আত্মঘাতী সব জঙ্গীর শেকড় মূলত জামায়াত-শিবির

যুগবার্তা ডেস্কঃ দেশে বিভিন্ন নামে যেসব জঙ্গী সংগঠন গড়ে নাশকতা, আত্মঘাতী তৎপরতা চালাচ্ছে নেপথ্যে থেকে তাদের সংগঠিত করছে জামায়াত-শিবির। তারা নাম-পরিচয় বদল করে নানা কায়দায় চালাচ্ছে নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক তৎপরতা। জেএমবি, নিউ জেএমবি বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ যেসব জঙ্গী সংগঠন বাহারি নামে আত্মপ্রকাশ ঘটাচ্ছে তা আসলে জামায়াত-শিবিরের নতুন নাম। চলতি বছরের চার মাসে আলোচিত কয়েকটি জঙ্গী আস্তানায় অভিযান চালানোর পর যারা আত্মঘাতী হয়ে নিহত হয়েছে তাদের সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার-কর্মীরা দলে দলে নাম পরিচয় পাল্টে জঙ্গী সংগঠনে যোগ দেয়ার তথ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।
গত চার মাসে সারাদেশে যে আলোচিত জঙ্গী আস্তানায় অভিযান চালানোর পর আত্মঘাতী হয়ে নিহত হয়েছে এবং যারা গ্রেফতার হয়েছে তাদের ওপর অনুসন্ধান করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। এর মধ্যে সর্বশেষ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জঙ্গী আস্তানায় পরিচালিত অপারেশন ‘ঈগল হান্ট’ চলাকালে নিজেদের বোমা বিস্ফোরণে নিহত রফিকুল ইসলাম আবু ওরফে আবুল কালাম আজাদ ওরফে আবু শ্বশুরবাড়ির লোকদের সংস্পর্শে জঙ্গী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হওয়ার তথ্য পেয়েছেন তারা। জঙ্গী আস্তানার অভিযান শেষ হওয়ার আগেই নিহত আবুর শ্বশুরবাড়ির লোকজন গা ঢাকা দেয়।
পুলিশের বিশেষ ইউনিট কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের শিবনগর-ত্রিমোহনী গ্রামের জঙ্গী আস্তানায় পরিচালিত অপারেশন ঈগল হান্ট চলাকালে নিজেদের বোমা বিস্ফোরণে নিহত রফিকুল ইসলাম আবু ওরফে আবুল কালাম আজাদ ওরফে আবু শ্বশুরবাড়ির লোকদের মারফত জঙ্গী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন জামায়াত-শিবিরের মতাদর্শে বিশ্বাসী। তিনি বলেছেন, নব্য জেএমবির আরও কিছু আস্তানা থাকতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি। তবে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এবং দেশের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে সেসব আস্তানা চিহ্নিত করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সিলেটের মৌলভীবাজারের নাসিরপুরে জঙ্গী আস্তানায় পরিবারের সাত সদস্যকে নিয়ে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত হওয়া লোকমান আলী জামায়াত শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে এক সময় সম্পৃক্ত ছিল। বেশ কয়েক বছর আগে সে জঙ্গীবাদী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। কয়েকবার পুলিশ তার খোঁজে বাড়িতে এলে সে উধাও হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরেই সে এলাকা থেকে লাপাত্তা ছিল। এমনটাই জানিয়েছেন তার প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের সদস্যরা জানান, লোকমান ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। জঙ্গী সম্পৃক্ততায় জড়িত থাকায় পুলিশ বেশ কয়েকবার লোকমানকে গ্রেফতারের জন্য অভিযানও চালিয়ে তাকে ধরতে পারেনি।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দিনাজপুর জেলা জামায়াতের দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনের নেতৃত্বে মাঠে সক্রিয় আছে আত্মঘাতী দশ জঙ্গীর একটি ভয়ংকর সেল গঠন করে জঙ্গী তৎপরতা চালানোর তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। এরা সবাই নতুন ধারার বা নিউ জেএমবির সঙ্গে জড়িত এবং এক সময় শিবিরের রাজনীতি করত। সেলটির নেতা সাজ্জাদ শিবির ক্যাডার হিসেবেও পরিচিত। আটক তিন জঙ্গীকে জিজ্ঞাসাবাদে উত্তরাঞ্চলের এই আত্মঘাতী সেলটির তথ্য পান গোয়েন্দারা। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় আটকের কয়েকদিন পর ময়মনসিংহে বন্দুকযুদ্ধে নিহত জঙ্গী শফিউল ইসলাম ডনের কাছ থেকেও এ বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়। শফিউলের তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি দিনাজপুর থেকে গ্রেফতার সাহাবুদ্দিন শিহাব রকি ও কল্যাণপুরের জঙ্গী আস্তানা থেকে গ্রেফতার জঙ্গী রাকিবুল হাসান রিগ্যানের কাছ থেকেও তথ্য পান গোয়েন্দারা, যা থেকে বেরিয়ে আসে জামায়াত নেতা সাজ্জাদ হোসেনের নেতৃত্বে থাকা ভয়ংকর দশ আত্মঘাতী জঙ্গীর তথ্য। সাজ্জাদের সেলের সদস্য আরিফুল ও আনারুল পীরগঞ্জে পাগলী হত্যা মামলায় জেলহাজতে। এরা নিউ জেএমবির কিলিং মিশন সেলের আত্মঘাতী সদস্য এবং সবাই শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। শোলাকিয়া হামলার ঘটনার পর নিহত জঙ্গী শফিউল ইসলাম ডন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের দক্ষিণ দেবীপুরের আবদুল হাইয়ের ছেলে। দক্ষিণ দেবীপুরে জামায়াত নেতা সাজ্জাদেরও বাসা। জঙ্গী শফিউলের বাবা আবদুল হাই স্থানীয় জামায়াতে যোগ দেয় সাজ্জাদের হাত ধরেই। নিহত জঙ্গী শফিউল ছিল দিনাজপুর জেলার হাকিমপুর থানার বিজুল মাদ্রাসার ছাত্র। তার আগে শফিউল জঙ্গী রঞ্জু, আক্তারুল ও মাসুদের সঙ্গে ঘোড়াঘাট থানার রানীগঞ্জ রামেসাপুর মাদ্রাসায় একই সঙ্গে লেখাপড়া করত। এক সঙ্গেই এরা কিলিং মিশনের প্রশিক্ষণ নেয়। জামায়াত নেতা সাজ্জাদ বর্তমানে গা ঢাকা দিয়ে আছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গুলশানের হলি আর্টিজানে ভয়াবহ হামলার সঙ্গেও শিবিরের দুজন সংগঠকের নাম উঠে আসে। তাদের মধ্যে একজন গুলশান হামলার সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নুরুল ইসলাম মারজান (পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত)। সে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের সাথী ছিল। সে ছিল এই হামলার অপারেশন কমান্ডার। অপরদিকে গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলাকারী আত্মঘাতী সাত জঙ্গীর মগজ ধোলাইয়ের প্রশিক্ষক রায়হান কবির ওরফে তারেক আগে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। কল্যাণপুরে জাহাজ বিল্ডিংয়ে জঙ্গী আস্তানায় পুলিশের অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে সে মারা যায়। এর বাইরে নব্য জেএমবির আরও চার দুর্র্ধষ জঙ্গীর শিবির কানেকশনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা। তাদের মধ্যে তিনজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। একজন রয়েছে কারাগারে। নব্য জেএমবিতে শিবিরের আরও সাবেক নেতাকর্মী যোগ দিয়েছে বলে গোয়েন্দারা ধারণা করছেন। সাভারে দুর্র্ধষ ব্যাংক ডাকাতি, গাবতলী ও আশুলিয়ার চেকপোস্টে হামলা চালিয়ে পুলিশ হত্যা এবং পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে শিয়া মসজিদে হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত দুর্র্ধষ জঙ্গী আলবানী ওরফে হোজ্জা ওরফে শাহাদত ওরফে মাহফুজও আগে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এই দুর্র্ধষ জঙ্গী গত বছরের জানুয়ারিতে গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়। সে নব্য জেএমবির সামরিক কমান্ডার ছিল। গাবতলীতে পুলিশ চেকপোস্টে হামলার সময় হাতেনাতে গ্রেফতার মাসুদ রানাও বগুড়ায় শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল।
গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার-কর্মীরা নাম পরিচয় গোপন করে নানা কায়দায় সংগঠিত হয়ে জঙ্গী সংগঠনের ছাতার নিচে গিয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে, যার অনুসন্ধান করে তথ্য পাওয়া গেছে। দেশে অস্তিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে জামায়াত-শিবিরই বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে জঙ্গী হামলা ও জঙ্গী তৎপরতা চালাচ্ছে। জঙ্গী মানে জামায়াত-শিবির, জামায়াত-শিবির মানেই জঙ্গী, মানুষ খুন এবং নাশকতা করাই তাদের কাজ। এ পর্যন্ত যেসব জঙ্গী গ্রেফতার হয়েছে তাদের অনেকেই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। বিশ্বের কাছে দেশের ভাবমর্যাদা বিনষ্ট করতে এবং দেশে অস্তিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতেই জামায়াত-শিবির জঙ্গী হামলায় জড়িত রয়েছে। তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে কখনও আল কায়েদা, জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, নিউ জেএমবি বিভিন্ন জঙ্গী নামে অস্থিতিশীল করার পাশাপাশি সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, দেশে বড় ধরনের নাশকতার ছক আঁটছে জামায়াত-শিবিরের নেতারা। তারা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যোগাযোগ করছে একাধিক জঙ্গী সংগঠনের প্রশিক্ষিত সদস্যদের সঙ্গে। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠনের সদস্যদের আত্মঘাতী হওয়ারও প্রলোভনও দেখানো হচ্ছে। এ লক্ষ্যে দেশ-বিদেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বিপুল টাকা। নাশকতার মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করাসহ সরকারকে চাপে ফেলতে ভয়াবহ এ ষড়যন্ত্রের খেলায় মেতে উঠে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার-কর্মীদের জঙ্গী সংগঠনের মাধ্যমে সংগঠিত করে চলেছে।-জনকণ্ঠ