উত্তর কোরীয় কূটনীতিককে বহিষ্কার

যুগবার্তা ডেস্কঃ কূটনৈতিক সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ঢাকায় উত্তর কোরিয়া দূতাবাসের এক প্রথম সচিবকে সোমবারের মধ্যে বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রোববার রাতে এ তথ্য জানান। সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা জানান, গত মাসে শুল্ক কর্মকর্তারা কমলাপুরের অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ডিপোতে (আইসিডি) তল্লাশি চালিয়ে উত্তর কোরিয়া দূতাবাসের ওই প্রথম সচিবের নামে আনা সাড়ে তিন কোটি টাকা মূল্যের সিগারেট ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম আটক করেন। যথাযথ প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে ওই পণ্য আনার অভিযোগে উত্তর কোরিয়ার ওই কূটনীতিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। কূটনৈতিক সূত্রমতে, ঢাকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে পারছে না অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে থাকা ‘সমাজতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের দেশ’ উত্তর কোরিয়া। বরং দেশটি নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উসকে দিয়ে তাদের কূটনীতিকদের বলেছে, অর্থ সংকট মেটাতে যে যেখানে কর্মরত সেখানেই আয়ের সংস্থানে কিছু করতে। তাই প্রতিটি দেশে কোরিয়ার নাগরিকদের নজরদারি করা হচ্ছে। জাতিসংঘ বলেছে, প্রতিটি দেশে উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক পণ্য পরীক্ষা করতে। সূত্র জানায়, উত্তর কোরিয়ার কিছু কূটনীতিকের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে বেশ কয়েকদিন ধরে। কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে উপেক্ষা করে স্বর্ণ, মদ, ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রীসহ অন্যান্য অবৈধ পণ্য আমদানির বেশকিছু তথ্য উদঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগ। অভিযুক্ত কূটনীতিকদের বিষয়ে ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নিতে অনুরোধ জানিয়ে রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল। আগেও ঢাকাস্থ উত্তর কোরিয়ার কয়েকজন কূটনীতিকের অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। তবে সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসের নামে আসা একটি কন্টেইনার পরীক্ষা করে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা দামের ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী, বিদেশি সিগারেটসহ অবৈধ পণ্য পাওয়া যায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা গত মাসে কমলাপুর আইসিডিতে অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ পণ্য জব্দ করে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, অতীতেও এ দূতাবাসের কিছু কূটনীতিকের শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধ প্রমাণ হয়েছে। স্বর্ণ, মদ, যৌন উত্তেজন ওষুধসহ অন্যান্য অবৈধ পণ্য উদ্ধার করেছি। একজন কূটনীতিকের কাছ থেকে ২৭ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে মদ ও অন্যান্য অবৈধ পণ্য আটক করা হয়। তখন সরকারি কাজে তারা বাধা দিয়েছিলেন। ২০১২ সালেও মদের চালান আটক করে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের নেতৃত্বে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে করা অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার উত্তর কোরীয় দূতাবাসের নামে মালয়েশিয়া থেকে ‘কূটনৈতিক’ খাদ্যদ্রব্য হিসেবে পণ্যের চালান আসে রাজধানীর কমলাপুর আইসিডি কাস্টম হাউসে। ১৪ জুলাই আসা পণ্য চালানটির বিল অব এন্ট্রি নম্বর ১৬৬৫৫ এবং কনটেইনার নম্বর টিসিকেইউ ১৪১৮০০১ (ডিপ্লোমেটিক গুডস/খাদ্যদ্রব্য)। এ চালানে ঘোষণাবহির্ভূত ও নিয়ন্ত্রিত পণ্য আমদানি করা হয়েছে। তাই কনটেইনারটি দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারিতে এবং অনুসন্ধানে রয়েছে। ইতিমধ্যে শুল্ক গোয়েন্দার অতিরিক্ত মহাপরিচালককে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা ও সরকারি দফতর এবং কোরীয় দূতাবাসের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কায়িক পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় খাদ্যপণ্যের ঘোষণা দিয়ে মালয়েশিয়া থেকে আনা কনটেইনারে দামি সিগারেট ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন ধরনের বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য পাওয়া গেছে, যা পুরোপুরি অবৈধ ও মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এনেছে ঢাকার কোরীয় দূতাবাস। কমলাপুর আইসিডি কাস্টম হাউস সূত্র জানায়, বর্তমানে কোরীয় দূতাবাসের তিনটি কনটেইনার নজরদারিতে রয়েছে। এ তিনটি কনটেইনারের একটি ২ আগস্ট কায়িক পরীক্ষা করা হলেও বাকি দুটির বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ওই দুই কনটেইনারের একটিতে বিলাসবহুল গাড়ি রুলস রয়েলস এবং অন্যটিতে বিএমডব্লিউ গাড়ি আনা হয়েছে। মিথ্যা ঘোষণা ও কূটনৈতিক সুবিধায় আনা এই গাড়ি দুটি পাচারের আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দারা। তবে কোরীয় দূতাবাস রুলস রয়েলস গাড়িটি ফের রপ্তানি করতে এখন উঠেপড়ে লেগেছে। এতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোরীয় দূতাবাসকে অনুমোদন দিয়েছে বলে জানা গেছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান গতকাল বলেন, ‘উত্তর কোরীয় কূটনীতিকদের ক্ষেত্রে আগেও আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা এবং শুল্ক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ২৭ কেজি সোনা জব্দ, ২০১২ সালে মদের একটি চালান, পিয়ংইয়ং রেস্টুরেন্টে অবৈধ মদ ও মাদক উদ্ধারের মতো কতগুলো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তারা আমাদের গোয়েন্দা নজরদারিতে আছেন। শুল্ক আইনে অপরাধ ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকলে শুল্ক গোয়েন্দা আইনে পদক্ষেপ নেব।’ তথ্যমতে, ভিয়েনা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ১৯৬১-তে বলা আছে, কূটনৈতিক লাগেজ ও কনটেইনার তল্লাশি করা যাবে না। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকে, তাহলে সবার উপস্থিতিতে এটি খোলা যেতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক প্রতিনিধির উপস্থিতিতে তা করতে হবে। কিন্তু আবার অনুচ্ছেদ ৪১-এ বলা আছে, কূটনৈতিক নিয়ম থাকলেও স্থানীয় (বাংলাদেশি) আইনকে সম্মান জানাতে হবে। আবার অনুচ্ছেদ ৪২-এ বলা আছে, কূটনীতিকরা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন না। জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলের রেজুলেশনে অনুচ্ছেদ ২২৭০ ও ৮০-তে বলা আছে, সব কার্গো অবশ্যই পরিদর্শন বা তল্লাশি করতে হবে। আবার চলতি বছর মার্চ মাসে জাতিসংঘের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া সব ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সুবিধা পাবে না।