আমার সিনেমা; আমাদের সিনেমা!!

332

-ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন
৩য় পর্বঃ সুজনসখী দেখে ফেরার পর আমাকে সিনেমার রোগে পেয়ে বসলো। পড়াশুনায় মন বসে না। কোন কিছু খেতে ভাল লাগে না। কেবলই মাথায় ঘুরপাক খায় সিনেমা। ধলা-গফরগাঁওয়ে তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। কেবল ৩৩ কেভি লাইন বসাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিহীন ধলা গ্রামের জমিদার বাড়ীতে বসে আমার সকল চিন্তা চেতনা কেবল সিনেমা নিয়ে। একদিন আব্বার সাথে হাটে গেলাম। প্রচুর মানুষ তখন হাটে আসতো। হাট বসতো শনি এবং মঙ্গলবার বিকেল বেলা। আব্বা হাটে নিয়ে এটা সেটা খাবার কিনে দিলেন। হঠাৎ চোখ গেল একটি বাক্সের দিকে। একজন মানুষ হাত দিয়ে কিছু একটা ঘুরাচ্ছে আর মুখ দিয়ে সুর করে গেয়ে যাচ্ছে গান। বাক্সের সামনে হাটু গেড়ে তিনজন মানুষ বাক্সের তিনটি মুখ খোলে চোখ লাগিয়ে কী যেন দেখছে। তাদের কোনদিকে কোন খেয়াল নেই। গভীর মনোযোগ দিয়ে তারা দেখেই চলেছে।
আব্বা বললেন, এটা বায়োস্কোপ; দেখবি? না বলার কোন ক্ষমতা কি আমার তখন ছিল? বায়োস্কোপ যে সিনেমার প্রথম রূপ তা তো আর আমি তখন জানতাম না। আব্বা বায়োস্কোপের মালিককে চারআনা দিলেন। আমি এক লাফে বাক্সের সামনে একটি মুখে গিয়ে চোখ লাগালাম। আমার সাথে আরো দুজন দর্শক তখন জুটে গেছে। ভীষন উত্তেজনা আমার মনের মধ্যে। ধলা বাজারে এই জিনিসও যে আছে এটা জানলে তো প্রতিদিনই আমি আসি! লোকটি গান গেয়ে গেয়ে ঘুরানো শুরু করলো, হায়রে কত সুন্দর দেহা গেছে, রঙ বেরঙের জিনিস আছে; হায়রে মজা লাইগ্যা গেছে! সাংঘাতিক রকমের মজার জিনিস! একটির পর একটি বড় বড় ছবি একদিক থেকে অন্যদিকে যাচ্ছে। রাজ্জাক, কবরী, শাবানা আরো কত কিছু। ক্ষুদিরামের ছবিটি আসতেই লোকটি গাওয়া ধরলো, হায়রে গেরাম বাংলার চাষী, ক্ষুদিরামের ফাঁসি! অল্প বয়সে ফাঁসি দিলো, বিনা দোষে মরতে হইলো।
চার আনা দিয়ে কেনা সময় কিভাবে ফুরিয়ে গেল টের পেলাম না। মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাসায় ফিরলাম বটে তবে মন আমার পরে রইল বায়োস্কোপের বাক্সের মাঝে। নাসিম ভাইয়াকে ধরলাম বায়োস্কোপ বানিয়ে দেবার জন্যে। ভাইয়া খুবই সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ। তিনি না করলেন না; আমার পাগলামো দেখে নেমে পড়লেন। তবে বায়োস্কোপ নয়; সিনেমা বানালেন। বাজার থেকে হুইল সাবানের ছোট কার্টুন আনলেন, অনেকগুলো সাদা কাগজ নিলেন; সাথে বে−ড, লম্বা তার সহ আরো অনেক কিছু। আর হারিকেন তো তখন ঘরেই ছিল। ভাইয়া সিনেমা মেকার আর আমি তার সহকারী।
প্রথমে একটি সাদা কাগজে ডাবল লাইন দিয়ে লিখলেন “ধুমপান নিষেধ”। পরেরটিতে “সুজনসখী”, তারপর “অভিনয়ে ফারুক, কবরী”। এর পর তাদের দুজনকে আঁকলেন। ভাইয়ার ছবি আঁকায় হাত অসাধারণ। এরপর বে−ড দিয়ে কেমন করে যেন সব লেখা এবং ছবি ডাবল লাইন দিয়ে কেটে কেটে তৈরী করলেন এক একটি ফ্রেম। তারটিকে ঘরের এক দেয়াল থেকে অন্য দেয়াল পর্যন্ত বেঁধে নিলেন এবং সবগুলো কাটা ফ্রেম বাঁধা তারের মাঝে ঝুলালেন। খাতা বানানোর দুটো চারকোনা সাইজের সাদা কাগজ জোড়া দিয়ে ঘরের এক পাশের দেয়ালে আঠা দিয়ে লাগিয়ে সিনেমার পর্দা বানালেন। এর পর কার্টুন এর সামনের অংশে ছোট চারকোনা করে কেটে ছিদ্র করে নিলেন। ব্যাস হয়ে গেল।
এবার ঘরের সব দরজা জালানা বন্ধ করে ঘরটিকে অন্ধকার করে নিলেন। তারপর চেয়ারের উপর সাবানের কার্টুনটি রেখে তার মাঝে ভরলেন একটি জ্বালানো হারিকেন। উপর থেকে কার্টুনের ঢাকনা লাগিয়ে দিলেন। কী অপূর্ব! কাগজের পর্দায় চারকোনা আকৃতির লাইট গিয়ে পড়লো। এবার তারে ঝুলানো এক একটি ফ্রেম হাত দিয়ে টেনে লাইটের সামনে আনছেন আর পর্দায় এক একটি ছবি ভাসছে। আমি খুশীতে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। শহরের সিনেমা হল এখন আমাদের বাসায়! বছরখানি পরে আমরা জমিদার বাড়ী ছেড়ে বাজারের রুছমত চাচার বাসায় উঠি। এর পরপরই এলাকায় বিদ্যুৎ চলে আসে। প্রথমে গফরগাঁও তার পরে ধলা বিদ্যুৎ পায়। আর গফরগাঁয়ে চালু হয় সাথী সিনেমা হল। এখনও অবিকল একই রকম আছে হলটি। মধুরিমা হলের অনেক আগে এর যাত্রা শুরু। সাথী সিনেমার মাইকিং চলে সারাদিন সবখানে। রিক্সায় ছবির পোষ্টার লাগিয়ে মাইকিং। আর ততদিনে আমি হারিকেন নয়, বিদ্যুতের আলোয় সিনেমা বানানোর পরিকল্পনায় মহা বিভোর।
ক্লাশ সেভেনে পড়ি। স্কুল আর পড়াশুনার ফাঁকে কেবল সিনেমার ফ্রেম কাটাকুটি নিয়ে সময় পার হচ্ছিল আমার। খুব তাড়াতাড়ি সিনেমা চালু করতে হবে। বাইরে বন্ধুদের অলরেডী ঘোষনা দেয়া হয়ে গেছে; ওরাও তাড়া দিচ্ছে। টিনের বেড়া ঘেরা আমাদের বাসার ভেতরে একটি অব্যবহৃত ছনের তৈরী পাকের ঘরও ছিল। রুছমত চাচা এমনি এমনি বানিয়ে রেখেছিলেন হয়ত। সেটাকেই সিনেমা হল বানিয়ে নিলাম। বিকেলে খেলার মাঠে অগ্রীম টিকেট বিক্রিও শেষ করে ফেললাম।
শো শুরু এবং শেষ করতে হবে সন্ধ্যের আগেই। না হলে বাসায় ফিরলে দর্শকদের বাবামা ঘরে ঢুকতে দেবে না। প্রথম শোতেই হাউজফুল; দর্শক পাঁচজন। কাইয়ুম, মিরাজ, মহসিন, দুলাল আর জুলফিকার। (এর মাঝে কাইয়ুম, জুলফিকার আজ বেঁচে নেই!) প্রতি টিকেট দশ পয়সা করে; বক্স অফিস হিট হবার পালা। হলের বাইরে পোষ্টার লাগিয়েছি। ছবির নাম “আসামী”। সাথী সিনেমায় তখন রাজ্জাক শাবানার আসামী ছবি দারুন হিট। আমি আর অন্য নাম খুঁজে পাবো কোথায়!
