরাপত্তার জন্য। কোনো অবস্থায়ই গণমাধ্যমের জন্য করা হয়নি। এই আইনের কোনো জায়গায় গণমাধ্যমের কর্মীদের কথা বলা হয়নি। ‘-ইত্তেফাক