আ.লীগের এখনো কোনো কর্মসূচি নেই, ৫ জানুয়ারি ঘিরে সংঘাত এড়াতে চায় বিএনপি

94

যুগবার্তা ডেস্কঃ আগামী ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের দুই বছর পূর্তিতে বিএনপি কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত কোনো কর্মসূচি পালনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিএনপি বলেছে, তারা কোনো সংঘাতে যেতে চায় না। ফলে ৫ জানুয়ারি ঘিরে পরপর দুই বছর সারা দেশে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, সেই অবস্থা এবার না হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হচ্ছে।
২০১৪ ও ২০১৫ পরপর দুই বছর ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে দেশে সহিংস পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এই দিনটি ঘিরে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থেকে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে ৫ জানুয়ারি ঢাকায় সমাবেশ করতে চায় বিএনপি। বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক শামীমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি চেয়ে বিএনপি ডিএমপিতে আবেদন করেছে। অবশ্য পুলিশ এখনো অনুমতি দেয়নি। কিছু জানায়ওনি। বিএনপির একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘অতীতে দেখা গেছে, একেবারে শেষ সময়ে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তা ছাড়া যতটুকু জেনেছি, ওই দিন আওয়ামী লীগেরও কোনো কর্মসূচি নেই। তাই আমরা আশা করছি পুলিশ অনুমতি দেবে।’
বিএনপির সমাবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন যুগ্ম কমিশনার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বিএনপির আবেদনটি পেয়েছেন। এটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কর্মসূচি ঘিরে বিএনপি যদি কোনো ধরনের নাশকতা করার পরিকল্পনা না করে, তবে পুলিশের অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে কোনো বাধা নেই। ওই কর্মকর্তা বলেন, বিগত বছর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একই দিনে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেওয়ায় দুই দলকেই কর্মসূচি করতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সেটি জানতে বিএনপিকে ৩-৪ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আওয়ামী লীগ ওই দিন কোনো কর্মসূচি দেবে কি না, সে ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আজ-কালের মধ্যে সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে ১২ জানুয়ারি সরকারের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে দলটি কর্মসূচি পালন করবে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম প্রথম আলোকে বলেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আওয়ামী লীগের বা ১৪ দলের কোনো কর্মসূচি এখন পর্যন্ত নেই। দিবসটি নিয়ে কোনো কর্মসূচি দেওয়া হবে কি না, তা তাঁর জানা নেই। আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ কোনো কর্মসূচি নেবে না। তবে ওই দিন বিএনপি-জামায়াত কর্মসূচি পালনের নামে সহিংসতা করার চেষ্টা করলে তা মোকাবিলার জন্য তাঁদের প্রস্তুতি থাকবে।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচি না থাকলেও দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৫ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় রক্তদান কর্মসূচি আছে। এ ছাড়া ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন ঢাকায় শোভাযাত্রা করার কর্মসূচি আছে ছাত্রসংগঠনটির।
গত বছরের ৫ জানুয়ারিকে আওয়ামী লীগ ‘সংবিধান সুরক্ষা ও গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ উল্লেখ করে রাজধানীর ১৬টি স্থানে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে বিএনপি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে ওই দিন ঢাকায় সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়। দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে প্রশাসন কাউকে কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেয়নি। কিন্তু বিএনপি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কর্মসূচি পালনে অনড় অবস্থানে থাকায় পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে রূপ নেয়। কর্মসূচি করতে না দেওয়ায় টানা তিন মাসেরও বেশি সময় অবরোধ পালন করে দলটি। এ কর্মসূচি চলাকালে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। এ সময় ঢাকার সঙ্গে সব জেলার যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশানের কার্যালয়ের চারপাশে বালুর ট্রাক রেখে দেওয়ায় তিনি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ নির্বাচন করার ব্যাপারে অনড় থাকে। আর, বিএনপি নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করে। সারা দেশে ব্যাপক সংঘাতের সৃষ্টি হয়। ওই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত সারা দেশে সহিংসতায় ১০৯ জনের মৃত্যু হয়।
বিএনপি আশা করছে, এ বছর ৫ জানুয়ারি সরকার তাদের সমাবেশ করতে দেবে। তবে অনুমতি না দিলেও গত বছরের মতো কঠোর অবস্থানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আছে দলটির। দলটির নীতি নির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, এবার হরতাল বা অবরোধের মতো কর্মসূচিতে যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত তাদের নেই। পৌরসভা নির্বাচনে ‘ব্যাপক অনিয়মের’ পর অনেকেই হরতাল দেওয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত সেই চিন্তা থেকে সরে আসে দলটি।
দলটির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা প্রথম আলোকে বলেন, পৌরসভা নির্বাচনে তাঁদের প্রার্থীরা হেরেছেন। সরকারি দলের প্রার্থীরা জোর করে অনেক প্রার্থীকে হারিয়েছেন। কিন্তু দলের নেতারা এবং স্বয়ং চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মনে করেন, এই নির্বাচনের কারণে মাঠপর্যায়ের নেতারা প্রকাশ্যে আসতে পেরেছেন। সাংগঠনিক কাজ করতে পারছেন। নেতারা চাঙা হয়েছেন। সামনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে। এটি আরও ব্যাপকভাবে হবে। ফলে এখনই সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে—এমন কর্মসূচিতে গেলে আবারও নেতা-কর্মীদের হয় জেলে যেতে হবে, নয়তো পালিয়ে বেড়াতে হবে। এ কারণে বিএনপি কোনো ঝামেলায় যেতে চায় না।
বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, তাঁদের দল কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করতে চায়। যত দ্রুত সম্ভব, তাঁরা এটা করতে চান। বিএনপির সামনে অনেক কাজ। বর্তমানে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তাতে সবার আগে সেই কাজগুলো করা উচিত। এরপর মাঠের আন্দোলনে আরও সক্রিয় হওয়ার চিন্তা তাঁদের আছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা এখন নরম কর্মসূচির মধ্যে আছেন। সরকার অনুমতি দিলে কর্মসূচি করবেন, না দিলে বিকল্প উপায়ে কর্মসূচি করবেন। তিনি বলেন, বিএনপি আশা করে, সরকার গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে বাধা দেবে না। বিএনপিও শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার কথা ডিএমপিকে জানিয়েছে।
তবে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল দুজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া না-দেওয়া পুলিশের ব্যাপার। এটা নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো অবস্থান নেই। আওয়ামী লীগ মনে করে, বিএনপি যদি দিনটি ঘিরে কোনো সংঘাতের দিকে যেতে না চায়, তবে আওয়ামী লীগও কোনো ঝামেলায় যাবে না।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আনা আওয়ামী লীগের বিজয়। তা ছাড়া নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের কোনো প্রশ্নও নেই। এই নির্বাচন বিএনপি প্রত্যাখ্যান করলেও কোনো সহিংস কর্মসূচিতে যায়নি। এটা ইতিবাচক। তিনি বলেন, বিএনপি সহিংস কর্মসূচিতে না গেলে আওয়ামী লীগের সেই কর্মসূচি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। প্রথম আলো