আমার সিনেমা; আমাদের সিনেমা!!

196

-ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন
২য় পর্বঃ স্বাধীনতার পর পর বঙ্গবন্ধু সরকার পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী খুবই জোরদার করেছিল। এর আওতায় কিভাবে মানুষকে সচেতন করে জন্মহার রোধ করা যায় তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কোন এক বিকেলে মাঠে সবাই মিলে গোল−াছুট খেলছি। দেখলাম লোকজন ভর্তি দুটো গাড়ী এসে হাজির আমাদের সরকারি আবাসস্থলে। চারিদিকে হুলস্থুল পড়ে গেল। ভবঘুরে কল্যান কেন্দ্রটি এলাকায় আজো জমিদার বাড়ী নামে পরিচিত। তারা আসাতে বিশাল সেই জমিদার বাড়ী ঘটা করে সাজানো হলো; পোষ্টার আর ব্যানারে ছেয়ে দিল সব ভবন। একটা উৎসবের আমেজ বইতে শুরু করলো সবার মনের মাঝে।
সবাই বলাবলি করছে মাসব্যাপী চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হবে এখানে। প্রতিরাতে দেশ বিদেশের ছবি দেখানো হবে। শেখানো হবে কেন পরিবার ছোট রাখা দরকার। পরিপাটি পরিবার চালাতে গেলে কেন সুন্দরভাবে পরিকল্পনা করে চালাতে হবে তা হাতেকলমে শেখানোই এই কর্মসূচীর মূল লক্ষ্য। আমার বিস্তর সুযোগ এসে গেল চোখের সামনে বসে প্রতিদিন মুভি দেখার। যে মানুষটি রাত আটটার পর পর প্রজেক্টর নিয়ে বসতেন এবং মাঝ রাত অবধি চালাতেন তাকে আমরা ছোটরা “সিনেমা আঙ্কেল” ডাকতাম। আঙ্কেল আমাকে খুব আদর করতেন এবং তার পাশে বসিয়ে মুভি চালাতেন। আমি অবাক বিষ্ময়ে খুটিয়ে খুটিয়ে পূরো বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করতাম।
এভাবে এক মাসের মধ্যে আমি ভাল করেই বুঝে ফেললাম ফিল্মের খুঁটিনাটি। তখন বিদ্যুত ছিল না বিধায় ডায়নামো চালিয়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হতো। ডায়নামোর আলোয় অন্ধকার ঘুটঘুটে গ্রামের মাঝে জমিদার বাড়ীটিকে রাতের বেলায় ছোট শহরের মত লাগতো। পূরো মাস জুড়ে আমাদের মত কল্যান কেন্দ্রের লোকজন তো বটেই, আশে পাশের গ্রামের সব মানুষজনও আসতো প্রতিরাতে স্বপ্নের এই শহরে সিনেমা দেখতে। গভীর রাত অবধি চলতো দেশী বিদেশী নানা সিনেমার প্রদর্শনী।
ফারুক-কবরীর সুপারহিট সুজনসখী ছবির তখন জয়জয়কার। ঢাকা জয় করে কেবল ময়মনসিংহে এসেছে। শহরের পূরবী সিনেমা হলে চলছে। প্রতিটি শো হাউজফুল। দলে দলে লোকজন যাচ্ছে আর দেখে আসছে। রেডিওতে ১৫ মিনিট ব্যাপি ট্রেলর চলছে। লোকজন দোকানের সামনে ভীড় করে শুনছে। প্রতিদিন একই জিনিস শুনছে, তবুও মন ভরছে না; শোনার আগ্রহ শেষ হচ্ছে না। লোকজনের মুখে মুখে কেবল সুজনসখীর গল্প আর গান। বাজার, রেস্টুরেন্ট, বিয়ে বাড়ী, সামাজিক অনুষ্ঠান কোথায়ও বাদ যাচ্ছে না গানগুলো।
আমরা পরিবারের সবাই শহরে গেলাম ছবি দেখতে। তখন ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের ঠিক পিছনে ছিল তাজমহল রেস্টুরেন্ট। এখানে দূপুরে খাসির মাংশ দিয়ে ভাত খেয়ে অলকা, ছায়াবানী পার হয়ে পূরবীতে পৌঁছে দেখি ভীড়ে একাকার। দলের নেতৃত্বে আছেন কালাম ভাই এবং তার বন্ধুসকল। মানুষে গিজগিজ করছে। কোন টিকিট নেই; হাউজফুল। আমরা খুবই টেনশানে আছি। মজার মানুষ আজম ভাই কোথা থেকে কেমন করে যেন ব−্যাকে টিকিট ম্যানেজ করে ফেললেন। সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
ছবি চলছে। সরষে ক্ষেতে কবরী নেচে নেচে “গুন গুন গুন গান গাহিয়া নীল ভ্রমরা যায়; ও সেই গানের টানে ফুলের বনে ফুলের মধু উছলায় উছলায়” গেয়েও শেষ করেছে। কিন্তু সামনের সিটে বসা একজন দর্শকের কথা আর শেষ হয় না। কিছুটা মাঝারো গলায় শব্দ করে পাশের লোকের সাথে সে অগ্রীম গল্প বলে যায়। সাংঘাতিক বিরক্তিকর। কোন দৃশ্য আসার আগেই সে বলে দেয় এর পরে কী হবে। আজম ভাই সিট থেকে উঠে তার মুখ চেপে ধরলেন। দেখে সবাই হাসছে কিন্তু লোকটার সেদিকে সামান্য ভ্রুক্ষেপ নেই।
মনে আছে বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা টেলিসামাদের অনবদ্য অভিনয়। তার ঠোঁটে “ডেগেরও ভিতরে ডাইলে চাইলে উতরাইলে গো সই” এখনো মানুষের মুখে ফেরে। যতবার তিনি পর্দায় আসেন ততবার দর্শক তালি দেয়। সুজন হিসেবে ফারুক আর সখী হিসেবে কবরী কালজয়ী অভিনয় করেছিলেন। ফারুক বৈঠা বেয়ে নৌকা চালিয়ে গান গেয়ে যাচ্ছেন আর নদীর পাড় ধরে কবরী সখীদের নিয়ে নেচে নেচে এগুচ্ছেন।
শেষ দৃশ্যটি ছিল মারাত্মক। রেল লাইনের সেতুতে ফারুক-কবরী দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে আত্মহত্যার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে চলন্ত ট্রেন ছুটে আসছে প্রচন্ড গতিতে। সাংঘাতিক টেনশানে দর্শক। এই বুঝি এক্সিডেন্ট হয়ে যায়। ওদেরকে বাঁচাতে পরিবারের লোকজনসহ খান আতাও ছুটে আসছেন। একবার পর্দায় সুজনসখীকে, একবার চলন্ত ট্রেন আর একবার খান আতাদের দেখাচ্ছে। দর্শকের তো নাভিশ্বাস অবস্থা। ইস্ ইস্ করা শুরু হয়ে গেছে আশে পাশে। আমিও করছি! অবশেষে ট্রেনটা এসে পড়ার ঠিক আগ মূহুর্তে খান আতা এসে ধাক্কা দিয়ে সুজনসখীকে সেতু থেকে পানিতে ফেলে দেয়। আর দর্শক দেয় তালি এবং ফেটে পড়ে তুমুল উল−াসে।
তালি আর শেষ হয় না। তবে দুই পরিবারের মহা মিলনের পরে ছবি শেষ হয়। তখনকার দিনে ছবি শেষ হলে বলতো হল ভেঙেছে। আমাদের হলও ভাঙলো এবং আমরা বের হয়ে এলাম। সবার মুখ বিষন্ন। ভাল কোন কিছুর শেষে সবার মনই বিষন্ন হয়। দেখলাম গেটের বাইরে ৪ পৃষ্ঠার গানের বই বিক্রি হচ্ছে। সুজনসখী ছবির সবগুলো গান এতে লেখা আছে। না কিনে তো আর পারা যায় না। আম্মা আমায় কিনে দিলেন। আমি তো মহা খুশী। জল না চাইতেই বৃষ্টি।
ফেরার পথে ট্রেনে বসে বসে জনপ্রিয় সবগুলো গান মুখস্ত করে ফেললাম। এখনো মাঝে মাঝে আশে পাশে বাজতে শুনি, “সব সখীরে পার করিতে নেবো আনায় আনা, তোমার বেলায় নেবো সখী তোমার কানের সোনা; সখী গো, ও আমি প্রেমের ঘাটের মাঝি; তোমার কাছে পয়সা নেবো না!” কিন্তু সুজন সখীর যে গানটি আমার হৃদয় ছুঁয়ে ছিল সেইকালে; যে গানটি আমাকে দোলা দেয় এইকালেও, তা আর কোথাও আজকাল বাজতে শুনিনা। আজকের সমাজের জন্যে বড়ই অর্থবহ ছিল সেই গান; “আগুন জ্বলেরে, নিভানের মানুষ নাই; কাইজার বেলায় আছে মানুষ, মিলের বেলায় নাই; মনে আগুন জ্বলেরে!!!” চলবে…….
-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা