Home মতামত আমেরিকার পথে, আমেরিকার প্রান্তরে (পর্ব-২)!!!

আমেরিকার পথে, আমেরিকার প্রান্তরে (পর্ব-২)!!!

20

সরদার মোঃ শাহীন:

শীত ভালোই পরতে শুরু করেছে শিকাগোতে। নভেম্বরের শুরুর দিককার শীত। এখনো মাইনাসে নামেনি বটে। তবে নামবে। আমরা থাকতে থাকতেই নামবে। তীব্র শীতে দিনের পর দিন বাস করার রেকর্ড আমার আছে। তবে ভালো লাগেনি কোনদিন। কোনকালেও শীত আমার পছন্দের ছিল না। আমার কাছে শীত মানেই কঠিন জুব্বা জাব্বা গায়ে চড়িয়ে বাইরে বের হওয়া। কেবল গায়ে নয়, মাথা এবং হাতের আঙুলও ঢেকে বাইরে বের হওয়া।
তাই শীতের আগমনী বার্তা পেলেই মনটা আমার মনমরা হয়ে যেত। অপেক্ষায় থাকতাম কবে শীত শেষ হবে। আজও এমনটাই লাগছে। তবে এয়ারপোর্টের সব প্রক্রিয়া শেষ করে বাইরে বের হবার পরে মনটা বেশি খারাপ লেগেছে। খারাপ লেগেছে শীতের কারণে নয়, অন্য কারণে। এয়ারপোর্টে বিভিন্ন সার্ভিসে থাকা বিভিন্ন কাউন্টারের লোকজনের অসভ্যতা মাখা রুঢ় ব্যবহার আর অসহযোগীতায় মনটা খারাপ হয়েছে বেশি।
এক পুলিশ ছাড়া একটি মানুষ পাইনি যে বা যিনি একটু হলেও ভালো রেসপন্স করেছেন। কিংবা সহযোগীতা করেছেন। পুলিশের অসহযোগীতা মানা যায়। বাঙালি হিসেবে নিজ দেশে এটা মেনেই তো বড় হয়েছি। কিন্তু এখানকার পুলিশ উল্টো। এরা জায়গা মত যতই কড়া হোক, পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে সহযোগী মনোভাবের। কিন্তু আমজনতা উল্টো। এরা সহযোগী মনোভাবের নয়। মনোভাব এবং ধরনে বড় ভাবসাব মার্কা। কেউ বেচে পানি, কিংবা কেউ বার্গার। অথচ এদের ভাবসাব আর কথাবার্তা শুনলেই ইচ্ছে করে কষে একটা দেই।
তবে সে জো তো আর নেই। আমি দিতে দেরী করবো, আমাকে ল্যাং মেরে সাইজ করতে এদের একটুও দেরী লাগবে না। অগত্যা সব মেনে নিয়ে আমি আর ডঃ মনির দু’বোতল পানি নিয়ে কাউন্টারে দাঁড়ালাম। দু’জন দু’দেশ থেকে শিকাগো পৌঁছেছি। ক্লান্তি ইতিমধ্যেই দু’জনার শরীরে ভর করেছে। পানির পিপাসায় গলা আসছিলো শুকিয়ে। তাই পানির বড় প্রয়োজন। অনেকক্ষণ পরে কাউন্টারে পৌঁছে যেই না ছোট্ট একটা নোট দিলাম, অমনি মাথা নাড়ালো। হবে না; ভাংতি ছাড়া পানি বিক্রি হবে না। ভাংতি দেয়া লাগবে। নো ভাংতি, নো পানি। বললাম, কার্ড দেই। ক্রেডিট কার্ড।
কোন পাত্তাই দিচ্ছে না। অন্যদিকে তাকিয়ে মাথা নাড়াচ্ছে। মানে, হবে না। ভাংতি দেয়াই লাগবে। ভাংতি থাকলে দাও। না থাকলে, ফোটো। শেষমেষ না পারতে গেলাম ম্যাকডোনাল্ডস এ। এখানেও একই অবস্থা। ভাংতি ছাড়া বেচাবিক্রি হবে না। কি আর করা। বাইরে বের হলাম ট্যাক্সি খুঁজতে। ট্যাক্সি লাইনের অভাব নেই। মানুষে গিজগিজ করছে লাইনে। কোন একটা লাইনে দাঁড়ালেই তো আর হবে না। আমাদের জন্যে সঠিক লাইন কোনটা হবে জানতে কাউন্টারে বসা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, মানে মহা বেয়াদবী করে ফেললাম। এমনভাবে আমার দিকে তাকালো যেন ওকে জিজ্ঞেস করে আমি মহা অন্যায় করে ফেলেছি।
