আমার সিনেমা; আমাদের সিনেমা!!

227

-ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন ঃ
শেষ পর্বঃ আজো ভাবি ছবি দেখার এত নেশা ছিল কেন আমার! তখনকার দিনে দৈনিক পত্রিকা ছিল মোটে দুটি; একটি ইত্তেফাক আর অন্যটি দৈনিক বাংলা। আমি মাসিক হিসেবে রোজকার দৈনিক ইত্তেফাক রাখতাম। পড়তে পড়তে আর কিছুই বাদ রাখতাম না। এর সপ্তম পৃষ্ঠায় থাকতো সিনেমার বিজ্ঞাপন। এই পৃষ্ঠাটি সময় নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতাম। সারা দেশের কোন্ হলে কোন্ ছবি চলছে কিংবা পরবর্তী সপ্তাহে কোন্ ছবি মুক্তি পাচ্ছে সে সব আমার মুখস্ত ছিল।
সম্ভবত নাইনে পড়ি। আমি গ্রামের স্কুলে পড়ছি অথচ সাড়া জাগানো “ছুটির ঘন্টা” ছবিটি তখন ঢাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ছবিটি দেখার জন্যে মন খুবই হিস পিস করছে। কবে ছুটি পাবো, কবে ঢাকা যাবো আর কবে ছবিটি দেখবো এই ভাবনায় মন আমার অস্থির! আমি ঢাকা আসতে আসতে ছবিটা ঢাকা ছাড়িয়ে আশে পাশের শহরগুলোতে ঢুকে পড়েছে। ছুটির ঘণ্টা চলছে গাজীপুরের কালিগঞ্জের সিনেমায়। পূবাইলে আমাদের বাড়ী থেকে রেল লাইন ধরে হেঁটে ৫ মাইলের পথ। যেমন করেই হোক ১২টার শো ধরতে হবে। তাই কঠিন রৌদ্দুরের মাঝেও সকাল দশটায় দু’ভাই হাঁটা দিয়ে ১২টার মধ্যে সিনেমা হলের সামনে গিয়ে পৌঁছালাম।
মনে পড়ে খুবই কেঁদেছিলাম ছবিটি দেখে। আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী, সাথী মোদের ফুল পরী! অত্যন্ত জনপ্রিয় গানটি এই ছবির। ছবিতে সব শিক্ষার্থীরা গ্রীষ্মের ছুটি শুরুর আগের দিন দলবেঁধে গান গেয়ে খুবই মজা করে। একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাবো; নীল আকাশের সবুজ ঘাসে খুশীতে হারাবো! গানটি তখন সুপার হিট। গান গেয়ে সব ছেলেমেয়েরা বাড়ী ফিরে যায়। কিন্তু ছবির মূল চরিত্র ছোট্ট স্কুল ছাত্রটি স্কুলের লম্বা ছুটির আগের দিন ভুলক্রমে বাথরুমে আটকা পড়ে। এরপর আর বের হতে পারে না এবং সেখানেই তার করুন মৃত্যু হয়। এই ছিল ছবির কাহিনী। সত্যি সত্যি নারায়ণগঞ্জে ঘটা করুন কাহিনীর চিত্ররূপ ছিল ছুটির ঘন্টা ছবিটি।
তবে হেঁটে ছবি দেখতে যাবার ঘটনাটি সাহসী ঘটনাই ছিল। এমনি কঠিন সাহসী কাজ আমি আরো বেশ ক’বার করেছিলাম। বা-বামা পূবাইলে থাকেন। আমি ধলা থেকে ঈদের ছুটিতে পূবাইলে বেড়িয়ে আবার ধলা ফিরে যাচ্ছি। টঙ্গী জংশন থেকে সন্ধ্যা ৬টার ট্রেন ধরে রাত ৯টার মধ্যে ধলা পৌঁছাবো। টঙ্গী পৌঁছেছি তিনটার একটু আগে আগে। মোক্ষম সুযোগ আমার ছবি দেখার। সোজা চলে এলাম আনারকলি সিনেমায়। কাজী জহিরের “কথা দিলাম” ছবিটি চলছে। দারুন ছবি। ছবি দেখা শেষে রিক্সা নিয়ে টঙ্গী ষ্টেশনে আসতে না আসতেই ধলাগামী শেষ ট্রেনটা ছেড়ে দিল। আমি দৌঁড়েও উঠতে পারলাম না। মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেল। এই রাতে কোথায় থাকবো, কী করবো?
আবার রিক্সা নিয়ে চলে এলাম বাসস্ট্যান্ডে। বাসে চড়ে বসলাম। বাস চলছে জয়দেবপুরের দিকে খুবই জোর গতিতে। আর আমি সূরা ইউনুস পড়ে যাচ্ছি মন দিয়ে। তখনকার দিনে রাস্তায় জ্যাম ছিল না বিধায় টঙ্গী থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি আমার আগে জয়দেবপুর পৌঁছাতে পারেনি। এর আগেই আমি জয়দেবপুর ষ্টেশনে পৌঁছালাম। গা থেকে ঘাম ছেড়ে দিল।
এই জাতীয় অতি সাহসী কিংবা অন্যায় কর্মকান্ডে ধরা পড়লে বাবা-মা গালমন্দ করতেন; মাঝে মধ্যে উত্তম মধ্যমও দিতেন। তবে সাধারণত খুব বেশী বিপত্তি হতো না। ঘন্টা খানেক কান্নাকাটি করে সব ভুলে যেতাম। তবে একবার খুবই বাজে একটি কাজ করে ফেলেছিলাম। এতে যে বিপত্তি হয়েছিল তা আজ এই পত্রিকায় প্রকাশের আগে কেউই জানতো না। খুবই গোপন করে রেখেছিলাম এতদিন। আজ প্রকাশ না করে পারলাম না।
এসএসসির টেস্ট পরীক্ষার ক’দিন আগেই রমজান শুরু হয়ে যায়। পুরো রমজানে কোচিং শেষ করে ঈদ করতে বাবা-মায়ের কাছে যাচ্ছি। পরদিন সম্ভবত ঈদ। ২৯ শে রমজানের সকালে পূবাইলে এসে পৌঁছেছি। কথা ছিল সেবার ঢাকা নয়, পূবাইলে আমরা ঈদ করবো। বাসায় পৌঁছে দেখি আব্বা খুবই বিষন্ন মনে বসে আছেন। আমাকে দেখা মাত্র বললেন, এক্ষুনি ঢাকা মেডিক্যালে চলে যাও; তোমার নানাজান খুবই মূমুর্ষ। বলা যায় না কী হয়! অবস্থা মোটেই ভাল নয়। তোমরা দুইভাই কোনভাবে চলে যাও, আমি সন্ধ্যার ট্রেনেই আসছি। বাবার কথায় আদিষ্ট হয়ে রিক্সায় করে প্রথমে টঙ্গী এলাম। দু’ভাই মিলে ঢাকার বাস ধরতে যাবো; অমনি চোখ গেল সেই আনারকলির দিকে।
রমজানে তখন সারা দেশের হলে বিদেশী ছবি চলতো। “আজ কি আওয়াজ” একটি পাকিন্তানী উর্দূ ছবি; চলছে আনারকলিতে। ইবলিশ মাথায় ভর করলো। বাসে না ওঠে দু’ভাই টিকেট কেটে ছবি দেখতে ঢুকে পড়লাম। বেলা তিনটায় হল থেকে বেড়িয়ে বাস ধরে সোজা ঢাকা মেডিক্যাল। নির্ধারিত নাম্বারের রুগীর বেড খুঁজে ফিরছি। রুগীর হদিস নেই। একে ওকে জিজ্ঞেস করে যা জানলাম তা সাংঘাতিক ভয়াবহ। ঘন্টা কয়েক আগে নানাজান ইন্তেকাল করেছেন! আমরা ধপাস করে মাটিতে বসে পড়লাম।
শুনলাম ঢাকা মেডিকেল চত্বরে গোসল জানাজা দিয়ে গাড়ীতে করে লাশ নিয়ে গেছে কল্যানপুরে আমার মেঝখালার বাসায়। দিলাম ছুট। সন্ধ্যার আগে আগে পৌঁঁছালাম খালাম্মার বাসায়। কিন্তু কোন কাজ হয়নি; আমাদের পৌঁছাবার ঠিক মিনিট দশেক আগে নানাজানের লাশ নিয়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে গাড়ী রওনা দিয়ে চলে যায়! তখনও পশ্চিমাকাশে গোধুলীর লাল রং শেষ হয়ে যায়নি!
হা হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমাদের দু’ভাইয়ের আর কিছুই করণীয় ছিল না। কেউ জানে না আজকে কী ভয়ংকর অপরাধই না আমরা দু’ভাই করে এসেছি। কিন্তু আমরা জানি, জানে আমাদের আল−াহ। মনকে কিছুতেই বোঝাতে পারছিলাম না। ধিক্কার দিচ্ছিলাম নিজেকেই নিজে। বান্দা অপরাধ করতে করতে মাত্রা যখন ছাড়িয়ে যায় তখন আল্লাহপাক সহ্য করতে পারেন না। কোন না কোন শাস্তি তখন পাওনা হয়ে যায়। জানি না আল্লাহ আমাকে সেই শাস্তি দিয়েছেন কি না! তবে সেদিন থেকে আজো যে মানসিক শাস্তি আমি ভোগ করে চলেছি, এর থেকে আদৌ কোনদিন মুক্তি পাবো বলে মনে হয় না!! – লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা