আজ থেকে শোকের মাস আগষ্ট

যুগবার্তা ডেস্কঃ যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবর রহমান।/দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা রক্তগঙ্গা বহমান/তবু নাহি ভয়, হবে হবে জয়, জয় মুজিবর রহমান।’ মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একাত্তরের মে মাসে কলকাতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে ফিরে এসে এ কবিতা লেখেন বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হওয়ার পর এ কবিতা নতুন মাত্রা পায়। অশ্রুনদী আর রক্তনদীতে একাকার হয়ে যায় পুরো দেশ। মানুষ কান্নার শক্তিও হারিয়ে ফেলে। অনন্ত শোকের নৌকায় ভাসমান বঙ্গবন্ধু নব নব ভবিষ্যতেরও দিশারি হয়ে ওঠেন।

এ উপলক্ষে গতকাল রোববার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন করে শ্রদ্ধা নিবেদন করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।

মোমবাতি প্রজ্বালন ছাড়াও আলোর মিছিল ও জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সংগঠন মাসব্যাপী কর্মসূচি শুরু করেছে।

আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের পক্ষ থেকেও এ সময় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরের আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানাতে আসেন নেতাকর্মীরা।

কর্মসূচি উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে এ সময় ছিল শোকার্ত মানুষের উপচেপড়া ভিড়।

আজ সোমবার সেই শোকাবহ আগস্টের প্রথম দিন। বর্ষপরিক্রমায় আজ থেকে আবারও শুরু হচ্ছে বাঙালির শোকের মাস। আগস্ট মাসজুড়ে বাঙালি জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে নানা আনুষ্ঠানিকতায় স্মরণ করবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ঘৃণা, ধিক্কার জানাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যাকারীদের- যাদের কারণে একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা আবার রাজনৈতিক অপতৎপরতা শুরু করা ও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল, গণতন্ত্রকে হত্যা করে সামরিকতন্ত্র এসেছিল। ১৯৭৫ সালের মধ্যভাগে এই বেদনাবিধূর ও কলঙ্কিত ঘটনা ঘটে। ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান এই স্থপতির বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় শ্যামল বাংলার মাটি। জাতির পিতাকে হত্যা করার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন অপশক্তি অপচেষ্টা চালায় মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শ ও চেতনাকেও হত্যা করার। সংবিধান স্থগিত করার পর তারা দালাল আইন বাতিল করার অধ্যাদেশ জারি করে একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের রাজনীতির পথ খুলে দেয়।

সেনাবাহিনীর একদল চক্রান্তকারী ও উচ্চাভিলাষী সদস্যের নির্মম বুলেটের আঘাতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ১৫ আগস্টের কালরাতে আরও প্রাণ হারান তার প্রিয় সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, সেনা কর্মকর্তা শেখ জামাল, ১০ বছরের শিশুপুত্র শেখ রাসেল এবং নবপরিণীতা দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল। প্রবাসে থাকায় জীবন রক্ষা পায় বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার। নির্মম সেই হত্যাযজ্ঞে আরও নিহত হন বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, শিশু পৌত্র সুকান্ত বাবু, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, নিকটাত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু এবং বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন নিরাপত্তা কমকর্তা-কর্মচারী। জাতি শোকের মাসে গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে এসব শহীদকেও।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আরোপ করে এর বিচারের পথও রুদ্ধ করা হয়। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কলঙ্কিত সেই অধ্যাদেশ বাতিল ও জাতির পিতা হত্যার বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও নানা কূটকৌশলের জাল ছিন্ন করে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের চূড়ান্ত রায় এবং পাঁচ ঘাতকের ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা হয়েছে। তবে পুরো জাতি এখনও প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে বঙ্গবন্ধুর বাকি ছয় পলাতক খুনির ফাঁসি কার্যকরের মাহেন্দ্রক্ষণের। বিদেশে পালিয়ে থাকা এই খুনিদের অনুসন্ধান করে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর এখনও সম্ভব হয়নি।

এই আগস্টেই ঘটে জাতির ইতিহাসের আরও একটি বিয়োগান্তক ঘটনা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো হয় ইতিহাসের ভয়াবহতম গ্রেনেড হামলা। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে চালানো ওই গ্রেনেড হামলা থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও ঝরে যায় মহিলা আওয়ামী লীগ নেতা আইভি রহমানসহ ২৪টি তাজা প্রাণ।

শোকের মাস আগস্টের প্রথম প্রহরে জাতি বিনম্রচিত্তে শ্রদ্ধা জানিয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। একই সঙ্গে শ্রদ্ধা জানিয়েছে মধ্য আগস্টে শহীদ বঙ্গবন্ধু পরিবারকে। রোববার মধ্যরাত তথা রাত ১২টা ১ মিনিটে মোমবাতি প্রজ্বালন, আলোর মিছিল, শপথ গ্রহণ ও জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দল ও সংগঠন শোকের মাসব্যাপী কর্মসূচি শুরু করেছে।

আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কর্মসূচির সূচনা ঘটেছে আগস্টের প্রথম প্রহরেই। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়ক ধরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর অভিমুখে আলোর মিছিল করেছে। যুবলীগ ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে মোমবাতি প্রজ্বালন ও জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগ বঙ্গবন্ধু ভবন অভিমুখে আলোর মিছিল, শপথ গ্রহণ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেছে। একই কর্মসূচি পালন করেছে ছাত্রলীগও। এসব কর্মসূচি ঘিরে ধানমণ্ডি বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে ছিল শোকার্ত মানুষের উপচেপড়া ভিড়।

বিভিন্ন দল ও সংগঠন শোকের মাসের প্রথম দিনে আজ সোমবার দেশজুড়ে নানা কর্মসূচির আয়োজন করবে। সারাদেশের মানুষ বুকে শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ ধারণ করবে। রয়েছে শোক র‌্যালি, টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার কবর ও বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে তার প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, স্বেচ্ছায় রক্তদান, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা প্রভৃতি।

আজকের কর্মসূচি
আজ বিকেল সাড়ে ৩টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে কৃষক লীগের রক্তদান কর্মসূচি, ‘কৃষকের কণ্ঠ’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। শিল্পকলা একাডেমিতে যুবলীগের আয়োজনে ‘বাঙালির হৃদয়ের ফ্রেমে জাতির পিতা’ গ্রন্থের সংবাদচিত্র প্রদর্শনী আজ থেকে শুরু হবে। বঙ্গবন্ধু পরিষদ সকাল ১০টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ‘১৫ আগস্টের প্রতিবিপ্লব ও পরবর্তী বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা করবে। বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলা সকাল পৌনে ৯টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও মাসব্যাপী কর্মসূচি শুরু করবে। ওলামা লীগের কর্মসূচিতে রয়েছে দেশের সব মসজিদ-মাদ্রাসা ও এতিমখানায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিল এবং কালো ব্যাজ ধারণ।