ট্যাক্সি ড্রাইভারও মহা বেয়াদব। বদের বদ। বলা যায় একটা প্রথম শ্রেণীর তেদর। আমাদের দু’জনকে যাত্রী হিসেবে ওর ভাল লাগেনি একটুও। অন্তত ওর চোখ তাই বলছিল। কথা ছিল ওর চোখে, কথা ছিল মুখে। প্রথমেই সেই মুখে একটা ভেংচী মেরে বললো, যাবো কোথায়? বললাম। শুনে এমন ভাব করলো যেন এমন হোটেলের নাম সে জিন্দেগীতেও শুনেনি। গাড়িতে বসার পর দ্বিতীয় প্রশ্ন, বাড়ি কোথায়? এমন ভাবে প্রশ্নটা করলো যেন সে নিজে মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছে। কথা বলে জানলাম, সে নিজেও এসেছে আরব দেশ থেকে।
আরবের জর্ডান, ইয়েমেন, লেবানন। এরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে। পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ। সবখানে এরা আছে। মূলত এসব দেশ থেকেই কানাডা, আমেরিকায় এবং ইউরোপে মাইগ্রেন্ট হয় বেশি। এতে সমস্যা নেই। সমস্যা হলো, নিজেরা মাইগ্রেন্ট হয়ে ভাব দেখায় অন্য মাইগ্রেন্টদের সাথে। বিশেষ করে বাঙালি পেলে তো কথাই নেই। আমাদের নাগালে পেয়েই ভেটকাতে লাগলো। আরবীয় ভেটকানী। ভেটকাতে ভেটকাতে প্রশ্ন করলো, তুমি কি জানো যেখানে যাবে, তার ভাড়া কতো?
আমি জানবো কেমনে? তুমি আগে যাও! তারপর না হয় জানবো ভাড়া কতো। আমার সোজা সাপ্টা জবাব। জবাবে সে সন্তুষ্ট নয় মোটেও। বক বক করতেই থাকলো। যদিও তার কথা পুরোটা বুঝি না আমি। বুঝবো কিভাবে! যা বলে তার অর্ধেক থাকে গলার ভেতর। মনে হয় ইংরেজি শুনছি না। আমেরিকায় নেমে আরবী শুনছি। ইংরেজি কায়দায় ভাঙা ভাঙা আরবী। ভঙিচঙি আরো করলো। গুগল করে ভাড়া বের করলো। আমাকে টাকার পরিমাণটা দেখিয়ে শিওর হতে চাইলো, আমি দিতে সক্ষম কি না।
আরবীয়দের এই একটাই দোষ। বাঙালি মুসলিম পেলেই, মুসলিম নয়; মিসকিন মনে করে। মিসকিন হোটেলের লোকজনও মনে করলো। বুঝলাম না, সবাই এমন করে কেন! তবে দোষ হয়তো ওদের না। দোষ আমাদেরই। সব দোষ আমাদের চেহারার। চেহারা দেখলেই ওরা হয়তো এমন করে। কেননা জন্মেছি যে বঙ্গে। হয়তো এ জন্যেই অবহেলা থাকে সঙ্গে।
হোটেল রিসিপশানে দু’জন রিসিপশানিস্ট। কাটা কাটা সুন্দরীর একজন কানে ফোন লাগিয়ে পিটপিট করে কার সঙ্গে যেন কথা বলেই যাচ্ছে। গভীর কথা। অন্যজনা মাথা নীচু করে কাগজে চোখ বুলাচ্ছেন। মাঝে মাঝে চোখের চশমা ঠিক করে নিচ্ছেন বটে। কিন্তু চোখ উপরে তুলছেন না। দেখছেন না তার করুণাপ্রার্থী হয়ে সামনে কোন কাস্টমার আছে কি না। মনে হলো, কাল তার বিসিএস পরীক্ষা। চোখ উঠানোর জো নেই। সিলেবাস শেষ করাই লাগবে।
কাশিটাশি দিয়ে কোন রকমে তার নজর কাড়লাম। আমাদের কাছে থাকা বুকিং স্লিপে চোখ বুলিয়ে খেড়খেড় করে উঠলেন তিনি। বললেন, নো, নো। হবে না। এটা তামাদি হয়ে যাওয়া বুকিং। এই নামে দু’মাস আগে বুকিং ছিল। আই এম স্যরি। বড় বিনয়ের সাথে দয়া করে আবারো আমার স্লিপে চোখ বুলাতে বললাম। বললাম, ভালো করে দেখো এখানে আজকের তারিখটাই জ্বলজ্বল করছে। সব পাওনা পরিশোধও করা আছে। এরপরও তুমি রিজেক্ট করলে বাইরের কনকনে ঠান্ডায় বসে থাকা ছাড়া উপায় থাকবে না আমাদের।
নিজের ভুল বুঝতে পেরে মেয়েটি চেকইন করালো বটে। তবে মার্শাল’লও জারি করে দিল সঙ্গে। ব্রেকফাস্টের কয়েকটা টোকেন হাতে দিয়ে বললো, এটা নিয়ে রোজ সকালে রেস্টুরেন্টে খেতে যাবে। বি কেয়ারফুল। কোনভাবেই যেন টোকেন না হারায়। নো রিপ্লেসমেন্ট অব দি টোকেন। নো টোকেন, নো খাবার। কিছু আর বললাম না। মনে মনে শুধু বিড়বিড় করলাম, পেপারলেস কান্ট্রি ফুডাও। আর আমাগো ডিজিটাল শিখাও। সামান্য একটা টোকেনরে ডিজিটাল করতে পারো না। পারো খালি ফেডর ফেডর করতে।
রুমে ঢুকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেলাম। নোটিশ জারি করা আছে। ২৪ ঘণ্টা আগে না জানালে নিত্যদিনকার রুম মেকআপ করা হবে না। অতীব প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য কোন কিছু চাওয়াও যাবে না। এমনকি পানিও না। বিষয়টা পরিষ্কার করি। হাগু করতে গিয়ে যদি টয়লেট পেপারও শেষ হয়ে যায়, কিচ্ছু বলা যাবে না। যদি টয়লেট পেপার লাগেই, নো প্রবলেম। টয়লেটে বসে অপেক্ষা করতে হবে ২৪ ঘণ্টা।
হায়রে মানবাধিকার! হায়রে মানবাধিকারের দেশে আমার মানবাধিকারের করুণ দশা! সারা মাস, সারা বছর এদের কাছ থেকে মানবাধিকার নিয়ে কত কথা শুনতে হয় আমাদের। শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। অথচ কি দেখলাম এখানে এসে। দেশীদের কি অবস্থা জানি না, তবে বিদেশীদের মানবাধিকারের করুণ অবস্থা তো নিজ চোখেই দেখলাম। চাইলে আজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লিখে লিখে পাতা ভরে ফেলতে পারতাম।
তবে সব কিছুই কি লেখা ঠিক! ঠিক না। লিখলে আবার স্যাংশন আরোপ না করে। বিশ্বজোড়া স্যাংশন নামক এই অস্ত্র এখন সব জায়গায় প্রয়োগ হচ্ছে। ভারী কঠিন অস্ত্র এই স্যাংশন। যার এ পাশেও ধার; ওপাশেও ধার। এর বিরুদ্ধে কথা বলে, সাধ্য আছে কার!!!

-লেখক: সম্পাদক, সিমেকনিউজ ২৪ ডটকম।