আমারো পরাণো যাহা চায়!!

189

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
এখন ডিসেম্বর শুরু; শীত আসছে। শীত প্রধান দেশে তো বটেই; গুটিকয় দেশ ছাড়া সারা পৃথিবীটাই এখন থেকে ছেয়ে যাবে কনকনে শীতে। জাকিয়ে বসবে শীত। আমাদের দেশেও শীতের প্রভাব ইদানিং খুব তীব্র হয়। শীতের প্রভাবে বেশ কিছু মানুষ গাঁওগেরামে মারাও যায়। গাঁওগেরামের মানুষের মুশকিল হলো, তারা গরমেও মরে, শীতেও মরে। শহরে বসে পত্রিকায় এই খবর পড়ে সবাই আফসোস করে বটে। তবে তাদেরকে দেখতে কেউ গ্রামে যায় না। গ্রামে যায় কেবল বিনোদনের জন্যে। সেটাও গরমে নয়; শীতে। গরমের গ্রাম হলো ভেজা কাঁদামাটির। গ্রাম শুকনো না হলে বিনোদন করা যায় না। তাই পিকনিকের নামে বিনোদন করতে সবাই শীতকালকেই বেছে নেয়।
এখন থেকেই শুরু হবে পিকনিকের লম্বা লাইন। কেবল গাড়ী আর গাড়ী। মাইকের লাউড স্পীকারে বাজবে গান কিংবা তারুন্যের হৈ হুলে−ার। মুশকিল হলো, সবাই প্রায় একই রকমের জায়গায় যায়; এবং একই রকমের খাবার খায়। কোন পিকনিকের দলে না যেয়েও জোতিষীর মত বলে দেয়া যায় তাদের খাবারের ম্যানুতে ছিল পোলাও বা বিরিয়ানী, মুরগীর রোস্ট, খাশি-গরুর রেজালা আর শেষে জর্দা ফিন্নি কিংবা দৈ মিষ্টি। পানীয় বলতে সফ্ট ড্রিংকস এবং মিনারেল ওয়াটার।
এসব তো বিয়ে বাড়ীর খাবার! বনভোজনের আমেজে বনজঙ্গলের পরিবেশে আমরা হিসেব করে ভিন্ন খাবারও তো আয়োজন করতে পারি। বিয়েবাড়ীর আলো ঝলমল টেবিলে যে খাবার মানায়, সে সব কি বনেবাঁদারেও মানায়? একই খাবারই যদি খাবো তাহলে কষ্ট করে বাসে চড়ে বনেবাঁদারে যেয়ে কেন খাবো? এসব নিয়ে একটু ভাবনা চিন্তার খুবই দরকার। একটু ভাবলেই বনভোজনের জন্যে চমৎকার ম্যানু করা যায়। রোস্ট পোলাও না করে কাবাব, গ্রীল চিকেন, গ্রীল ফিস করা যায়। সাথে নান, চাপাতি কিংবা পরাটা রেখে বনভোজনের আমেজ আনা যায়। ভাবলে আরো কত কী আনা যায়।
কেন জানি না আমরা জায়গা মত ভাবতে পারি না। অথচ ভাবা দরকার। এসব নিয়ে টকশো হয় না।টকশো হয় রাজনীতি নিয়ে। এই রাজনীতিই আমাদের শেষ করলো। মাথার যত ভাবনার শক্তি তা কেবল ঐ রাজনীতি নিয়ে। এক সঙ্গে তিনজন হলেই ব্যাস! শুরু হয়ে যায় রাজনীতির প্যাচাল। একবার শুরু হলে আর থামে না। মজার ব্যাপার হলো, যে রাজনীতিবিদদের নিয়ে জনগন এত ভাবে, সেই জনগনকে নিয়ে রাজনীতিবিদদের কোন ভাবনা নেই! পিকনিকের মত সামান্য বিষয় নিয়ে তাদের ভাবার তো প্রশ্নই আসে না।
বাড়ীতে বিশেষ কোন মেহমান আসলে, ঈদ বা বিশেষ কোন দিনে, নববর্ষ, কিংবা গায়ে হলুদ বা বিয়ে বাড়ী, অথবা বউ ভাত, বিবাহ বার্ষিকী, জন্মদিন বা কুলখানী কিংবা চলি−শা হলেও খাবারের ম্যানু ঐ একই; পোলাও, রোস্ট, রেজালা। আনন্দের সময় যা খাবেন, কষ্টের সময়ও তাই খাবেন? এটা একটা কথা হলো! ডাইনিং টেবিলে বসে যা পাবেন, জঙ্গলে বসেও তাই পাবেন। বিয়েতে পরপর চারদিন অনুষ্ঠান হয়। গায়ে হলুদের দুটি, একটি বিয়ে আর অন্যটি বউভাত। অথচ পর পর চারদিন একই খাবার দেখতে দেখতেই অসহ্য লাগে; মানুষ খাবে কেমন করে! অথচ খায়; খেতে বাধ্য হয়।
এসব না করে অনুষ্ঠান ভিত্তিক খাবারের আয়োজন করা জরুরী। অর্থাৎ অনুষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন রেসিপির ম্যানু করা যেতে পারে সহজেই। নিত্যদিন নতুন আইটেম, নতুন স্বাদ। কোন অরুচি আসবে না, অসহ্যকর হবে না। যেটাকে জাতীয় ম্যানু হিসেবে এক সময় দাঁড় করানো সম্ভব হবে। মানুষ আস্তে আস্তে স্বস্তি পাবে; সহজেই অভ্যস্ত হয়ে উঠবে এতে। এক খাবার খেয়ে খেয়ে কখনো আর ক্লান্ত হবে না। খাবার দেখলেই বলে দেয়া যাবে এটা কোন উপলক্ষ্যের খাবার। জাপানে ফুল দেখলেই বলা যায় এটা কোন অনুষ্ঠানের; কষ্টের না আনন্দের ফুল। গিফ্টের ইনভেলাপ বা খাম দেখলেই বলা যায় এটা বিয়ে বাড়ীর, নাকি চলি−শার। বায়োডাটা জমা দেবার খাম আর নববর্ষের শুভেচ্ছা খাম এক হয় না। কারো গায়ের পোষাক দেখলেই বলা যায় তিনি বিয়ে বাড়ী যাচ্ছেন নাকি মৃতের কুলখানিতে যাচ্ছেন। আর তাদের খাবার ম্যানু? এখানেও কাজ করে কঠিন ভাবনা, কঠিন কালচার।
এভাবে গবেষনা করে করেই জাপানী জনগন জাতীয় কালচার বানিয়েছে। একটি জাতিকে প্রকৃত অর্থে সভ্য হতে হলে এর যাবতীয় বিষয়গুলো নিয়ে একাডেমিক গবেষনার দরকার হয়। যার একটি গবেষনাও আমাদের দেশে আজ অবধি হয়নি। আমাদের দেশে একাডেমী আছে, গবেষনাগার আছে। কেবল গবেষনা নেই; এটা দুঃখজনক। তারা গবেষনা করবেন কখন? পদার্থের শিক্ষক রাত গভীরে টকশোতে এসে রাজনীতির প্যাচাল পারেন; রাতে তো আর ঘুমুতে পারেন না। তাই দিনে ঘুমিয়ে পুষিয়ে নেন; গবেষনার সময় কখন!
অথচ চমৎকারভাবে গবেষনা করে করে জাপানীরা দেশটিকে সাজিয়েছে; ঠিক চিত্রকর যেভাবে সাজায়। আপনি কোন একটি রেলস্টেশনে নামলেন। গোটা বিশেক খাবার দোকান পাবেন। প্রতিটি দোকানই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন নামের, ভিন্ন খাবার ম্যানু নিয়ে চলছে। এক কথায় এক এলাকায় একই ধরনের ২য় খাবার রেস্টুরেন্ট নেই। রেস্টুরেন্ট আলাদা, খাবারও পূরোপুরি আলাদা।
ঠিক ভিন্ন চিত্রটি আমাদের দেশে। সারাদেশে মোটে দুই ধরনের রেস্টুরেন্ট; বাংলা এবং চায়নীজ। (ইদানীং অবশ্য ফাস্টফুড চালু হয়েছে; ফ্রাইড চিকেন খাবার ধুম পড়েছে।) যে সব রেস্টুরেন্ট বাংলা, সে সবের ম্যানু হুবহু এক। আপনি গিয়ে বসলেই একজন ওয়েটার টেবিলে পানিভর্তি গ−াস রেখে দাঁড়াবে। কী আছে জানতে চাইলেই এদিক ওদিক তাকিয়ে মন্ত্রের মত বলে যাবে, ভাত, বিরিয়ানী, কাচ্চি, খিচুরী, গরু, খাশি, মুরগী, রুই কাতলা, মিরগা, বোয়াল, চিতল, ভেটকি, পাবদা, শিং কৈ, মাগুর। লগে চাপাতি, নান, গরু-খাশির পায়া। আর আছে পরাটা, সিঙ্গারা, সমুচা, মোগলাই, পুরি। কোনটা খাইবেন স্যার? এক রেস্টুরেন্টেই সব রাখতে হবে যেন অন্য কোথায়ও কেউ যেতে না পারে।
আবার যে সব রেস্টুরেন্টের নাম চায়নীজ, সেসবের ম্যানুও এক এবং একেবারে অভিন্ন; সারা চায়না ঘুরেও এর একটি ম্যানুও পাবেন না। তবে আমাদের দেশে গর্জিয়াস ডেকোরেশন পাবেন। আপনি গিয়ে বসলেই একটি ম্যানু বই ধরিয়ে দেবে। এত এত খাবারের নাম; সব ইংরেজীতে। অবশ্য বাংলায় লেখা হলেও পড়ে আপনি কিছুই বুঝবেন না। ম্যানু পড়ে বোঝার উপায় নেই খাবারটি আসলে কী এবং একটি আইটেমে কজনা খেতে পারবে। আপনি ম্যানুবুক নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকবেন; কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কিছুক্ষন পর গলায় টাই ঝুলানো স্টুয়ার্ড এসে বলবে, আর ইউ রেডী টু অর্ডার নাউ, স্যার? বাংলা রেস্টুরেন্টে এদেরকে ওয়েটার বললেও চায়নীজে ওয়েটার বলা যাবে না। আপনি স্টুয়ার্ডকে নিশ্চিত দেবেন সেই গদবাঁধা অর্ডার; প্রথমে উনথন এবং স্যুপ দেন; একটা ভেজিটেবল আর একটা থাইস্যুপ। সাথে ফ্রাইড রাইস, ফ্রাইড চিকেন এন্ড ভেজিটেবল কারী! ব্যস হয়ে গেল। এভাবেই চলছে যুগের পর যুগ।
আমরা এভাবেই অভ্যস্ত। এটাই আমাদের নিয়তি। এটা বদলাবার জো নেই; এটা দেখার কেউ নেই। আমাদের পরাণে যাহাই চায় না কেন এর থেকে আমাদের মুক্তি নেই। ভারত আমেরিকায় যে নামে যে খাবারই আসুক বাংলাদেশে সেটা চালু হয়ে যাবে। পূরান ঢাকায় শাহী খাবারের নামে নতুন যে আইটেম আসবে সারাদেশ সেটাই লুফে নেবে। আর দেশীয় খাবারের হাজার পদ পড়ে থাকবে লোকচক্ষুর আড়ালে অযতেœ, অবহেলায়। আজকাল বাংলাদেশে প্রকৃত বাংলা খাবার বলতে তেমন কিছুই নেই। ভারতীয়, আমেরিকান আর চায়নীজের ভীড়ে বাংলা খাবার হারিয়ে যাচ্ছে। কবে কোন্দিন এই তিনজাতির ভীড়ে বাঙ্গালী নিজেই হারিয়ে যাবে কে জানে!!! -লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা