আওয়ামী লীগ কি অতীত ভুলে যাচ্ছে?

82

ফারুক নওয়াজ, প্যারিস থেকেঃ
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদ। ১৯৭২ সালের শেষ ভাগে জাসদ রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মুক্তিযুদ্ধের পর সদ্য স্বাধীন দেশে সে দলটিই প্রথম রাজনৈতিক দল এতে কোন সন্দেহ নাই।
জাসদের সৃষ্টি নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। একটি স্বাধীন দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য জাসদের ভুমিকা প্রশ্নের সম্মুখীন। জাসদের জন্মদাতা বা ধারনার প্রবক্তা হিসেবে যিনি পরিচিত সে সিরাজুল আলম খানের একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষন বা ভবিষ্যত বানী ছিলো। তিনি আশির দশকের প্রারম্ভে জাসদ নিয়ে উনার মতামত দিয়েছিলেন এভাবে, “পুরানো রাজনৈতিক দল হিসাবে , নিরাকরণের নিরাকরণ প্রক্রিয়ায় জাসদের বিলুপ্তি ঘটবে”।
উনার এ ভবিষ্যতবানী আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সফলভাবে দৃশ্যমান। সিরাজুল আলম খান একজন রাজনৈতিক গবেষক। জাসদ নিয়ে উনি যা বলেছিলেন তা চরম বাস্তব।
এ কথাটাই একটু ঘুরিয়ে আওয়ামী লীগের বিষয়ে বললে অনেকেই বাকা চোখে তাকাবেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটি ঘোষনার পর এটা ভেবে দেখা দরকার।
রোববার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের দক্ষিণে সভাপতি হিসেবে বর্তমান লালবাগ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসনাত ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মহানগরের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক শাহে আলম মুরাদকে এবং উত্তরে সভাপতি হিসেবে সংসদ সদস্য এ কে এম রহমতুল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসনাত মো. সাদেক খানের নাম ঘোষণা করেন।
ঢাকা মহানগরের উত্তর অংশের যারা নেতৃত্ব দিবেন অর্থাৎ সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক তাদের দুজনেরই রাজনৈতিক অতীত কখনো আওয়ামী বান্ধব বলে স্বীকৃতি দেয় না।
মহানগর উত্তরের সভাপতি এ কে এম রহমতউল্লাহ এমপি এক সময় জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। পর পর দুই বার তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়নে এমপি হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেন রহমতউল্লাহ। সে হিসেবে তিনি আওয়ামী লীগের এমপি হলেও উনার রাজনৈতিক অতীত আওয়ামী ঘরানার সঙ্গে যায় না।
এরপর একই কমিটির সাধারণ সম্পাদক যিনি হয়েছেন উনার রাজনৈতিক অতীত আরও ভয়াবহ। ঘোষিত মহানগর উত্তর কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান এক সময় ফ্রিডম পার্টির আলোচিত নেতা ছিলেন।
১৯৯৪ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন সাদেক খান। মোহাম্মদপুর রায়ের বাজার এলাকা থেকে ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হন তিনি। সাবেক এমপি মকবুল হোসেনের কল্যাণে পরবর্তীতে মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন সাদেক খান।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাজধানী জুড়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে ফ্রিডম পার্টি। বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতেও হামলা চালায় তারা। আর তখন ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরসহ গোটা রাজধানীতে ফ্রিডম পার্টির প্রভাবশালী নেতা ছিলেন মহানগর ঊত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান।
বাঙ্গালী অতীত বিস্তৃত একটি জাতি। নিজেদের উদারতার জন্য অতীতের অনেক ঘটনাই বাঙ্গালী দ্রুত ভুলে যেতে পারে। কিন্তু ফ্রিডম পার্টির একজন নেতা যাদের হাতে এখনো জাতির জনকের রক্ত লেগে আছে তাদেরকে এভাবে পুনর্বাসন করা কতোটা উদারতার পরিচায়ক তা ভেবে দেখতে হয়।
শুরুতে যেভাবে বলা হয়েছিলো নিরাকরনের নিরাকরন প্রক্রিয়া কি তবে আওয়ামী লীগের মধ্যে ও শুরু হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে কি আওয়ামী লীগ নিজের ঐহিত্য হারিয়ে বৈশ্বিক মতাদর্শে বিলীন হয়ে যাচ্ছে?
ফারুক নওয়াজ: ফ্রান্স প্রবাসী জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং অনলাইন পত্রিকা ইউরোবার্তা২৪.কমের সম্পাদক।