অমল সেন : মৃত্তিকা সংলগ্ন কবিকণ্ঠ

226

মাসুদ মাযহারঃ “বর্তমান বিশ^সাহিত্যের দিকে একটু ভাল করে দেখলে সর্বাগ্রে চোখে পড়ে তার দুটি রূপ। একরূপে সে শেলীর ঝশুষধৎশ এর মত, মিল্টনের চধৎধফরংব এর মত, এই ধূলি মলিন পৃথিবীর উর্দ্ধে উঠে স্বর্গের সন্ধান করে, তার চরণ কখনো ধরার মাটি স্পর্শ করে না, কেবলি উর্দ্ধে আরো উর্দ্ধে উঠে স্বপ্নলোকের গান শোনায়। এখানে সে স্বপন-বিহারী। আর একরূপে সে এই মাটির পৃথিবীকে অপার মমতায় আঁকড়ে ধরে থাকে- অন্ধকার- নিশীথে, ভয়ের রাতে বিহ্বল শিশু যেমন করে তার মাকে জড়িয়ে থাকে, তরুলতা যেমন করে সহস্র শিকড় দিয়ে ধরণী মাতাকে ধরে থাকে তেমনি করে। এইখানে সে মাটির দুলাল।”
‘বর্তমান বিশ্বসাহিত্য’ অঙ্গণে নজরুল কথিত এই বিভাজন রেখা অত্যন্ত স্পষ্ট। বাংলা সাহিত্য সমুদ্রেও এই দুটি বিপ্রতীপ স্রোতধারা সাহিত্য সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে বহমান। বঙ্গভূমির সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, শোষণ-বঞ্চনা, প্রতিবাদ প্রতিরোধের বাস্তব চিত্রকলা প্রাচীন কিংবা মধ্যযুগ ছাড়িয়ে অঙ্কিত হয়েছে আধুনিক সাহিত্যের পরতে পরতে। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের রচয়িতা কবিগণ সংসার বিবাগী হওয়ায় তাদের রচনায় কৃষি ও কৃষক জীবন নিয়ে খুব বেশি অনুষঙ্গ পাওয়া যায় না। মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে বিশেষ করে মঙ্গল কাব্য ধারায় কৃষক ও কৃষিজীবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ উঠে এসেছে।
আধুনিক বাংলা কাব্যে গণমুখী ধারার অজস্র কবি পেলেও কৃষকের সঙ্গে ‘সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন’ এমন কবির সাক্ষাৎ আমরা পাই নি। প্রগতিশীল ধারার কবি সাহিত্যিকদের মধ্যেও মৃত্তিকা সন্তানদের সাক্ষাৎ প্রতিনিধি ঠিক যেন পাওয়া যায় না, যদিও সেই আকাক্সক্ষা লক্ষ্য করা যায় অনেকের মধ্যেই-
“কৃষাণের জীবনে শরীক যে জন
কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন
যে আছে মাটির কাছাকাছি
সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি।” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
প্রগতিশীল ধারার কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে শ্রেণী সংগ্রাম, বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত শ্রমিক আন্দোলন, লাল পতাকার নিচে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নানামাত্রিক অনুষঙ্গ ও শ্রমিক বিপ্লবের স্বপ্নের কথা চিত্রিত হলেও গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের মূল শ্রমশক্তি কৃষক ও কৃষি জীবন নিয়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি চোখে পড়ে না। সুভাষ, সুকান্ত কিংবা নজরুল- সকলের সম্পর্কেই এ কথা প্রায় সমভাবে প্রযোজ্য। সাহিত্য সমালোচক হুমায়ুন কবির নজরুলের কৃষক পরিবার থেকে আসার প্রসঙ্গকে বড় করে দেখালেও আমরা জানি, তাঁর কবিতায় শ্রমিক জীবন যে মাত্রায় এসেছে, কৃষক জীবন সেই মাত্রায় অনুপস্থিত। পরবর্তীতে জসীমউদ্দীনের কাব্যে পল্লীজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বিরহ-বেদনা চিত্রিত হয়েছে দরদমাখা দৃষ্টিকোণ থেকে। পল্লীজীবনকে জসীমউদ্দীন দেখেছেন রোমান্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তাই তাঁর কাব্যে রোমান্টিকতা উদ্ভূত ভাবকাতরতা আছে, হা-হুতাশ আছে, বঞ্চিত কৃষক জীবনের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতিও আছে, কিন্তু নেই সংকট উত্তরণের কোনো ইঙ্গিত। কৃষকজীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা থরথর আবেগে কম্পিত করে সাজালেও তা থেকে উত্তরণের পথরেখাটি তিনি নির্মাণ করতে পারেন নি হয়তো বা জীবনদৃষ্টির ভিন্নতার কারণেই। আরো পরে পঞ্চাশের দশকে আল মাহমুদের প্রথম পর্যায়ের কবিতায় কৃষক সমাজের দ্রোহ ও প্রতিরোধের আকাক্সক্ষা লক্ষ্য করা গেলেও অচিরেই তা ফ্রয়েডীয় যৌনতত্ত্বের চোরাবালিতে হারিয়ে যায়। ষাটের দশকের কাব্যে জাতিগত স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা এবং সত্তরের দশকের কাব্যে স্বাধীনতার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান মূল বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়। আশি, নব্বই ও শূন্য দশকের নাগরিক কাব্যে প্রকরণকলার বাড়াবাড়িতে কাব্যের বিষয়ই যখন বিমূর্ত হয়ে ওঠে, তখন সেখানে কৃষক বা কৃষি জীবনের অনুসন্ধান বাতুলতা মাত্র। এই পটভূমি স্মরণে রেখে অমল সেনের কবিতা বিশ্লেষণের প্রাসঙ্গিকতা জরুরি হয়ে ওঠে।
বাংলা কাব্যের ইতিহাসের প্রচলিত ডিসকোর্সে অমল সেন (১৯ জুলাই ১৯১৪-১৭ জানুয়ারি ২০০৩) কোনো পরিচিত কবি প্রতিনিধি নন। এই আজন্ম বিপ্লবী তাঁর মতাদর্শিক চেতনাকে নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন। কিন্তু তাঁর কৃষক আন্দোলন ও রাজনৈতিক লড়াই আমাদের এতো আবিষ্ট করে রেখেছে যে, তাঁর জীবনের এই অংশটি অনালোচিতই রয়ে গেছে। অমল সেন অনেক কবিতা রচনা করলেও অধিকাংশই খুঁজে পাওয়া যায় নি। গণপ্রকাশন প্রকাশিত কবি শুভ রহমানের ভূমিকা সংবলিত ‘অমল সেনের কবিতা’ নামক সংকলনটি আমাদের একমাত্র অবলম্বন। এই সংকলনটির কবিতাগুলোর আলোকেই তাঁর কাব্যস্বভাব বিশ্লেষণের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
কাব্য সৃষ্টি অমল সেনের জীবনের বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, বরং তাঁর সামগ্রিক জীবনবোধ ও বিশ্বাসের বাণীবদ্ধ অভিব্যক্তি। তাঁর কবিতাকে বুঝতে হলে তাঁর সারাজীবনের বিপ্লবী কর্মকান্ডের পাটাতনে স্থাপন করে সেই কবিতাকে ব্যাখ্যা করতে হবে। অমল সেন জমিদারের ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই অর্থে তাঁর জন্য সামন্তবাদী শ্রেণীচরিত্রের প্রতিনিধি হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু শ্রেণীচ্যুতি ঘটিয়ে তিনি সর্বহারা শ্রেণীর মানুষে রূপান্তরিত হয়েছেন এবং শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। মানুষের শ্রেণী চরিত্র কিভাবে নির্ধারিত হয়- এ ব্যাপারে মার্কসবাদীদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য থাকলেও মহামতি লেনিনের বক্তব্যের মাধ্যমে একটি মীমাংসায় পৌঁছানো সম্ভব। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক যতীন সরকারের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য-
“রুশ দেশের মেনশেভিকরা মনে করতেন যে, মানুষ শ্রেণী চেতনা লাভ করে জন্মসূত্রেই। লেনিন এই ধারণার বিরোধিতা করতেন। তিনি দেখান যে, কোনো বিশেষ শ্রেণীর ভাবাদর্শ নিয়ে কোনো ব্যক্তির জন্ম হয় না। জন্মের পর মানুষ শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও কর্মপ্রয়াসের মধ্য দিয়েই শ্রেণী চেতনা অর্জন করে এবং এভাবে কোনো মানুষ তার জন্মগত শ্রেণীর চেতনাকেও ধারণ করে থাকতে পারে, আবার অন্যতর শ্রেণীর ভাবাদর্শকেও গ্রহণ করতে পারে।”
অমল সেন শ্রেণীচ্যুতি ঘটিয়ে কৃষকদের মাঝে এসেছেন অতিথি হয়ে নয়, তাদেরই একজন হয়ে। জীবনের সমস্ত দরদ উজাড় করে দিয়ে কৃষকদের সংগঠিত করেছেন, বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন এবং তাদেরকে সাথে নিয়ে নড়াইল অঞ্চলে তে-ভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সামগ্রিক জীবনভাবনায় কৃষক জীবনের বঞ্চনা ও তা থেকে উত্তরণের আকাক্সক্ষা একাকার হয়ে আছে। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই অমল সেনের কাব্যের স্বরূপ সন্ধান করা অত্যাবশ্যক। এ প্রসঙ্গে তাঁরই ভাবশিষ্য কবি-সাংবাদিক শুভ রহমানের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ-
“অমল সেনকে এক মুহূর্তের জন্য কৃষক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা মনে করা যাবে না। তাঁর স্বপ্ন, ধ্যানধারণা, ভালোবাসা, শ্রেণীযুদ্ধ সবই কৃষক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর কবিতার রচনাশৈলী, ভাব, ভাষা ও রূপকল্প সবই কৃষক জীবন থেকে আহরিত। কবিতায় তিনি কখনো কৃষকের সন্তান হয়ে কৃষক পিতার সঙ্গে, কখনো কৃষক পিতার আচার আচরণ নিয়ে, কখনো কৃষকের দয়িতা হয়ে, কখনো জমির সঙ্গে, কখনো বা হালের বলদের সঙ্গে কৃষক হয়েই অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় মেতেছেন। আমাদের চেনা কাব্যসাহিত্যে এ এক ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের স্বাক্ষর।” (ভূমিকা, অমল সেনের কবিতা)
ভারতবর্ষের শ্রেণীবিভক্ত সমাজে নিজের লাঙ্গল, গরু ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে জমিচাষ করলেও অধিকাংশ কৃষক জমির মালিক হয়ে উঠতে পারে নি। ১৮৫৯ সালের রেন্ট এ্যাক্ট, উপর্যুপরি দুর্ভিক্ষ এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কৃষকরা জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অপরদিকে অপেক্ষাকৃত ধনী কৃষকরা সেই জমি কিনে ক্রমশ জোতদারে পরিণত হয়। বংশানুক্রমে বন্ধক থাকা জমি উদ্ধার করতে না পারার যন্ত্রণাবিদ্ধ কৃষক হালের বলদকে তাড়া দেয়, শোনায় কষ্টের খতিয়ান। পূর্বপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত জমিটুকু ফেরত পাওয়ার আকুতি কবি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন কৃষকের কণ্ঠে-
“বাপ দাদার জমি বন্ধক থাকলে
বুঝতিস জ্বালা!
…………
আর একটি বছর খামটি দিয়ে কাটাতে পারলে
বুঝলি ধলা, জমিটুকু ফেরত মেলে। (গতর ভাঙ্গলে)
কৃষক সন্তানতুল্য যত্নে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শরীরের রক্ত পানি করে ছোট চারাগাছ বড় করে তোলে। কিন্তু কৃষক বিশ্বাস করতে পারে না তার এই সন্তান শেষ পর্যন্ত তার ঘরে থাকবে কি না। তিল তিল করে বড় করে তোলা তিলোত্তমা কন্যা অন্যের ঘরে গিয়ে পর হয়ে যায়। কৃষক পিতা তাই সন্তানতুল্য ধানক্ষেতকে শোনায় তাঁর কষ্টের পদাবলী-
“তোদের শুকনো মুখ দেখে
মুখে রোচেনি ভাত
এতটুকু বৃষ্টির আরজ নিয়ে
মোনাজাত করেছি সারারাত
পোকা মাকড় আর খরায়
কখন তোদের কি হয়
সে ভাবনায় প্রত্যেকটি দিনে
আমার বুকের রক্ত কতটুকু শুকায়
কি হবে তোদের সে খবর জেনে।” (গাড়োল মন)
কচি ধানগাছ কৃষক পিতার বুকে আশ্রয় খুঁজে কিন্তু বারবার স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় আহত কৃষক ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারে না বড় হয়ে এই সন্তান তাকে ছেড়ে যাবে না তো!
সন্তানতুল্য ধানগাছ যখন যৌবনে পদার্পন করে, সোনা রং ধারণ করে, তখন কৃষক পিতা ঠিকই বুঝতে পারে-
“বড় বাড়ীর গোলার খোয়াবেই
নাচছে তোদের মন।
আমাকে আদর তো লোক দেখান
গাড়োল মন তাই বুঝ মানে না।” (গাড়োল মন)
কৃষকের মাঠভরা স্বপ্ন বারবার চুরি হয়ে যায়। মাঠের সোনা রং কৃষকের ঘরকে রাঙাতে পারে না; মাঠের স্বপ্ন ঘরে ফেরার পূর্বেই পালিয়ে যায়। বাংলার শোষিত কৃষকের কাছে ঘর আর মাঠ তাই যেন দুই সতীনের প্রতিমূর্তি-
“মাঠের গান ঘরে যেতেই হয়ে যায় কান্না
মাঠখানা কিছুতেই বসে আনা গেল না
মাঠের ফসল ঘরে যাবে না
পথ থেকেই পালালো
মাঠ আর ঘর
চিরদিনের সতীন হয়েই রইল।” (সতীন)
কৃষকের ঘর ফসলশূন্য, শেষ সম্বল বীজধানও বিকিয়ে গেছে সূর্যাস্তের হাটে। নিঃস্ব-রিক্ত কৃষকের সামান্য প্রত্যাশাও মিলিয়ে যায় শূন্যে। থেমে যায় কৃষকের কণ্ঠের গান, থাকে শুধু হাহাকার ভরা দীর্ঘশ্বাস-
“গরম ভাতের গন্ধ ঘর ছেড়ে গেছে
দ্বার থেকে ফিরে গেল তাই-
ক্ষারে কাঁচা শাড়ীটির আচ্ছন্ন সুভাস
ভাটিয়ালী গান থেমে গেছে
আছে পাট পচা বাতাসের তীব্র দীর্ঘশ্বাস।” (দ্বার থেকে ফিরে গেল তাই)
কৃষক জীবনের এই অনিবার্য অসহায়ত্বের চিত্র অঙ্কনে অসামান্য সফলতা দেখালেও অমল সেনের কবিকীর্তি এতে সীমাবদ্ধ নয়, তা আরো ব্যাপক, আরো গভীর। দুঃখবিলাস তো নয়ই, কৃষক জীবনের অসহায়ত্বের বিলাসী চিত্র অঙ্কনও অমল সেনের উদ্দেশ্য ছিল না। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি তাঁর কাব্যে কৃষকদের নবউত্থান কামনা করেছেন, জ্বালাতে চেয়েছেন অগ্নিশিখার নতুন প্রদীপ। গভীর অস্তিবোধে কবি তাঁর শেকড়কে খুঁজেছেন, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন সামন্তবাদী শোষকদের প্রতি, স্পষ্টত অবস্থান নিয়েছেন ইতিবাচক উত্তরণের পক্ষে। তিরিশের কবিদের সমাজবিমুখ নৈরাশ্যবাদী এলিয়টীয় নাগরিক উদ্ভটতার ডিসকোর্সকে অমল সেন প্রত্যাখ্যান করেছেন, আস্থা রেখেছেন গণমানুষের সংঘবদ্ধ শক্তিমত্তার উপর। কবি বিশ্বাস করেন শোষণের নাগপাশে বন্দী কৃষকের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে আজন্ম উপবাসী কৃষকও জেগে উঠবে বিপ্লবী চেতনায়-
“যদিও ভামরে ভামরে
গোলামীর কবুলিয়ত নামায়
আজও দিয়ে যাই ক্ষুব্ধ নাঙ্গলের স্বাক্ষর।
তবু, আক্রোশের উত্তাপে একদিন
এ নাঙ্গল হবে নাঙ্গা তলোয়ার।”
কবি অমল সেন বাঙালির সংগ্রামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে জানেন। শ্রেণী সংগ্রামের ধারাবাহিক বিবর্তনের ইতিহাসকেও তিনি নিবিড়ভাবে পাঠ করেছেন। তাই কবি হতাশ নন, তিনি জানেন রাত যতো গভীর হয়, প্রভাতের রক্তিম সূর্য ততো নিকটে আসে। শ্রেণী শোষণ যখন চরমে পৌঁছায়, উত্তরণের আকাক্সক্ষাও তখন তীব্র হয়ে ওঠে-
“আমার সারা গায়ে
উত্তাপ স্পন্দিত হয়,
স্পন্দিত হয় অস্থিতে আর মজ্জায়
দু’খানি হাত আবার
মুষ্টিবদ্ধ হবার জোর খুঁজে পায়।” (উত্তাপ শানিত হয়)
এই আশাবাদ অমল সেনের কাব্যস্বভাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। শত সংকটের মাঝেও কৃষক সন্তানের চোখের তারায় স্বপ্ন জ্বলে সমৃদ্ধ আগামীর-
“দেখিস আমাদেরও একখানা জমি হবে
আব্বা বলেছে, সেখানে যখন ধান কাটবে
একটি আটিও কাউকে দিতে হবে না।
তখন আর তোকে সাধতে যাব না
হেই আব্বার কাস্তেখানা।” (হেই আব্বার কাস্তেখানা)
অমল সেনের কাব্যে রাজনীতির সঙ্গে জীবন ও কবিতার নিবিড় অন্তর্নিবিষ্ট সম্পর্ক বাণীরূপ লাভ করেছে। জীবন ও শিল্পের সুষম মিথস্ক্রিয়ায় নির্মিত হয়েছে এক ভিন্ন দিগন্ত। জীবনার্থের গভীরতায় কবিতাগুলো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, শিল্প উৎকর্ষের বিচারেও তা কোনো অংশে ন্যূন নয়। আধুনিক শিল্পনিয়নদীপের বহু শিখায় দীপিত উজ্জ্বল কাব্য ভুবনেও এই রাজনৈতিক কর্মী কবির কবিতাগুলো সমান উজ্জ্বল। কবিতায় ব্যাপক অর্থে রাজনৈতিক চেতনা ও জীবন বাস্তবতার বোধ কিভাবে নান্দনিক শৈলী নিয়ে উপস্থিত হতে পারে অমল সেনের কৃষক জীবন সংশ্লিষ্ট কবিতাগুলো তার উজ্জ্বল নিদর্শন।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।