অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ!!

সরদার মোঃ শাহীন:

হরহামেশাই শুনি, রাজনীতিতে রংচং মাখিয়ে এক আধটু মিথ্যে বলাই যায়। কেবল যে দেশেই শুনি, সেটাও নয়। বিদেশেও এমন কথা কানে আসে। তবে কথায় কথায় ঝটরপটর মিথ্যে বলতে শুনিনা ওখানে। শুনিনা, কেননা এভাবে বলাটা মোটেও শোভনীয় নয়। মন চাইলো, আর যা মুখে আসলো তাই বলে দিলাম; ব্যাপারটা এমনটা নয় মোটেও। মিথ্যে যে যেভাবেই বলুক খুব সাবধানে বলতে হয়। কৌশল করে বলতে হয়। এমনভাবে বলতে হয়, যেন মিথ্যেটাকেও সত্যির মত শোনায়।
আমাদের দেশের রাজনীতিবিদগণ এসবের ধার ধারেন না। সত্য মিথ্যার তোয়াক্কা করেন না। মুখে যখন যা আসে, চট করে ছেড়ে দেন; ঝেড়ে দেন। মনের মধ্যে থাকা প্রচন্ড বিশ্বাস থেকেই এসব করেন। জনগণের কাতারে থাকা তাদের হাজার হাজার অন্ধভক্ত যা শোনে সবই সত্য মনে করে; এটাই তাদের বিশ্বাস। আর এই বিশ্বাসের জোরে সাংবাদিক ডেকে মুখ বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে ক্যামেরার সামনে অবলীলায় সব বলে যান। এমনভাবে বলেন যে, শুনতে শুনতে মিথ্যেটাকেও সত্যির মত লাগে। শুধু যে অন্ধভক্তকূলেরই লাগে তাই নয়। বিরোধী পক্ষের লোকেরাও সত্যি মনে করা শুরু করে।
এসবই অতীব নেগেটিভ পলিটিক্সের আসল রূপ। ইদানীং এই রূপটা প্রস্ফুটিত হলো মির্জা ফখরুলের মধ্যে। কিছু ফালতু কথা বেফাঁসে বলে ফেলে খামাখা ঝামেলা পাকালেন। পদ্মাসেতুর উদ্বোধনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছিল, ততই যেন তিনি কথাবার্তায় এলোমেলো হচ্ছিলেন। তিনি কৌশলে চাইছিলেন কোন না কোনভাবে পদ্মাসেতুর সফলতায় খালেদা জিয়াকে অংশীদার করতে। তিনি সেটা চাইতেই পারেন। তাই বলে ঢাহা মিথ্যে বলে?
পরপর দুইদিন তিনি সাংবাদিকদের ঢাহা মিথ্যে বলে গেলেন। প্রথমদিন শোনার পর ভেবেছিলাম, পলিটিক্সের বাজারে কথাটা ফেলে তিনি দেখলেন, রিএ্যাকশান কেমন হয়। কিন্তু আসলে তা নয়। তিনি ২য় দিনও বললেন। বললেন মানে, আরো জোর গলায় বললেন। প্রথমদিন বলেছিলেন, খালেদা জিয়া পদ্মার একপাড়ে ভিত্তিফলক স্থাপন করেছেন। কিন্তু ২য় দিন গলা আরো চড়িয়ে বললেন, শুধু একপাড়ে নয়! দুইপাড়েই ফলক স্থাপন করেছেন।
তবে বেচারা এসব বলেও সুবিধে করতে পারেননি। তখনকার খালেদা কেবিনেটের যোগাযোগ মন্ত্রী নাজমুল হুদা হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেয়ায় তার উদ্দেশ্য মাঠে মারা যায়। হুদা পরিষ্কার ভাষায় সাংবাদিক ভাইদের বলে দেন, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কোথায়ও পদ্মাসেতুর ভিত্তিফলক স্থাপন করেননি। ফলে চুপসে যান মিষ্টার ফখরুল। আর হন বিতর্কিত। তবে বিতর্কিত হলেও এই দেশে পলিটিশিয়ানদের কিচ্ছু যায় আসে না। বিতর্কিত কে না হন? তার নেত্রীও হয়েছেন।
একটু পেপার ঘাটুন। তাহলেই পাবেন। খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি ছাত্রদলের এক সভায় বলেছিলেন, ‘পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে আওয়ামী সরকার। কিন্তু পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের আমলে কোনদিনও হবে না। এ সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো হচ্ছে। এ সেতুতে কেউ উঠবেন না। অনেক রিস্ক আছে।’শুধু সেদিনই নয়। কথাটি তিনি বেশ কয়েক জায়গায় কয়েকদিন বলেছেন। এবং নিশ্চয়ই তাঁর ভক্তকূল বিশ্বাসও করেছে।
এবার চলুন সেইসব বিশ্বাসী ভক্তকূলের বিশ্বাসের নমুনা দেখি। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়কার কথা। বিশ্বব্যাংকের তালবাহানা আর চরম ভন্ডামীর শেষ দেখে শেখ হাসিনা জিদ করে দেশের টাকায় পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, বিশ্বব্যাংক টাকা দিলেও আর নেবেন না ওদের টাকা। এ কারণে দেশের নাগরিকদের বড় অংশ খুশি হলেও বিশাল একটা অংশ মোটেও খুশি ছিল না। কোন এক ব্যাংকের ম্যানেজারের কথায় তেমনটাই বুঝেছিলাম।
গরমের ভর দুপুরে ম্যানেজারের রুমে বসে চা খাচ্ছি। বরাবরের মত খুব খাতির করছিলেন তিনি আমায়। এটাসেটা নিয়ে কথাও হচ্ছিল কাজের ফাঁকে ফাঁকে। লক্ষ্য করলাম, ব্যাংকের চেয়েও পুরো দেশটা নিয়ে তার চিন্তাভাবনা বেশি। ব্যাংক নিয়ে ভেবে কি হবে, যদি দেশটাই না থাকে; ব্যাপারটা ঠিক এ রকম। তিনি কানের কাছে মুখটা এনে বিড়বিড় করে বললেন, চায়নারা বানাইবো পদ্মাসেতু! জিন্দিগীতেও সম্ভব না। এইডা কি বুড়িগঙ্গা পাইছে! এইডা পদ্মা। কীর্তিনাশা পদ্মা। চায়নারা বানাইলে গাড়ি তো ভাল, রিকশাও পাড়ি দিতে পারবো না।
আমি মোটেও অবাক হইনি। আমার কাছে নতুন মনে হয়নি কথাগুলো। আশে-পাশের অনেকেই এমনটা বলছিল। যেমনি শিক্ষিতরা বলছিল, তেমনি অশিক্ষিতরাও। সেতুর কাজ দৃশ্যমান হবার আগে আগে স্পীডবোটে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছিলাম। কথা হচ্ছিল বোট চালকের সাথে। বয়স তার ত্রিশের কোঠায়। জানতে চাইলাম পদ্মা সেতু নিয়ে তার ভাবনার কথা। বেচারা চালক! কথার মধ্যে সামান্য ব্যালেন্সটুকুও রাখেনি। শেখ হাসিনাকে জাষ্ট পাগল বলে দিল। তার পরিষ্কার কথা, শেখ হাসিনা পাগল হইতে পারে। আমি পাগল না। আর আমি তো ভাল, আমার পোলায়ও পদ্মাসেতু দেখতে পারবো না।
এসব গেল আমজনতার কথা। এবার আসি ডঃ ইউনুস সাহেবের কথায়। বাংলাদেশ বলেই আজো এই মানুষটি বহাল তবিয়তে দিব্বি মুখ দেখিয়ে মনুষ্য সমাজে চলাফেরা করেন। মাঝেমধ্যে এখনও বুক ফোলাবার চেষ্টা করেন। বিদেশ হলে ঘরের বেইজমেন্টে স্থায়ী জায়গা নিয়ে বাকী জীবন কাটাতে হতো। পরিবারের সদস্য আর ঘরের পোষা বিড়াল কুকুর ছাড়া কথা বলার মানুষও পেতেন না তিনি। খ্যাতি আর পাওয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে বসে তিনি আমার দেশটির যে ক্ষতি করার চেষ্টা করেছেন, সেটা কেবল তার দ্বারাই সম্ভব।
সম্ভাবনাময় মন্ত্রী ছিলেন আবুল হোসেন। আজ খুব করে মনে পড়েছে তাঁর কথা। আহারে বেচারা! কোন ধরণের অন্যায় অনিয়ম না করে তিনি বলীর পাঠা হয়েছিলেন। তাকে নিয়ে মানুষ হাসিঠাট্টা করতো। মশকরা করতো। আজেবাজে লেখালেখি হতো। ভাবতেও অবাক লাগে, এত গঞ্জনা সহ্য করার পরেও তিনি বেঁচে আছেন এখনও। যদিও কোথায় আছেন জানি না। তবে তিনিসহ তাঁর মত আরও যাঁরা চরম অপমানিত হয়েছিলেন, তাদের সবাইকে লাইমলাইটে আনা উচিত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁদের জন্যে বিশেষ সম্মানের চেয়ার দেয়া উচিত।
জাতিকে ঘটা করে জানানো উচিত, তাঁরা পদ্মাসেতু ইস্যুতে নিষ্পাপ ছিলেন। শুধুমাত্র ডঃ ইউনুসের চক্রান্তের স্বীকার হয়ে তাঁরা হেনস্তা হয়েছেন পরিবার, জাতি তথা বিশ্ববাসীর কাছে। আজ উদ্বোধনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে এত্ত এত্ত মিডিয়া ঘেটেও তাঁদের জন্যে সমবেদনা জানাবার কাউকে পাইনি। অথচ মিডিয়া বিরোধীপক্ষের সব কথা ফলাও করে প্রচার করছে। ওদের বলা টিটকারীমূলক কথাও প্রচার করছে। প্রচার করছে, পদ্মাসেতুতে মিষ্টি বেশি হয়ে গেছে। প্রয়োজনের চাইতে কমপক্ষে ৬ গুণ বেশি খরচ করা হয়েছে।
কথা শুনলে মনে হয়, এক একটা পন্ডিতের ডিব্বা ওরা। ইঞ্জিনিয়ারিং এর অ, আ না জানা তথাকথিত পলিটিশিয়ানরা একেকজন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ভাষায় বলার চেষ্টা করছে আজকাল। যে পদ্মাকে বলা হয় আনপ্রেডিকটেবল পদ্মা, বলা হয় আমাজনের পরেই খরস্রোতা; সেই পদ্মাকে তুলনা করছে ভারতের অংশে থাকা স্রোতহীন অগভীর ব্রহ্মপুত্রের সাথে। পদ্মাসেতুকে তুলনা করা হচ্ছে আসামের ব্রহ্মপুত্র সেতুর সাথে।
কী অর্বাচীনের মত কথা! যে সেতু নির্মাণের মাঝপথে স্রোত এবং পাইলিং ঘটিত সমস্যার কারণে নির্মাণকাজ বন্ধের উপক্রম হয়েছিল, সেই সেতু নিয়ে কি তুলনাই না করা হচ্ছে। নদীর তলদেশে থাকা অবিশ্বাস্য রকমের অস্থায়ী বালুরস্তর নিয়ে বিশ্বের ঝানুঝানু কনসাল্টিং কোম্পানি হিমশিম খাচ্ছিল। বর্ষাকালের প্রবল স্রোতকে নিয়ে পিলার ডিজাইনাররা কিছুতেই হিসেব মিলাতে পারছিলেন না। অথচ কত সহজেই এই অর্বাচীনের দল হিসাব মেলাবার চেষ্টা করছে!
আসলে এরা কোনকালেও হিসেব মিলাতে পারবে না। স্বাধীনতার সময়েও পারেনি। এখনও পারছে না। শত নেগেটিভ কথার পরেও ৭১ এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। আর এখন পদ্মাসেতুও হয়ে গেছে। কেবল আজো হয়নি এইসব অর্বাচীনদের নিজেদের আখের গোছানোর হিসেব মেলানো। কঠিন মনোযোগে এরা হিসেব কষেই চলেছে। এভাবে হিসেব কোনকালেও মিলবে না বটে, তবে জাতি ঠিকই বিভ্রান্ত হবে। মূলত এদের কাজই হলো জাতিকে সকল সময় বিভ্রান্ত করা। যখনই দেশ এগিয়েছে তখনই এরা ভুল হিসেব দিয়ে দিয়ে জাতিকে বারবার বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। ভবিষ্যতেও করবে।

-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।