আলস্য ত্যাগ করো, কর্মঠ হও, গন্ডি ভেঙে ফেলো

77

তসলিমা নাসরিন : পঁচিশ বছর আগে বাংলাদেশে বসে যা লিখেছিলাম, আজও সেই লেখাগুলোকে অচল হয়নি, তার মানে আজও সমাজের, মেয়েদের অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি। কী লিখেছিলাম, যা এখনও প্রযোজ্য। একটু পেছনে তাকাই না কেন? লিখেছিলাম:
‘’মেয়েরা লেখাপড়া করবে, তারপর কী হবে? নার্স, শিক্ষক, নয় প্রাইভেট সেক্রেটারি। আর লেখাপড়া না করে হবে দরজি নয় পরিচারিকা। ঠিক এ-রকম না হলেও প্রায় এ-রকমই, এই গন্ডিতে তারা বাঁধা। গন্ডির বাইরে বেরোলেই লোকে বিস্মিত হয়। সেদিন প্ল্যানিং কমিশনে উঁচু পদে চাকরি করেন একজন মহিলার সঙ্গে কথা হল, তিনি বললেন – সকলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে আপনি চাকরি করছেন কেন? মানে আপনার কি টাকা-পয়সার অভাব? অভাব না হলে ঘরে-সংসার রেখে চাকরি করার দরকারটা কী? কিছু যদি করতেই হয় সোশ্যাল ওয়ার্ক করুন।
মেয়েরা সেবা করবে নার্স যেমন করে, স্ত্রী যেমন করে, পরিচারিকা যেমন করে। দাসী না হয়ে মেয়েরা যদি প্রভু হয়ে ওঠে- সমাজ কি সহজে তা মেনে নেবে?
মেয়েরা চাকরি করবে, বাচ্চা সামলাবে, স্বামীর জন্য রান্নাবান্না করবে, স্বামীদের আত্মীয়-বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে নিজের রান্না করা খাবার খাওয়াবে, বাচ্চাকে স্কুলে নেবে, পড়াবে, এ-সব না করে, অথবা এ-সবে ফাঁকি দিয়ে চাকরি করবার কোনও কারণ খুঁজে পায় না। উঁচু পদে চাকরি করে সাব-অর্ডিনেট পুরুষদের যখন-তখন আদেশ-নিষেধ করা কেমন যেন বেখাপ্পা লাগে। তা ঠিক। প্রাইভেট সেক্রেটারি হলে মানায়- সেজেগুজে আসবে, অফিসাররা যা বলবে তৎক্ষণাৎ তা পালন করবে, ফাইলটা এগিয়ে দেবে, কলমটা, পারলে চা’টা, গায়ের কোটটা, টাইটা, চশমাটা। অনেকটা বিকল্প স্ত্রী। ঘরে স্ত্রী রেখে এসে স্ত্রীদের স্বাদ প্রাইভেট সেক্রেটারিকে দিয়ে মেটানোর খায়েশ হয় অনেক ডিরেক্টর, অনেক এম ডি-র। যেন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। অথবা ঘোলের স্বাদ দুধে মেটানো। মেয়েরা সেবা করবে নার্স যেমন করে, স্ত্রী যেমন করে, পরিচারিকা যেমন করে। দাসী না হয়ে মেয়েরা যদি প্রভু হয়ে ওঠে- সমাজ কি সহজে তা মেনে নেবে? নেবে না, মেয়েদের তাই তিরস্কার সয়ে, লোকের ভ্রুকুটি সয়ে কাজ করতে হবে। তিরস্কারের ভয় সবচেয়ে বেশি মধ্যবিত্তের। নিম্নবিত্তরা পরোয়া করে না তার গায়ের কাপড় বুক থেকে কতটুকু সরলো বাগোড়ালি থেকে কতটুকু উঠলো। তার পেটে ক্ষিধে আছে, সে ক্ষিধে মেটাতে কাজ করে। বিত্তবান মেয়েরা টাকার জন্য না হোক, অবসর কাটানো বা একধরনের বৈচিত্র্যের জন্য করে। মধ্যবিত্তরা ঘোমটায় মুখ ঢাকে। তাদের নানা রকম সংস্কার। স্বামী অনুমতি দেয় না, লোকে কী বলবে, বাচ্চা-কাচ্চা মানুষ হবে না ইত্যাদি ছুতোয় ঘরে বসে থাকে, ঘরে বসে গয়নাগাটি, শাড়ি-জামার ডিজাইন, মাধুরী দিক্ষিতের নাচ আর হুমায়ুনের হাসির নাটকে মেতে থাকে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মেয়েরা যদি দলে দলে কাজ করতে না বেরোয় তবে নিজের স্বাধীনতাকে নিজের হাতে বলি দেওয়া হবে। আসলে সেই পরিবারে মেয়েদের বিয়েই করা উচিত নয়, যে পরিবারে স্ত্রীর চাকরি করা বারণ। সেই পুর“ষের প্রেমে সাড়া দেয়া উচিত নয় যদি সে পুর“ষ নারীর স্বাধীনতায় কোনওরকম বাধা হয়। চাকরি করলেই নারী তাবৎ স্বাধীনতা পেয়ে গেল, তা অবশ্য ঠিক নয়। কিš‘ কোনও কাজ কেন সে করবে না যদি কাজ করবার যোগ্যতা তার থাকে? তাহলে বিদ্যাশিক্ষা দিয়ে রাষ্ট্রের কী লাভ হলো? রান্নাবান্না, ঘরদোর পরিষ্কার করা, শিশুপালনের কাজ স্বামী- স্ত্রী দু’জনে মিলেই করা সম্ভব। প্রতিটি নাগরিকের জন্যই, আমি মনে করি, কাজ করা নৈতিক দায়িত্ব। তার মতো দেশদ্রোহী আর কে আছে যে তার মেধাও প্রতিভাকে ধ্বংস হতে দেয়! এর চেয়ে বড় ক্ষতিকর আর কী আছে যদি তাকে নিয়ে দেশ বা সমাজের কেবল ব্যয় হয়, কোনও আয় না হয়।
নার্স, শিক্ষক, প্রাইভেট সেক্রেটারি – এ- সবের মধ্যে মেয়েদের সীমাবদ্ধ যারা রাখতে চায়, তারা পুরুষতান্ত্রিকতায় ভোগে।
২.
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে মেয়েরা দল বেঁধে যখন কাজ করতে যায়, এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আমি মনে করি না এ দেশে আর কিছু আছে। যে মেয়েরা লেখাপড়া শিখতে পারছে না,বাল্যবিবাহের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে, সংসারে অভাব, অযথা যে মেয়ে স্বামীর ওপর নির্ভরছিল – স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে অন্য কোথাও অথবা তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, অথবা স্বামী যেটুকু উপার্জন করে তাতে সংসার ভাল চলে না – তাদের জীবনের এখন মোড় ঘুরে গেছে। তারা টিফিন-ক্যারিয়ার হাতে রাস্তায় নামে। হাঁটে। বাসে চড়ে। নাম দস্তখত করে। চেয়ারে বসে। সকাল-সন্ধ্যা কাজ করে। যে মেয়েরা কোনওদিন চুলে তেল পেত না, তারা এখন নিজের পয়সায় কেনা তেল মাখে চুলে, নিজের পয়সায় পায়ের জুতো কেনে, তারা যারা কোনও দিন জুতো পরে দেখেনি কেমন। নিজের পয়সায় তারা ভাত-মাছ খায়। এ নিশ্চয়ই বিত্তবান স্বামীর পোষা বধূদের চেয়ে ঢের মর্যাদার জীবন। দল বেঁধে নিম্নবিত্ত মেয়েরা যখন কাজ করতে যায়, ব্যস্ততায় বুঁদ হয়- তখন আমার খুব ঘৃণা হয় ওদের প্রতি, যারা ওই সময়ে কাজকর্মহীন অবসর কাটায়, প্রতিবেশীর সঙ্গে তুচ্ছ হাসিঠাট্টায় মাতে, সোনা বা শাড়ির দোকানে যায়, ভরি ধরে সোনা কেনে সাজবে বলে, দামি দেখে শাড়ি কেনে পুরুষ পটাবার আশায়।
৩.
নার্স, শিক্ষক, প্রাইভেট সেক্রেটারি – এ- সবের মধ্যে মেয়েদের সীমাবদ্ধ যারা রাখতে চায়, তারা পুর“ষতান্ত্রিকতায় ভোগে। মেয়েরা কীসে দক্ষ নয়? তাদের কেন সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হবে? তারা কেন অসীম ছোঁবে না? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট যেমন হতে পারে নারী, নারী পাইলট, ড্রাইভার রিকশাচালক সবই হতে পারে, সাংবাদিক হতে পারে, সাংসদ হতে পারে। অভিনয় করছে নারী, চিত্রনাট্যও লিখবে সে, চিত্রপরিচালকও তাকে হতে হবে, লাইটম্যান, মেকআপম্যান, সবই। জগতে কাজের অভাব নেই। যে-কোনও কাজেই নারী তার দক্ষতা-পারদর্শিতা অনায়াসে দেখাতে পারে। অবসরে সোশ্যালওয়ার্ক করবার দিন শেষ হয়েছে, তাদের এখন ঝুঁকি নিতে হবে, বড় বড় দায়িত্ব নিতে হবে কাঁধে। তা না হলে দিন যেমন ফেরেনি নারীর, আর ফিরবেও না। সমাজের সর্বত্র তার বিস্তার প্রয়োজন। রাষ্ট্র জুড়ে নিজেকে ছড়িয়ে না দিলে গন্ডির জীবন গন্ডিতেই থেকে যাবে।
নারী এখন কী চায়, তাকে গন্ডিবদ্ধ করবার সকল আয়োজন উপেক্ষা করতে নাকি যেমন আছে তেমন- পুরুষের সেবা-শুশ্রূষায় কাটিয়ে দিতে জীবন? বাংলাট্রিবিউন
লেখক: কলামিস্ট