আমার সিনেমা; আমাদের সিনেমা!!

264

-ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন
পাঠককুল নিশ্চয়ই গুলিস্থান সিনেমা ভবনের কথা ভুলে যাননি! এককালের ঢাকার প্রাণকেন্দ্র গুলিস্থানের প্রধান ভবনই ছিল সেটি। এক ভবনে বিভিন্ন অফিস আদালতের পাশাপাশি দুটি সিনেমা হলও ছিল; একটি গুলিস্থান আর অন্যটি নাজ। সারাদেশের মানুষ যারা ঢাকায় আসতো তাদের নখদর্পনে ছিল বিনোদনের এই হল দুটি।
ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় নাছিম ভাইয়ার সাথে জীবনে প্রথম নাজ হলে আমার ছবি দেখার সুযোগ হয়। পাঁচ ভাইয়ের মাঝে তিনি সবার বড়; আর আমি সবার ছোট। কোন এক কাজে ঢাকায় আমাকে নিয়ে এসেছেন। এটা সেটা কেনাকাটার ফাঁকে তিনি বললেন, বই দেখবি? না বুঝেই বললাম, দেখবো। তখন সিনেমা দেখাকে সবাই “বই দেখা” বলতো। কেন বলতো তা জানি না; তবে সবাই বলতো।
বই দেখার জন্যে বসে আছি নাজ হলের ওয়েটিং রুমে। ভাইয়া আমাকে বসিয়ে বাইরে কোথায় যেন গেছেন। আমি একা বসে আছি; সময় আর ফুরোয় না। এক পর্যায়ে লক্ষ্য করলাম রুমের এক কোনায় কয়েকটি বই রাখা। ভাবলাম এসব দেখতেই ভাইয়া আমাকে এখানে বসিয়ে রেখে গেছেন। আমি কিছুটা দূরে একটি বেঞ্চে বসে বইগুলো দেখছি; আর দরজায় লক্ষ্য রাখছি ভাইয়া আসে কি না। বই দেখতে আর ভাল লাগছিল না। এক সময় ভাইয়া আসলেন। বললাম, ভাইয়া, বই দেখেছি; আর ভাল লাগে না। এবার চলেন যাই।
ভাইয়া তো অবাক। এখনও শুরুই হয়নি, তুই দেখলি কেমন করে? ভাইয়ার বিষ্ময়মাখা জিজ্ঞাসা। পরে বুঝিয়ে বললেন, বোকার হদ্দ। আমরা সিনেমা দেখতে এসেছি; রাজ্জাক, শাবানার সিনেমা। সিনেমা মানে ছবি; আমরা আজকে ছবি দেখতে এসেছি। এভাবে আমাকে বুঝিয়ে বসিয়ে রেখে আবার কেন যেন কী কাজে বাইরে গেলেন। আমি তো বসেই আছি। তার ফেরার নামগন্ধও নেই। যে ঘরটাতে বসে আছি সেখানে আমার মত আরো অনেকেই বসে আছে। চার দেয়ালে টানানো রাজ্জাক শাবানার বেশ ক’খানা বড় বড় ছবি। পত্রিকার পাতায় তাদের ছবি আমি রোজ দেখি। ভাবলাম ভাইয়া বোধ হয় আমাকে এইসবই দেখার জন্যে বলে গেছেন। আমি ছবি দেখা শুরু করলাম। এক পর্যায়ে ভাইয়া হন্তদন্ত হয়ে আবার ফিরলেন। দেখলাম সবাই উঠে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে সামনে এগুচ্ছে। আমরাও তড়িঘড়ি লাইনে দাঁড়ালাম। এতক্ষন খুব মন দিয়ে ছবি দেখার কথাও ভাইয়াকে বিস্তারিত বললাম। ভাইয়া তো হেসে কুটিকুটি। ধুর বোকা; এসব তো আসল ছবি না। আসল ছবি এবার দেখবো। হলের ভেতরে গিয়ে বসে তারপর দেখবো। খুব মজা পাবি। নাচ আছে, গান বাজনা আছে; ঢিশুম ঢিশুম মারপিটও আছে।
