আমাদের তো আর কোন উপায় নেই!!

104

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। আঁকাবাঁকা লম্বা লাইন। একটি দু’টি নয়, পাশাপাশি তিন তিনটি লাইন; একেবারে চাপাচাপি করে, গা ঘেঁষে। তিনটি লাইন এই কারনে যে, চারটি লাইন করার কোন সুযোগ নেই; বিন্দু মাত্র জায়গা নেই। থাকলে চারটি লাইনই করতে হতো। গুলশানের প্রধান একটি রাস্তার ধারের লাল রংয়ের দোতলা বাড়ীর চার ফিট চওড়া দরজাটির সামনে তিনটি লাইনে দাঁড়িয়ে আমরা শ’খানেক লোক। তীর্থের কাকের মত দাঁড়িয়ে। আমরা দাঁড়াতে বাধ্য। কেননা আমি সহ সকলেই ভিসা প্রার্থী। ইউরোপের ভিসা।
আমার শোনিম সাথে নেই বলে কিছুটা স্বস্তিতে ছিলাম। এত চিপাচিপির মধ্যে ওকে নিয়ে দাঁড়াতে হলে খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো। বিব্রত না হলেও সাত সকালে বাসা থেকে আসার সময় শোনিম বিরক্তি নিয়ে বলছিল, কোন দেশে যেতে চাইলেই ভিসা লাগে কেন? পৃথিবীতে এতো দেশ কেন? এত ভাষা কেন? সব মানুষ একই ভাষায় কথা বলে না কেন? ও দিন দিন বড় হচ্ছে আর কঠিন এবং তীর্যক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে সমাজের দিকে। সমাজের এতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। ভ্রুক্ষেপ থাকবে কি! সমাজ চালায় বড়রা। বড়দের এসব ভাবার সময়ও নেই, ভাবেও না। ভাবে শিশুরা; তাদের অফুরন্ত সময়। সমাজের কোন অসংগতি তাদের চক্ষু এড়ায় না।
চক্ষু বড় কঠিন জিনিস। সাইজে ছোট হলে কি হবে, আশেপাশের বড় বড় সবকিছুই দেখে। চার ফিট দরজার ঠিক মাঝামাঝি একটি ফুটো আছে। ছোটখাট ফুটো; কেবল একটি চোখ কোনমতে দেখা যায়। আমরা যারা লাইনের সামনে দাঁড়ানো সবার সকল চক্ষু কেবল ওই ফুটোর দিকে। ভেতরে থেকে কখন কোন দয়াশীলের চক্ষু দেখা যায় এই আশায়। ভেতরে ডিউটিতে আছে বাঙালী হামভরা দারোয়ান। ভাবসাবে মনে হয় এফবিআই এর সদস্য। আসলে গেইট কীপার। দরজার ফুটো দিয়ে আমাদের এমনভাবে চক্ষু দিয়ে দেখে যেন মনে হয় আমরা সিরিয়ার আই এস। অনেকক্ষন পর পর ওই ফুটোতে কারো চক্ষু দৃষ্টিগোচর হলেই আমরা নড়েচড়ে উঠি। আশায় দোলে উঠি; এই বুঝি দরজা খোলবে।
একজন একজন করে দরজা দিয়ে প্রবেশ করাচ্ছে। এরপর আবারও দরজা লাগিয়ে শুরু হয় দেহ তল্লাশী। মানি ব্যাগ তো ভাল, জুতার তলাও বাদ রাখছে না তল্লাশী থেকে। আমার আগামাথা সব চেক করে শেষে বলে, পেন্ট খোলেন। মহা সমস্যা। ভিসার সিল কি এখানেই মারবে নাকি? আগে জানতাম পাসপোর্টে মারে! যাই হোক; বললাম, ভাই, পেন্ট খোলবো কেন? ভিসা কি ওকে? এখনি মেডিক্যাল করবেন? লোকটি বললো, সরি স্যার। বলতে ভুল হয়ে গেছে। পেন্ট নয়, বেল্টটা একটু খোলবেন প্লিজ!
বেল্ট না হয় আমাকে খোলতে বলেছে। বাইরে অনেক মেয়েদেরও দেখলাম। এদেরকে কী বলবে? সবাই না হলেও দু’একজন আছে যারা ভিসার কপালে থুথু দিয়ে কষে গালে দু’খানা চড় বসিয়ে দেবে। অসভ্যতার একটি মাত্রা থাকে। এরা সেটিরও লঙ্ঘন করছে। এটাই কি ইউরোপিয়ান সভ্যতা? আমাদের মেয়েদের তো চেনে না! ক্ষেপে গেলে এরাও যে কতটা প্রতিবাদী হতে পারে তা ওদের প্যাদানী না খেলে বুঝবে না।
দেশের মহিলারা এখন আর আগের মত নেই। নীরবে চোখ বুঝে সব কিছু সব সময় হজম করে না। সুযোগ পেলেই তারা প্রতিবাদ করে। তেমনি প্রতিবাদী একজন ভার্চুয়াল মানুষ আছে আমার। প্রচন্ড সম্ভাবনাময়ী, মেধাবী এবং সাহসী ভার্চুয়াল বন্ধু! কোনদিন সামনাসামনি দেখিনি তাকে। দেখার সামান্য সম্ভাবনাও নেই; সখও নেই। কথাবার্তা একটু ডানবাম হলেই যে ঝাড়ি দেয়, তাতে সখ থাকার কথাও না। তবে সে বন্ধু মানতে নারাজ। তার সোজাসাপটা কথা, নাউজুবিল্লাহ! ছেলেমেয়ের আবার বন্ধুত্ব কি? বড়জোড় পরিচিত হিসেবে মানতে রাজি। কী ছেলে, কী বুড়ো মোটামুটি আপনারা পুরুষেরা সবাই একই পদের। প্রথমে মিঠা মিঠা নীতি কথা বলেন। তারপরেই আসল রূপ। আকাশ, বাতাস….. চাছাছোলা সব কথা। রসকস নেই। সুযোগ পেলেই ঝাড়ি মারার মহা ওস্তাদ।
গেইট কীপারের হাত থেকে কোনমতে পার পেয়ে দ্বিতীয় কক্ষে যেতেই অনেকটা একই রকমের ঝাড়ি মারা একজন বাঙালী মহিলাকে পাওয়া গেল। লাস্যময়ী রমনী বটে তবে কোনদিন হেসেছে বলে মনে হয় না। খুবই বিরক্তি নিয়ে আমার সকল ডকুমেন্ট চেক করলো। কমপক্ষে দু’টো ঝাড়িও মারলো। ডকুমেন্ট এত বেশী কেন, এত আনার দরকার কি? এসব নিয়েই তার ঝাড়ি। ভাবসাব যা দেখালো তাতে তাকেই ভিসা অফিসার মনে হল। পরে বুঝলাম সেও গেইট কীপার। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর তার অশেষ কৃপায় তৃতীয় কক্ষে প্রবেশের অনুমতি পেলাম।
কক্ষে বসার জন্যে যে ক’টা চেয়ার পাতা আছে, ভিসাপ্রার্থী আছে তার তিনগুন। অনেকের সাথে আমিও দাঁড়িয়ে আছি। বসতে দেবার মত সৌজন্যটুকুও দেখাচ্ছে না এই ইউরোপিয়ান দেশটি! ভিসা কাউন্টারও মোটে তিনটে। আমরা ডাকের অপেক্ষায়। সহজে কি আর আমাদের ডাক পড়ে! একজন একজন করে ডেকে নিয়ে যায় আর শুরু করে জেরা। জেরা মানে জেরা, রিমান্ডের জেরা। প্রশ্নবানে একাকার করে ফেলে। ওদের সকল প্রশ্নের একটাই জিজ্ঞাসা, ইউরোপে যাবার এত খায়েশ কেন?
আমি অসহায়! আমি বলতে পারি না, আমার দেশে তোমার দূতাবাস খোলার এত খায়েশ কেন? আমার দেশের সাথে তোমার দেশের সম্পর্কের দরকারটা কি? তোমাদের উদ্দেশ্য কি? তোমাদের দূতাবাসের দশটা কাজের অন্তত একটা হলো ভিসা দেয়া। এই কাজে এত বিরক্তি লাগে! তাহলে তোমাদের কাজটা কি ? কাজ কি কেবল সরকারকে ধাক্কা দেয়া? রাস্তায় নেমে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলা? বাংলাদেশের গনতন্ত্র আর মানবাধিকার নিয়ে সবক দেয়া? আমাদের মানবাধিকার নিয়ে তোমাদের দরদ তো সকাল থেকে তোমাদের দরজায় পাড়া দিয়েই টের পাচ্ছি! কোথায় এখন তোমাদের মানবাধিকারের বকবকানি? তোমরা কি আমাদের প্রভু যে ভিসা দেয়ার নাম করে ভৃত্যের মত হেনস্থা করবে?
বলতে পারিনি! আমার বেজায় সাহসী ফেসবুক বন্ধুর মত সাহস আমার নেই। আমি ভীতু; পুলিশকে ভয় পাই। বলার আগেই ডেকে পুলিশে দেবে। তাই তাড়াতাড়ি ভিসা ফি জমা দেয়ার জন্যে বেরিয়ে পড়ি। হেনস্থার শেষ স্তর ভিসার টাকা জমা দেয়া। জমা দিতে হবে দূরের ব্যাংকে যেয়ে আর রসিদ নিয়ে ফিরতে হবে ওদের সময় সীমার মধ্যে। ফাজলামোর একটা মাত্রা থাকে। ওরা সেই মাত্রাটিও মানে না। ব্যাংকের একটি ছোট কাউন্টার ভিতরে রাখলেই পারে! রাখবে না। রাখলে প্রভুগিরি দেখিয়ে হেনস্থা করবে কিভাবে!
ফেরার সময় আবারো সেই লাস্যময়ী মহিলার সাথে দেখা। এবার একেবারেই ভিন্ন চেহারা; ভিন্ন চাহনি! হাসিতে যেন মুক্তা নয়, হীরা ঝরছে। এমনভাবে আগ বাড়িয়ে নিজ থেকেই কথা বলছে যেন আমি তার তিন জনমের চেনা। দিতে মন না চাইলেও ভদ্রতার খাতিরে ধন্যবাদ দিলাম। মুচকী হেসে তিনি বললেন, খালি ধন্যবাদ দিলে কি হবে? আর কিছু কি দেবেন না! না বোঝার ভান করলাম প্রথমে। তিনি পরিষ্কার করলেন। বললেন, মিষ্টি খাওয়াবেন না! এবার বুঝলাম; বুঝলাম বখশিস চাচ্ছে। তাও সিসিটিভি ক্যামেরার সামনেই চাচ্ছে। ভাবলাম এখানকার সিস্টেমই বখশিস দেয়া। তাই দিলাম। ভয়তে দিলাম। সোনার হরিণ ভিসার ভয়তে।
তবে আমি বুঝতে পারলাম না, বখশিস ওদেরকে দিলাম, নাকি সাদা চামড়ার কাউকে! সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে বখশিস নেবার ব্যাপারটি আমাকে কঠিন প্রশ্নের সামনে এনে দাঁড় করালো। ভিসা ফি হিসেবেও জনপ্রতি দশ হাজার করে দিয়েছি। প্রতিদিন দুই’শ লোকের কাছ থেকে ওদের বারো লাখের মত আয় হয়। মাসে আড়াই কোটি! এরপরও বখশিস লাগে! পৃথিবীর সকল ধনী দেশ সকল গরীব দেশে এ্যাম্বেসী বসিয়ে এভাবে কোটি কোটি ডলার আয় করছে।
বিনিময়ে ভিসা না দিলেও দিচ্ছে হয়রানী। একটি ভিসার জন্যে ভিসা প্রার্থীকে মোটামুটি একমাস দৌঁড়াতে হয়। আর দিতে হয় কাগজ আর কাগজ। এই কাগজ, সেই কাগজ। এতেও হয় না। এরপর দিতে হয় ইজ্জত, পরে ইন্টারভিউ; তারপরে ভিসা ফি দিয়ে শেষমেষ দিতে হয় বখশিস।
কিন্তু ওদের কিছুই দিতে হয়না। যার জন্যে এত কিছু, সেই ভিসা প্রাপ্তির কোন নিশ্চয়তাটুকুও দেয় না। একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে ঝুলিয়ে রাখে আরো বিশ দিনের জন্যে। কাগজ হাতে নিয়ে আমরাও দোলতে থাকি, ঝুলতে থাকি! আমাদের তো আর কোন উপায় নেই!! ধুকু ধুকু বুকে দোলা আর ধিকি ধিকি চোখে ঝুলে থাকার জন্যেই তো সোনার এই বাংলায় আমাদের জন্ম!!!!! -লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা