আট বছরে ৪৩৯৯ শ্রমিক নিহত

49

যুগবার্তা ডেস্কঃ ২০০৮ থেকে ২০১৫—এই আট বছরে দেশে ৪ হাজার ৩৯৯ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। এ সময়ে দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১০ হাজার ৪১ জন শ্রমিক।
শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক সমীক্ষায় এ চিত্র উঠে এসেছে। সংবাদপত্র প্রতিবেদন ও নিজেদের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিলস।
কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু ২০০৬ সালে তৈরি শ্রম আইনে নিহত শ্রমিকের পরিবারের জন্য এক লাখ ও আহত শ্রমিকের জন্য ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এক দশকেও তা বাড়েনি।
শ্রমিক সংগঠন ও তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়। এ বিষয়ে সরকারে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। আর দুর্ঘটনায় এক দশক আগে তৈরি ক্ষতিপূরণের পরিমাণ শুধু অন্যায্যই নয়, অন্যায়ও। এর পরিমাণ বাড়ানোর জন্য তাগিদ দেন তাঁরা।
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক বলেছেন, কর্মক্ষেত্রে সরকারি পরিদর্শন আগের চেয়ে বেড়েছে। তবে এ কথা স্বীকার করছি, তা পর্যাপ্ত নয়।
বিলস ১৫টি আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের দুর্ঘটনার চিত্র তুলে ধরেছে তাদের সমীক্ষায়। এর মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্প খাতে আট বছরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৭২ জন নিহত হন। ২০১৩ সালে রানা প্লাজার ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিহত হন ১ হাজার ১৩৩ জন। পোশাকশিল্পে এ সময় দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকের সংখ্যা তিন হাজার ৭০০।
বিলসের হিসাব, গত আট বছরে দুর্ঘটনায় পরিবহন শ্রমিক নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ২৮২ জন। তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা এটি। এ সময় আহত পরিবহন শ্রমিকের সংখ্যা ২৪৮। দেখা যায়, ২০০৮ সালে নিহত পরিবহন শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১৮। পরের বছর এ সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬। পরের বছরগুলো থেকে এ সংখ্যা সব সময় ২০০-র ঘর পেরিয়ে গেছে। গত বছর নিহত হন ১২৫ পরিবহন শ্রমিক।
শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং গবেষকদের মত, শ্রমিকের মৃত্যু হলে বা শ্রমিক আহত হলে তাঁর ক্ষতিপূরণ পাওয়াটা বেশ সময়সাপেক্ষ। যেসব খাতে শ্রমিক সংগঠন তুলনামূলকভাবে বেশি সংগঠিত, সেগুলোতে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিশ্চিত হলেও বেশির ভাগ খাতে এটি পাওয়া সম্ভব হয় না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শ্রমিক অধিকার সংগঠন সলিডারিটি সেন্টারের জ্যেষ্ঠ আইন পরামর্শক এ কে নাসিম বলছিলেন, তৈরি পোশাকশিল্প বা পরিবহন খাতের মতো কয়েকটি খাতে শ্রমিক সংগঠন বেশি শক্তিশালী হওয়ায় এসব খাতে শ্রমিক বা তাঁদের পরিবার ক্ষতিপূরণ পাওয়াটা নিশ্চিত হয়। কিন্তু বেশির ভাগ শ্রমিকই এই সামান্য ক্ষতিপূরণটুকুও পান না।
আট বছরে তৃতীয় যে খাতে বেশি শ্রমিক মারা গেছেন, তা হলো নির্মাণ খাত। ৭২২ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হয়েছেন এ সময়ে। আহত নির্মাণশ্রমিকের সংখ্যা ৪১২। বিলসের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে এ খাতে মারা যান ৬১ জন শ্রমিক। আহত হন ১১৯ জন। ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাফ) সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক বলছিলেন, গত বছর নিহত শ্রমিকদের মধ্যে অর্ধেক পরিবার ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। আহত শ্রমিকদের মধ্যে অর্ধেকের মতো ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘রাজধানীসহ ২০টি জায়গায় আমাদের সংগঠন রয়েছে। যেখানে সংগঠন আছে, সেখানে দাবি আদায় যতটা সহজ, অন্য জায়গায় তা নয়।’
গত আট বছরে নিহত হন ১২৮ দিনমজুর। শ্রম আইনে শ্রমিকের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সে অনুযায়ী শ্রমিক না হলেও ‘অন্যান্য খাতে’ আট বছরে মারা গেছেন ৯১২ জন শ্রমিক। এই ‘অন্যান্য খাতের’ মধ্যে আছে রাসায়নিক শিল্প, হোটেল-রেস্তোরাঁ ইত্যাদি। বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতানউদ্দিন আহমদ বলেন, শ্রম আইনে শ্রমিকের সংজ্ঞাকে সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। যে শ্রমিক গাছে উঠতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েন বা মারা যান, তিনি কি শ্রমিক নন? তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এখন শ্রমিকের সবচেয়ে বড় বিচার্য বিষয়। এটি নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি সব শ্রমিকের জন্য এর প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
১৯৮০ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত ছিল ২০ হাজার টাকা। ২০০৬ সালে শ্রম আইনের পঞ্চম তফসিলে এর পরিমাণ বাড়িয়ে নিহত শ্রমিক​দের পরিবারের জন্য এক লাখ এবং স্থায়ী অক্ষমতার জন্য ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। শ্রমিক সংগঠনগুলো এ পরিমাণ বাড়ানোর জন্য কয়েক বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। গত বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেই বিধিমালায় উপেক্ষিত থেকেছে শ্রমিকের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) সাবেক আহ্বায়ক ওয়াজেদুল ইসলাম বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি, জাতীয় আয় বাড়লেও শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ এক দশক ধরে এক পয়সাও বাড়ল না। আমরা চাই আইএলও কনভেনশনের ১২১ ধারা অনুযায়ী একজন শ্রমিক নিহত হলে বা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে গেলে ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি তাঁর বাকি কর্মজীবনের আয়ের হিসাব সংযুক্ত হোক। এখন যে ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত আছে, তা শ্রমিকের সঙ্গে একটি প্রহসনমাত্র।’
মালিকপক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. গোলাম মোস্তফা মনে করেন, আইনে শ্রমিকদের যে ক্ষতিপূরণের বিধান আছে, তা যথেষ্ট নয়। এর পরিমাণ বাড়ানোর জন্য সরকারি উদ্যোগ এলে নীতিগতভাবে তাঁরা এর সঙ্গে একমত থাকবেন বলে জানান তিনি।
শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ বাড়ানোর কোনো সরকারি উদ্যোগ নেই বলে জানান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক। তবে ক্ষতিপূরণ বাড়াতে ‘মানসিকভাবে তাঁরা প্রস্তুত’ আছেন বলে জানান তিনি। তিনি গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, মালিকদের তরফ থেকে প্রস্তাব এলে ক্ষতিপূরণ বাড়ানোর প্রক্রিয়া নেওয়া আরও সহজ হবে।প্রথম আলো