ছবির নাম “সাধু শয়তান”; আমার দেখা জীবনের প্রথম ছবি। নাজ হল ভর্তি আলো। জোরে জোরে খুব চেনা গান বাজছে ভেতরে। সবাই এসে এক এক করে সিটে বসছে। একটা সময় এক এক করে সবগুলো আলো নিভে গেল। আর সামনের বড় সাদা পর্দায় ভাসলো “ধুমপান নিষেধ”। তাকালাম পেছনে। মনে হলো কে যেন পেছনের উঁ”ু ঘরের চার কোনা ফুটো দিয়ে লাইট মেরে সামনের সাদা পর্দাকে আলোকিত করছে। আমি একবার সামনে তাকাই, একবার পেছনে। ভাইয়া বললেন, পেছনে এতো তাকাবার কিছু নেই; সামনে দেখ। কে শোনে তার কথা! বড় ভাইয়া মন ভরে সিনেমা দেখছেন আর আমি ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে পেছনে দেখেই চলেছি।
কে বলে আমি বোকার হদ্দ! অল্পতেই মোটামুটি সিনেমা কী জিনিস তা বুঝে ফেললাম। মনে হলো বিষয়টি খুব জটিল নয়। অন্ধকারে সামনের বড় মঞ্চে সবাই এসে অভিনয় করে আর পেছন থেকে কেউ একজন লাইট ফেলে দর্শকদের জন্যে সে সব দৃশ্যমান করে। এই হলো সিনেমা। কিন্তু মুশকিল হলো দুএকটি বিষয়ের সমাধান মিলছিলো না। মঞ্চে চলমান গাড়ী, বাসা বাড়ীর ফার্ণিচার এসব কেমন করে আনে! আর টইটুম্বুর পানি ভর্তি নদীনালা, নৌকা এসবই বা আনে কেমন করে! আমি তো চিন্তা করেই যাচ্ছি। কিন্তু কোন কুল কিনারা করতে পারছি না। আমার মাথায় আর ধরে না। এক সময় ছবি শেষ হলো। বের হচ্ছি সবাই। লক্ষ্য করলাম অনেকেই এইমাত্র দেখা ছবির গান গুন গুন করে গাইছে, আগে পিছে দেখে চলো কাঁটা ফুটবে পায়, চোরা কাঁটা হলে পরে তারে খোলা দায়………
আমি সাংঘাতিক রকমের একসাইটেট। কখন বাসায় ফিরবো আর সবাইকে গল্প করবো! সিনেমা দেখে বাড়ীতে ফিরেছি। বাড়ী মানে গ্রামের বাড়ী। বাবার চাকুরীর সুবাধে ঢাকা শহর থেকে দূরে ধলা নামক গ্রামে থাকা হয় সে সময়। বাসায় ফিরে আব্বা আম¥ার কান ঝালাপালা করেছি; সমবয়সী সবাইকে বলে শেষ। যেন ছবি দেখিনি; এভারেস্ট জয় করে ফিরেছি। শাবানা কিভাবে নদীর পাড়ে নেচে নেচে গান করেছে, রাজ্জাক গোলাম মোস্তফা কিভাবে ঢিশুম ঢিশুম মারামারি করে গড়াতে গড়াতে নদীতে গিয়ে পড়েছে সে সব নিয়ে সারা বাড়ী মাতাচ্ছি।
এদিকে ছবির সবগুলো গান মুখস্ত করে একাকার। আমার গানের কোন গলাই নেই। গাইলে মনে হয় কবিতা পড়ছি। কিংবা কোন শিশু বুনো হাঁস ফ্যাস ফ্যাস শব্দ করে সুর তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারপরেও সবাইকে শুনিয়ে যাচ্ছি বেশ কসরত করে। কোন লাজ শরম নেই। যে কেউ বললেই শুনিয়ে দেই। আবার চেষ্টা করি রাজ্জাক শাবানার নাচের মুদ্রা অনুকরন করে দেখাতে। রাজ্জাকের নাচ কিছুটা সহজ, কিন্তু শাবানারটা কঠিন। কোমর দুলিয়ে কিভাবে যেন একটা চক্কর মারে সেটা পারছিলাম না। আবার মাটিতে এক পা ফেলে কোমর বাঁকা করে নাচে। হোক বা না হোক চেষ্টার কোন কমতি রাখি না। সাথে গান তো আছেই। কেবল আমি না; গাঁও গেরামের সবার মুখে মুখে ফিরছে সেই গান; সাধু আর শয়তানে যে ভাই দুনিয়ায় চলেছে লড়াই। কে সাধু, কে শয়তান কিছুই বলা যায় না। দেখে শুনে তাই, করো না যাচাই!! মুখ দেখে ভুল করোনা, মুখটা তো নয় মনের আয়না!!! চলবে……..
লেখক-উপদেষ্টা সম্পাদক,যুগবার্তা