শো’র শুরুতেই বাতি নিভিয়ে হল ঘরটি অন্ধকার করে নিলাম। পর্দায় প্রথমে “ধুমপান নিষেধ” লেখা আসলো; শুরু হলো সবার তালি। আমি ভীষন ভাব নিলাম। এরপর জাতীয় পতাকা। আমি মুখ দিয়ে জাতীয় সংগীত গাইছি আর হাত দিয়ে পতাকার ফ্রেমটি কাঁপাচ্ছি; যেন পতাকাটি পর্দায় পত পত করে উড়ছে। ছবি শুরু হলো। প্রথমে ছবির নাম, “আসামী”। এরপরে নায়ক নায়িকার নাম। এরপরই পর্দায় ভাসলো নায়িকার ছবি; আর আমি গলা ছাড়লাম, ওরে ও ও পরদেশী! ও ও ও পরদেশী! যাবার আগে, দোহাই লাগে একবার ফিরে চাও! আবার তুমি আসবে ফিরে, আমায় কথা দাও!!!
ছবি শেষে লাইট জ্বালিয়ে দিলাম। এবার দর্শকদের বিদায়ের পালা। এক এক করে খুশীতে টগবগ করতে করতে চলেও গেল সবাই। বাসা থেকে পয়সা চুরি করতে পারলে সবাই আবার দেখতে আসবে এই আশ্বাসও দিয়ে গেল আমায়। প্রথম ছবির প্রথম শো’র সফল উপস্থাপনায় আমি যারপরনাই খুশী। মনের আনন্দে হলের মেঝেতে সদ্য জমা হওয়া ময়লা পরিস্কারের কাজে নেমে পড়লাম। সব কিছু গুছিয়ে জায়গা মত রাখতে যাবো অমনি আমার চক্ষু চড়ক গাছ। তারে ঝুলানো অন্তত তিনটি ছবির ফ্রেম হাওয়া!
এ তো অবিশ্বাস্য! কে করলো এই কাজ? আমি হাউমাউ করে কান্না শুরু করলাম। অনেক যতেœ অনেক কষ্ট করে বানানো ফ্রেমগুলো খুঁজে না পাওয়াতে অস্থির হয়ে উঠলাম। কিন্তু কোন কিছুতেই কোন কুল কিনারা হলো না। পরদিন সাত সকালে কাইয়ুমের বাসায় গেলাম। কাইয়ুম রাজী হলো সত্যি ঘটনা বলতে। তবে শর্ত দিল এর বিনিময়ে ওকে ফ্রি টিকিটে ছবি দেখাতে হবে।
অগত্যা রাজি হলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে আশে পাশে কেউ আছে কি না ভাল করে দেখে নিয়ে আমার কানে কানে বললো, আমি করি নাই; আনোয়ার হোসেন দুলাল আর মহসিন মিইল্যা এই কামডা করছে। এ পর্যন্ত শুনে সমস্যা হয়নি; আমি ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু যখন বললো, তিনটি ফ্রেমের একটিও আর অবশিষ্ট নেই; ছিড়ে কুটি কুটি করে পানিতে ফেলে দিয়েছে ওরা – শুনে মাথা আর সোজা করে রাখতে পারিনি। জ্ঞান কিভাবে ফিরেছিল সেটাও মনে নেই আজ। -চলবে…
-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা